এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,১৯ জুলাই : শুক্রবার রাতে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে । মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এই হামলার পর তৃতীয় একজন সেনা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং অন্য চারজনকে জর্ডানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে সেনার মৃত্যুর পর ইরান জুড়ে ভয়ংকর হামলা শুরু করেছে আমেরিকা । মার্কিন হামলায় ইরানের সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ, নজরদারি কেন্দ্র, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ১৮ জুলাই টানা অষ্টম রাতের অভিযানে মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আরও এক দফা হামলা চালিয়েছে, যাতে উপকূলীয় নজরদারি ও বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে রাত ১১:৩০ মিনিটে (ইটি) চালানো এই হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বাহিনীকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাদেরকে তারা ১৭ জুলাই জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য দায়ী বলে মনে করে।সেন্টকম জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা “অত্যন্ত সতর্ক, মনোযোগী, মারাত্মক ও প্রস্তুত”।
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের শাদগান শহরের নিকটবর্তী একটি এলাকায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাদেশিক নিরাপত্তা উপ-গভর্নর ভালিওল্লাহ হায়াতি। তিনি আরও বলেন, এই হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।হায়াতি বলেন, হামলাটি শাদগানের নিকটবর্তী একটি স্থানকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে এবং তিনি বাসিন্দাদের তথ্যের জন্য সরকারি সূত্র অনুসরণ করার আহ্বান জানান। তিনি হামলার লক্ষ্যবস্তু বা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলির মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান । বাহরাইনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে বলে রবিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠার কথা জানানোর পর এই প্রতিবেদনটি আসে। আজ রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা বাহরাইন জুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠেছে। বাহরাইনের ওপর ইরানি হামলার পর শনিবারও বেশ কয়েকবার সাইরেন বেজে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় সর্বশেষ এই সতর্কতা জারি করেছে। শনিবার থেকে কুয়েত ও বাহরাইন উভয়ই ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রবিবার ভোরে তারা কুয়েতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নতুন করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হামলায় ক্যাম্প আল-আদাইরির একটি গোলাবারুদের ডিপো এবং আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটির কর্মী ও সরঞ্জাম স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলাগুলো ‘অপারেশন সায়েগেহ’-এর ১৭তম পর্বের অংশ ছিল এবং শনিবার ভোরে কুয়েতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর শুরু হওয়া হামলার পর এই হামলা চালানো হয়।
কুয়েতের সেনাবাহিনী রবিবার জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে এবং একই সাথে দেশের বিভিন্ন অংশে বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কুয়েত বারবার ইরানি হামলার শিকার হয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং লবণাক্ত জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলোও রয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে তাদের বর্ণনা অনুযায়ী একটি অনিরাপদ পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে দুটি জাহাজ অচল হয়ে পড়েছে এবং আরও দুটি জাহাজ সেই চেষ্টা পরিত্যাগ করেছে।গার্ডদের নৌবাহিনী জানিয়েছে,“কয়েক ঘণ্টা আগে, মার্কিন বাহিনীর সমর্থনে চারটি আইন লঙ্ঘনকারী জাহাজ তাদের নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ করে দেয় এবং বিপ্লবী গার্ডদের হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ ঘাঁটি থেকে পাঠানো সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ।” নৌবাহিনী জানিয়েছে, দুটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ায় স্থির ছিল, আর বাকি দুটি ফিরে গেছে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আরও জানিয়েছে যে, তারা প্রণালীটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং জাহাজগুলো কেবল ইরানি বাহিনী কর্তৃক নির্ধারিত পথ দিয়েই নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
ইরানের নৌবাহিনী বলেছে,“সমন্বয় ও অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক ফোঁটাও তেল, গ্যাস বা রাসায়নিক সার যাবে না ।” বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান যেসব পথকে অনিরাপদ বলে মনে করে, সেগুলোতে প্রবেশকারী জাহাজগুলো দুর্ঘটনার শিকার হবে।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে “চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী”।
এক বিবৃতিতে মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছেন এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।আবদোল্লাহি বলেছেন,“আমরা প্রতারক, অপরাধী এবং শপথ ভঙ্গকারী আমেরিকান শত্রুকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, যেকোনো আগ্রাসন, জবরদস্তি, সম্প্রসারণবাদ বা নৃশংসতার জবাব সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ও বিধ্বংসীভাবে দেওয়া হবে ।”
ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন আইনপ্রণেতা রবিবার মোজতবা খামেনির একটি লিখিত বার্তার উল্লেখ করে মার্কিন সেনাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেত্রী ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ বলতে কী বুঝিয়েছেন তা বুঝতে পারলে মার্কিন সৈন্যরা পালিয়ে যাবে।সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি এক্স-এ লিখেছেন,”মার্কিন সৈন্যরা যদি জানত নেতা তাদের জন্য ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ বলতে কী বুঝিয়েছেন, তাহলে তারা পালিয়ে যেতে এক মুহূর্তও নষ্ট করত না ।”‘ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি শনিবার এক লিখিত বার্তায় বলেছেন, “আমেরিকার শত্রুদের জন্য ইরানি জাতির কাছে অবিস্মরণীয় শিক্ষা রয়েছে।”
জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস রবিবার জানিয়েছে যে, একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকির’ কারণে আকাবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর খালি করে দেওয়া হয়েছে।দূতাবাস এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, “আমরা সকল আমেরিকানকে বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দরে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দিচ্ছি। জর্ডান কর্তৃপক্ষের সকল নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন।” আকাবা ইসরায়েলি বন্দর নগরী এইলাতের পাশেই অবস্থিত। ইরানের হামলার জেরে কয়েক ঘণ্টা আগেই জর্ডানজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে।
ইরানের অন্য একজন আইনপ্রণেতা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব দিক থেকে ইরানের ওপর স্থল হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে।রবিবার আইএলএনএ সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন আব্বাস পাপিজাদেহ বলেন “যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডায় যে পরিকল্পনাটি রয়েছে, তা হলো প্রথমে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ।” পাপিজাদেহ বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার পর ওয়াশিংটন দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব দিক থেকে স্থল আক্রমণের পরিকল্পনা করবে।তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রায় সব প্রদেশকেই লক্ষ্যবস্তু করবে ।”
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ রবিবার জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, দেশের শত্রুদের মোকাবেলার জন্য এটি অপরিহার্য। এর আগে সুরেম নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত কিছু বার্তার কারণে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কট্টরপন্থী সমর্থকদের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে তিনি এই আহ্বান জানান।এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে গালিবফ ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন “সর্বোচ্চ নেতার আদেশ পালনকে” জাতীয় প্রতিরোধ ও দেশ শাসনে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতা এবং নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইয়ের পুত্র মোজতবা খামেনেইয়ের নামে প্রচারিত একটি বার্তার পর এই মন্তব্যগুলো আসে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইরান যুদ্ধে যাবে নাকি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতার হাতেই রয়েছে।আরাঘচি বলেছেন,”যুদ্ধ বা যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি মূল্যায়নের দায়িত্ব সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতার হাতেই থাকে ।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্থায়ী সমঝোতার পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়া আরাঘচি বলেছেন, ওয়াশিংটন আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি জানানোর পর এবং সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেছেন,”ইরানের কূটনৈতিক সব পথ শেষ হয়ে গেছে, এটা স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্যই আলোচনা পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছেন।”
একটি ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া একই সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, সুরেম নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের সঙ্গে তাঁর কখনো ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ হয়নি। মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন ।।
