অষ্টাবক্র গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়টি (অধ্যায় ১৫) মূলত ‘আত্মসাক্ষাৎকার’ বা ‘স্ব-স্বরূপে স্থিতি’ (Self-Realization) নিয়ে আলোচনা করে। এই অধ্যায়ে অষ্টাবক্র ঋষি রাজা জনককে অদ্বৈত ব্রহ্মজ্ঞান এবং আত্মজ্ঞানী পুরুষের স্বরূপ কী, তা বর্ণনা করেছেন।
অষ্টবক্র উবাচ ॥
যথাতথোপদেশেন কৃতার্থঃ সত্ত্ববুদ্ধিমান্ ।
আজীবমপি জিজ্ঞাসুঃ পরস্তত্র বিমুহ্যতি ॥১৫-১॥
মোক্ষো বিষযবৈরস্যং বংধো বৈষয়িকো রসঃ ।
এতাবদেব বিজ্ঞানং যথেচ্ছসি তথা কুরু ॥১৫-২॥
বাগ্মিপ্রাজ্ঞামহোদ্যোগং জনং মূকজড়ালসম্ ।
করোতি তত্ত্ববোধোঽযমতস্ত্যক্তো বুভুক্ষভিঃ ॥১৫-৩॥
ন ত্বং দেহো ন তে দেহো ভোক্তা কর্তা ন বা ভবান্ ।
চিদ্রূপোঽসি সদা সাক্ষী নিরপেক্ষঃ সুখং চর ॥১৫-৪॥
রাগদ্বেষৌ মনোধর্মৌ ন মনস্তে কদাচন ।
নির্বিকল্পোঽসি বোধাত্মা নির্বিকারঃ সুখং চর ॥১৫-৫॥
সর্বভূতেষু চাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি ।
বিজ্ঞায় নিরহংকারো নির্মমস্ত্বং সুখী ভব ॥১৫-৬॥
বিশ্বং স্ফুরতি যত্রেদং তরংগা ইব সাগরে ।
তত্ত্বমেব ন সংদেহশ্চিন্মূর্তে বিজ্বরো ভব ॥১৫-৭॥
শ্রদ্ধস্ব তাত শ্রদ্ধস্ব নাত্র মোহং কুরুষ্ব ভোঃ ।
জ্ঞানস্বরূপো ভগবানাত্মা ত্বং প্রকৃতেঃ পরঃ ॥১৫-৮॥
গুণৈঃ সংবেষ্টিতো দেহস্তিষ্ঠত্যায়াতি যাতি চ ।
আত্মা ন গন্তা নাগন্তা কিমেনমনুশোচসি ॥১৫-৯॥
দেহস্তিষ্ঠতু কল্পাংতং গচ্ছত্বদ্যৈব বা পুনঃ ।
ক্ব বৃদ্ধিঃ ক্ব চ বা হানিস্তব চিন্মাত্ররূপিণঃ ॥১৫-১০॥
ত্বয়্যনংতমহাংভোধৌ বিশ্ববীচিঃ স্বভাবতঃ ।
উদেতু বাস্তমায়াতু ন তে বৃদ্ধির্ন বা ক্ষতিঃ ॥১৫-১১॥
তাত চিন্মাত্ররূপোঽসি ন তে ভিন্নমিদং জগত্ ।
অতঃ কস্য কথং কুত্র হেয়োপাদেয়কল্পনা ॥১৫-১২॥
একস্মিন্নব্যয়ে শান্তে চিদাকাশেঽমলে ত্বয়ি ।
কুতো জন্ম কুতো কর্ম কুতোঽহংকার এব চ ॥১৫-১৩॥
যত্ত্বং পশ্যসি তত্রৈকস্ত্বমেব প্রতিভাসসে ।
কিং পৃথক্ ভাসতে স্বর্ণাত্ কটকাংগদনূপুরম্ ॥১৫-১৪
অয়ং সোঽহময়ং নাহং বিভাগমিতি সংত্যজ ।
সর্বমাত্মেতি নিশ্চিত্য নিঃসংকল্পঃ সুখী ভব ॥১৫-১৫॥
তবৈবাজ্ঞানতো বিশ্বং ত্বমেকঃ পরমার্থতঃ ।
ত্বত্তোঽন্যো নাস্তি সংসারী নাসংসারী চ কশ্চন ॥১৫-১৬॥
ভ্রান্তিমাত্রমিদং বিশ্বং ন কিংচিদিতি নিশ্চয়ী ।
নির্বাসনঃ স্ফূর্তিমাত্রো ন কিংচিদিব শাম্যতি ॥১৫-১৭॥
এক এব ভবাংভোধাবাসীদস্তি ভবিষ্যতি ।
ন তে বংধোঽস্তি মোক্ষো বা কৃতকৃত্য়ঃ সুখং চর ॥১৫-১৮॥
মা সংকল্পবিকল্পাভ্য়াং চিত্তং ক্ষোভয় চিন্ময় ।
উপশাম্য সুখং তিষ্ঠ স্বাত্মন্যানংদবিগ্রহে ॥১৫-১৯॥
ত্যজৈব ধ্য়ানং সর্বত্র মা কিংচিদ্ হৃদি ধারয় ।
আত্মা ত্বং মুক্ত এবাসি কিং বিমৃশ্য করিষ্যসি ॥১৫-২০॥
পঞ্চদশ অধ্যায়ের মূল শিক্ষার নির্যাস :
আত্মার অবিনশ্বরতা ও অদ্বৈত জ্ঞান: পরমাত্মা বা আত্মা অজ, অমর, এবং অদ্বৈত। জ্ঞানি পুরুষ জানেন যে, দেহ বা জগত অবাস্তব, একমাত্র আত্মাই সত্য ।
বন্ধন ও মুক্তির স্বরূপ: জগতকে ‘আমি’ বা ‘আমার’ মনে করা বন্ধন, আর “আমি এই জগত নই, আমিই পরমাত্মা” — এই উপলব্ধিই মুক্তি ।
অহংবোধের বিলয়: জ্ঞানি ব্যক্তি সর্বভূতে আত্মাকে এবং আত্মাতে সর্বভূতকে দর্শন করেন। তাঁর মধ্যে ‘আমি’ বা ‘আমার’ এই অহংবোধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় ।
স্থিতপ্রজ্ঞ বা জীবন্মুক্ত অবস্থা: পঞ্চদশ অধ্যায়ে সেই ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যিনি জাগতিক সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, বা লাভ-ক্ষতির দ্বারা প্রভাবিত হন না। তিনি সমভাবাপন্ন এবং অন্তরে সর্বদা শান্ত ।
জগতের অবাস্তবতা: এই জগত স্বপ্নের মতো—যা সত্য মনে হলেও আসলে অবাস্তব। জ্ঞানি ব্যক্তি এই মায়াজাল ছিন্ন করে নিজের প্রকৃত স্বরূপ (আত্মা) অনুভব করেন । সংক্ষেপে, এই অধ্যায়টি অহংকার বর্জন করে শুদ্ধ চৈতন্যরূপে স্থিত হওয়ার শিক্ষা দেয়।।
