তাঁর নাম ছিল ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা । বয়স মাত্র ২৪ বছর । হিমাচল প্রদেশের পালামপুরের বাসিন্দা। একজন স্কুল প্রিন্সিপাল এবং একজন স্কুল শিক্ষিকার পুত্র । তিনি মার্চেন্ট নেভিতে যোগ দিতে পারতেন। চড়া বেতন। স্থিতিশীল জীবন। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী বেছে নেন । দেশপ্রেমে ভরপুর এই যুবক মানেকশ ব্যাটালিয়নের যশোর কোম্পানিতে যোগদান করেন এবং ১৯৯৪ সালে ১৩ জেএকে রাইফেলস-এ কমিশন লাভ করেন। এই পদাতিক রেজিমেন্টটি তার নির্ভীক সৈনিক এবং অসংখ্য যুদ্ধজয়ের জন্য সুপরিচিত। ছোটবেলা থেকেই বিক্রম বাত্রা নির্ভীক ছিলেন বলে তাঁকে সস্নেহে স্মরণ করা হয়। একবার তিনি তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন,“আমি হয় তেরঙ্গা (ভারতীয় জাতীয় পতাকা) উত্তোলন করে ফিরব, নয়তো তাতে মোড়ানো অবস্থায় ফিরব, কিন্তু আমি ফিরবই, এটা নিশ্চিত ।” আর তিনি ফিরেছিলেন তেরঙ্গা পতাকা মোড়ানো অবস্থাতেই ।
এমনই এক অসমসাহসী যুবকের ছিল একটা প্রেমিক হৃদয় । প্রায় সমবয়সী এক পাঞ্জাবি তরুনীর প্রেমে পড়েন তিনি । কিন্তু তাদের এই প্রেম কখনো পরিনতি পায়নি । তবে আজও প্রেমিকার হৃদয়ে বেঁচে আছেন ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা । ভারত মাতার এই সুযোগ্য সন্তানের সেই অজানা প্রেমকাহিনী নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন ।
১৯৯৫ সালে চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্রম বাত্রা সাথে প্রায় সমবয়স্কা পাঞ্জাবি তরুনী ডিম্পল চিমার সাক্ষাৎ হয় । লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট । তারা প্রেমে পড়েন । মেয়েটির পরিবার এতে রাজি ছিল না। কিন্তু ডিম্পল তার প্রেমকে পরিত্যাগ করেননি । এদিকে বিক্রম ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে চলে যান। তারপর, দূরের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং। চিঠি, ফোন কল এবং লুকিয়ে কাটানো সপ্তাহান্তের মাধ্যমে তাদের প্রেমালাপ চলছিল। একসাথে কিছুদিন বসবাস করেন তারা ।
একবার একটি গুরুদ্বারে,ডিম্পলের ওড়নার আঁচল ধরে চার পাক পরিক্রমার সময় তার পিছনে পিছনে পরিক্রমা করছিলেন বিক্রম। যখন ডিম্পল ঘুরে দাঁড়ান, তিনি হেসে বললেন, “অভিনন্দন মিসেস বাত্রা। আপনি কি খেয়াল করেননি আমরা এইমাত্র একসাথে চার পাক পরিক্রমা শেষ করলাম?”এটাই ছিল তাঁর বিয়ের প্রস্তাব। তবে বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি কখনো । ১৯৯৯ সালে কারগিলে যাওয়ার পর তাদের মুখোমুখি দেখাও হয়নি কখনো । ডিম্পল তার প্রেমিক বিক্রমকে শেষ দেখা দেখেন তেরঙ্গা পতাকা জড়ানো অবস্থায় কফিনে ৷
১৯৯৯ সালের জুন মাসে বিক্রম পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে পয়েন্ট ৫১৪০ দখল করেন। তাঁর রণহুঙ্কার পাহাড় জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর’। ১৯৯৯ সালের ৭ই জুলাই তিনি পয়েন্ট ৪৮৭৫-এর জন্য আবার উপরে যান। তাঁর এক সহকর্মী অফিসার শত্রুর গুলির আহত হন । বিক্রম তাঁকে ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে যান। কিন্তু তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর।
ডিম্পল কখনো বিয়ে করেননি।তিনি চণ্ডীগড়ে থাকেন এবং একটি স্কুলে পড়ান। তিনি বলেছেন,বিগত ২৫ বছরে একটি দিনও আমি তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করিনি। মনে হয় যেন তিনি কোনো পোস্টিংয়ে বাইরে আছেন। আমি জানি আমাদের আর কখনো দেখা হবে । তবু তার ছবি আমার হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখে আজও আমি তার প্রতীক্ষায় থাকি ।
সহপাঠীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ক্যাপ্টেন বাত্রা স্কুলে একজন সর্বগুণসম্পন্ন ছাত্র ছিলেন এবং খুব অল্প বয়স থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি যখন সম্মিলিত প্রতিরক্ষা পরিষেবা (সিডিএস) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন, তখন তা তাঁর পরিবারের কাছে আশ্চর্যজনক ছিল না। হংকং-ভিত্তিক একটি সংস্থা তাঁকে মার্চেন্ট নেভিতে চাকরির প্রস্তাবও দিয়েছিল। তিনি সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছিলেন এবং এমনকি তাঁর ইউনিফর্মও সেলাই করিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি মন পরিবর্তন করেন এবং পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এক দশক পরে, কোম্পানিটি তাকে শ্রদ্ধা জানায়। ক্যাপশনটিতে লেখা ছিল: “কখনও কখনও একজন সাধারণ ভারতীয় ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার একটি কোম্পানিকেও নতজানু করে দিতে পারে। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে, একজন অনুপ্রাণিত ভারতীয় পথ দেখিয়ে নিয়ে যান।”
ক্যাপ্টেন বাত্রা ১৯৯৯ সালের ১লা জুন কারগিলে যোগদান করেন। এর ১৮ দিন পর, যুদ্ধে তাঁর প্রথম বড় লড়াইয়ে তাঁকে পয়েন্ট ৫১৪০ পুনর্দখলের আদেশ দেওয়া হয়। শত্রুপক্ষ উচ্চতায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও, ক্যাপ্টেন তাঁর দলকে নিয়ে শত্রুর উপর এক অসাধারণ কৌশলগত আক্রমণ পরিচালনা করেন, যা ঐ অঞ্চলে ভারতীয়দের দখলকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তার সব লোক বেঁচে ফেরায় উচ্ছ্বসিত হয়ে বিক্রম ঘাঁটিতে তার কমান্ডারকে বলেন –“ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর” ।
ক্যাপ্টেন বাত্রার পরবর্তী অভিযানটি ছিল সবচেয়ে কঠিন অভিযানগুলোর মধ্যে একটি। ১৭,০০০ ফুট উচ্চতায় বরফাবৃত ঢালযুক্ত পয়েন্ট ৪৮৭৫ দখল করাই ছিল তার লক্ষ্য। পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৬,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থান নিয়েছিল। ৯ই জুলাই রাতে, ক্যাপ্টেন বাত্রা ও তার সঙ্গীরা সেই বিপদসংকুল আরোহণ শুরু করেন। ততক্ষণে প্রতিপক্ষরা জেনে গিয়েছিল শের শাহ (ক্যাপ্টেনের সাংকেতিক নাম) কে । ক্যাপ্টেন বাত্রা ও তার সঙ্গী অনুজ নায়ার প্রচণ্ডভাবে পাল্টা আক্রমণ চালান, হাতাহাতি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে শত্রুর বাঙ্কারগুলো দখলমুক্ত করেন এবং হতবাক শত্রুদের পিছু হটতে বাধ্য করেন।
মিশনটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, এমন সময় নিজের সঙ্গীকে বাঁচাতে গিয়ে ক্যাপ্টেন বাত্রার বুকে গুলি লাগে। ক্যাপ্টেন বাত্রার কীর্তি আজও অমলিন এবং এটি বাহিনীর অন্যতম বহুল প্রশংসিত কাহিনী। ২০০০ সালে তাঁকে পরম বীর চক্রে ভূষিত করে সম্মানিত করা হয়।।
