মুণ্ডক উপনিষদের দ্বিতীয় মুণ্ডকের দ্বিতীয় অধ্যায় মূলত পরম ব্রহ্মের স্বরূপ, সৃষ্টিতে তাঁর উপস্থিতি এবং ধ্যানের মাধ্যমে তাঁকে উপলব্ধি করার দার্শনিক পদ্ধতি বর্ণনা করে। এই অধ্যায়টি অবিদ্যা (সংসার বা অজ্ঞানতা) দূর করে আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান অর্জনের পথনির্দেশ করে।
দ্বিতীয় মুণ্ডক দ্বিতীয় অধ্যায়
আবিঃ সন্নিহিতং গুহাচরং নাম
মহৎপদমত্ৰৈতৎ সমর্পিতম্।
এজৎপ্রাণন্নিমিষচ্চ যদেতজ্জানথ সদসদ্বরেণ্যং
পরং বিজ্ঞানাদ্যদ্বরিষ্ঠং প্রজানাম্॥১।।
অন্বয়: আবিঃ (ব্রহ্ম প্রকাশমান); সন্নিহিতম্ (প্রাণিগণের অন্তরস্থ); গুহাচরং নাম (গুহাচর বলে খ্যাত); মহৎ পদম্ (মহান আশ্রয়); অত্র (ইঁহাতে); এজৎ (সচল); প্রাণৎ (প্রাণযুক্ত); চ (এবং); নিমিষৎ (যাদের চোখে পলক পড়ে); যৎ এতৎ (এই যা কিছু); সমর্পিতম্ (সমর্পিত); এতৎ (এই ব্রহ্ম); সৎ (দৃশ্য); অসৎ (অদৃশ্য); প্রজানাম্ (প্রাণিগণের); বিজ্ঞানাৎ পরম্ (ইন্দ্রিয়ের অতীত); বরেণ্যম্ (বরণীয়); বরিষ্ঠম্ (শ্রেষ্ঠ); [তৎ] জানথ (তাঁকে জান)।
সরলার্থ: ব্রহ্ম স্বভাবতই স্বয়ংপ্রকাশ। তিনি সকলের হৃদয় গুহায় বাস করেন। তাই তিনি গুহাচর বলে খ্যাত। তিনি সর্বভূতের মহান আশ্রয়। এই ব্রহ্মে সচল-অচল, সজীব-নির্জীব, স্পন্দনযুক্ত অথবা স্পন্দনহীন, এই সমস্ত কিছুই সমর্পিত রয়েছে। (হে সৌম্য) এই ব্রহ্ম একাধারে আমাদের দৃষ্টিগোচর, আবার অদৃশ্যও বটে। তিনি সর্বজনবরেণ্য। ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তাঁকে অনুভব করা যায় না। নিজ আত্মার সাথে তাঁকে অভিন্ন বলে জান।
ব্যাখ্যা: এই ব্রহ্মকে বলা হয় ‘গুহাচরম্’ অর্থাৎ তাঁর বিচরণ হৃদয়গুহায়। তিনি ‘আবিঃ’, স্বয়ংপ্রকাশ। তিনি জ্যোতির্ময়, দীপ্ত এবং উজ্জ্বল। শ্রীরামকৃষ্ণ দৃষ্টান্ত দিতেন: ঘরে একটা প্রদীপ জ্বলছে। ওই প্রদীপটিকে দেখতে চাইলে কি আর একটি প্রদীপের প্রয়োজন হয়? না, তা হয় না। একথা ব্ৰহ্ম সম্পর্কেও প্রযোজ্য। ব্রহ্মকে দেখার জন্য আর কোন আলোর প্রয়োজন হয় না। ব্রহ্ম স্বয়ংপ্রকাশ, স্বয়ম্প্রভ ও স্বয়ং-জ্যোতি। তিনি চৈতন্যস্বরূপ। আবার তিনি ‘সন্নিহিতম্’, পূর্ণভাবে বিরাজমান।
আবার ব্রহ্মকে ‘মহৎ পদম্’ও বলা হয়, যার অর্থ মহৎ অধিষ্ঠান, মহৎ আশ্রয়, মহৎ প্রতিষ্ঠাভূমি’। এই মহান অবলম্বনকে কেন্দ্র করেই সবকিছু রয়েছে। তিনিই সব কিছুর আশ্রয়। ‘অত্র এতৎ সমর্পিতম্’—এখানে ‘অত্র’ শব্দটির অর্থ ‘এই ব্রহ্মে’ এবং ‘এতৎ’ হল ‘এই বিশ্ব’। ‘সমর্পিতম্’ বলতে আশ্রিত বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ ব্রহ্মে এই বিশ্ব সমর্পিত। ‘এজৎ’—যা কিছু চলাফেরা করে, গতিশীল অর্থাৎ সকল প্রাণী; ‘প্রাণৎ’—যা কিছু শ্বাস গ্রহণ করে; ‘নিমিষৎ’—যাদের চোখে পলক পড়ে; ব্রহ্ম এই সবকিছুর অধিষ্ঠান।
এক কথায়, উপনিষদ আমাদের জ্ঞান লাভ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কিসের জ্ঞান? সৎ-অসৎ জ্ঞান। আক্ষরিক অর্থে ‘সৎ’ বলতে বোঝায় ‘যা আছে’ ও ‘অসৎ’ বলতে বোঝায় ‘যা নেই’। কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে ‘সৎ’ বলতে যা দৃষ্টিগোচর, এবং ‘অসৎ’ বলতে যা দৃষ্টিগোচর নয় তাকেই বোঝানো হয়েছে। সৎ শব্দের আর একটি অর্থ ‘যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য’, আর অসৎ হল ‘যা ইন্দ্রিয়গোচর নয়’। বীজাণু যেমন সর্বত্র রয়েছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় আমাদের কাছে তা অসৎ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বীজাণুগুলি জীবন্ত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী। এই সৎ এবং অসৎ উভয়ই ব্রহ্মের ওপর নির্ভরশীল। সব কিছু এই ‘বরেণ্যম্’ অর্থাৎ পরম সত্যকে আশ্রয় করে আছে। ‘পরং বিজ্ঞানাৎ’—‘পরম্’ অর্থ ঊর্ধ্বে, ‘পরং বিজ্ঞানাৎ’ অর্থ যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের অতীত। বহু বস্তুই আছে যা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করা যায় না। কারণ ইন্দ্রিয়গুলি যন্ত্র হিসাবে দুর্বল, এবং এদের শক্তি সীমিত। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, আমাদের এই পৃথিবী থেকে বহু দূরে কোন গ্রহ থাকতে পারে যা আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, গ্রহটির অস্তিত্ব নেই। উপনিষদ বলছেন যে, আমাদের ইন্দ্রিয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে যা কিছু রয়েছে তাও ব্রহ্ম থেকেই এসেছে, ব্রহ্মকেই আশ্রয় করে আছে। ছোট-বড়, দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছুর অস্তিত্বই ব্রহ্মের উপর নির্ভরশীল। ব্রহ্মই সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম, ব্রহ্মই বরিষ্ঠ।
তাই উপনিষদ আমাদের ব্রহ্মকে জানার জন্য সচেষ্ট হতে বলছেন। বস্তুর বাহ্যরূপের দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে তলিয়ে দেখতে বলছেন। সব কিছুর মধ্যে ব্রহ্মকে, সত্যকে আবিষ্কার করতে বলছেন। ব্রহ্মই সত্য। আর যা কিছু, সব ব্রহ্মে আরোপিত। এই ব্রহ্মকেই নিজ আত্মা বলে জানতে হবে—এই উপনিষদের নির্দেশ।
যদৰ্চিমদ্যদণুভ্যোঽণু চ
যস্মিঁল্লোকা নিহিতা লোকিনশ্চ।
তদেতদক্ষরং ব্ৰহ্ম স প্রাণস্তদু বাঙ্মনঃ
তদেতৎসত্যং তদমৃতং তদ্বেদ্ধব্যং সোম্য বিদ্ধি॥২।।
অন্বয়: যৎ (যিনি); অৰ্চিমৎ (জ্যোতির্ময়); যৎ (যিনি); অণুভ্যঃ অণু (সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর); চ (এবং); যস্মিন্ (যাঁতে); লোকাঃ (লোকসমূহ); চ (এবং); লোকিনঃ (বিভিন্ন লোকবাসিগণ); নিহিতাঃ (নিহিত রয়েছে); তৎ এতৎ অক্ষরং ব্রহ্ম (এই সেই অক্ষর.ব্রহ্ম); সঃ (তিনি); প্রাণঃ (প্রাণ [প্রাণবায়ু]); তৎ উ (তিনিই); বা মনঃ (বাক্য এবং মন); তৎ এতৎ সত্যম্ (তিনিই সত্য); তৎ অমৃতম্ (তিনি অবিনাশী); সোম্য (হে সৌম্য); তৎ (তিনি); বেদ্ধব্যম্ (তাঁকে ভেদ করতে হবে অর্থাৎ তিনি মূল লক্ষ্যস্থল); বিদ্ধি (তাঁকে ভেদ কর অর্থাৎ জান)।
সরলার্থ: তিনি জ্যোতির্ময় এবং সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর। সেই অক্ষর ব্রহ্ম বিভিন্ন লোকসমূহ এবং ঐসব লোকের অধিবাসীদেরও আশ্রয়। তিনিই প্রাণ। বাক্য এবং মনও তিনি। সেই ব্রহ্মই সত্য, তিনিই নিত্য। তাঁকে ভেদ করতে হবে অর্থাৎ তাঁকে স্বরূপত জানতে হবে।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্ম এই জগতের আশ্রয়। দেহ, মন এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় ব্রহ্মেই আশ্রিত। ব্রহ্মকে বাদ দিয়ে কোন কিছুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়। শুধু জড় বস্তুই নয়, নৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রেও একথা সমভাবে প্রযোজ্য। যেমন, সত্যও ব্রহ্মকে আশ্রয় করে আছে। ব্রহ্ম নিত্য এবং সকল বস্তুর উৎস। সবকিছু ব্ৰহ্ম থেকে এসেছে, ব্রহ্মই সকল বস্তুর অধিষ্ঠান আবার অন্তে সব ব্রহ্মেই লয় পাবে।এই ব্রহ্মকে স্বরূপত জানাই জীবনের লক্ষ্য। অর্থাৎ নিজেকে ব্রহ্মের সঙ্গে এক ও অভিন্ন বলে জানতে হবে।
ধনুর্গৃহীত্বৌপনিষদং মহাস্ত্রং
শরং হ্যুপাসানিশিতং সন্ধয়ীত।
আয়ম্য তদ্ভাবগতেন চেতসা
লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি॥৩।।
অন্বয়: সোম্য (হে সৌম্য); ঔপনিষদম্ (উপনিষদের বাণী); মহাস্ত্রম্ (মহাস্ত্ররূপ); ধনুঃ (ধনু অর্থাৎ প্রণব মন্ত্র); গৃহীত্বা (গ্রহণ করে); উপাসা-নিশিতং শরম্ (উপাসনা অর্থাৎ একাগ্র ধ্যানের দ্বারা শাণিত তীর); সন্ধয়ীত ([তীর] যোজনা [করে]); আয়ম্য (ধনুর গুণ টেনে); তদ্ভাবগতেন চেতসা (তদ্গত ভাবে মন ব্রহ্মে স্থির রেখে); লক্ষ্যম্ (লক্ষ্যে); তৎ অক্ষরম্ এব (সেই অক্ষর ব্রহ্ম); বিদ্ধি (ভেদ কর, জান)।
সরলার্থ: উপনিষদের বাণী (অর্থাৎ প্রণবের বাণী) যেন এক বিরাট ধনুক, আর জীবাত্মা এই ধনুকের শর। ধ্যানের দ্বারা এই শরকে শাণিত কর। এরপর সবলে ধনুকের জ্যা আকর্ষণ করে, অর্থাৎ পার্থিব বিষয় থেকে মনকে নিবৃত্ত করে, সেই মনকে তোমার লক্ষ্যে অর্থাৎ ব্রহ্মে স্থির কর; তারপর সেই মনের দ্বারা ব্রহ্মকে বিদ্ধ কর।
ব্যাখ্যা: উপনিষদের বাণী কি? ‘তত্ত্বমসি’–তুমিই সেই অর্থাৎ তুমিই ব্রহ্ম। ‘ঔপনিষদম্’, অর্থাৎ উপনিষদের বাণীকে ‘মহাস্ত্র’, এক মহাশক্তিশালী অস্ত্র বলা হয়েছে। সেই অস্ত্রকে উপনিষদ ধনুকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। শরটি কি? জীবাত্মা। লক্ষ্যবস্তু কি? স্বয়ং ব্রহ্ম। জীবাত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কিন্তু লক্ষ্য ভেদ করতে হলে শাণিত শরের প্রয়োজন। ‘উপাসা নি শিতম্’—অর্থাৎ শরটিকে ধ্যান যোগে শাণিত করতে হবে। কিসের ধ্যান? ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’, আমিই ব্রহ্ম—এই তত্ত্ব গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। এখন আমরা নিজেদের অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে একাত্ম করে দেখি। আমরা বলি আমি শ্রীযুক্ত অমুক, অমুক অফিসে কাজ করি ইত্যাদি। উপনিষদ বলছেন, ‘আমিই ব্রহ্ম’, একথা বারবার স্মরণ করতে হয়। এইভাবে ধ্যান করতে করতে আমার শরটি শাণিত হয়ে ওঠে এবং আমি ব্রহ্মে লীন হবার যোগ্যতা অর্জন করি। প্রথমে ধনুকটি তুলে নিতে হবে। তারপর লক্ষ্য স্থির রেখে জ্যা ধরে আকর্ষণ করতে হবে, অর্থাৎ আমাদের পরিশ্রম করতে হবে। মনকে বাইরের বস্তু থেকে নিবৃত্ত করে লক্ষ্য বস্তুতে স্থির করতে হবে। ‘তদ্ভাবগতেন চেতসা’—‘আমিই স্বয়ং ব্রহ্ম’, এই চিন্তায় যেন মন মগ্ন হয়ে থাকে। এরপর ব্রহ্মরূপ লক্ষ্যকে ভেদ করতে হবে। পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন হোক, তারা এক হয়ে যাক—এই আমাদের সাধনার লক্ষ্য। উপনিষদ আমাদের এই কঠিন সাধনায় ব্রতী হবার নির্দেশ দিচ্ছেন ।
প্রণবো ধনুঃ শরো হ্যাত্মা ব্রহ্ম তল্লক্ষ্যমুচ্যতে।
অপ্রমত্তেন বেদ্ধব্যং শরবত্তস্ময়ো ভবেৎ॥৪।।
অন্বয়: প্রণবঃ (ওঁকার মন্ত্র); ধনুঃ (ধনুক); আত্মা হি (জীবাত্মাই); শরঃ (বাণ); ব্রহ্ম (ব্রহ্ম); তৎ লক্ষ্যম্ (সেই শরের লক্ষ্য); উচ্যতে (কথিত হয়); অপ্রমত্তেন (অপ্রমত্ত হয়ে, নির্ভুল ভাবে); বেদ্ধব্যম্ (ভেদ করা উচিৎ [এবং]); শরবৎ (সেই বাণের মতো); তন্ময়ঃ (লক্ষ্যের সঙ্গে অভিন্নরূপে); ভবেৎ (থাকবে [অর্থাৎ জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলে এক হয়ে যাবে])।
সরলার্থ: ওঁকার ধনুক, জীবাত্মা শর, এবং ব্রহ্ম সেই শরের লক্ষ্যবস্তু বলে কথিত। নির্ভুলভাবে সেই লক্ষ্যকে শরবিদ্ধ করতে হবে। তাহলে সেই শর (জীবাত্মা) লক্ষ্যের (ব্রহ্মের) সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবে। অর্থাৎ জীবাত্মা নিজেকে পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্ন বোধ করবে।
ব্যাখ্যা: উপনিষদের বাণী হল এই ওম্ (প্রণব)। উপনিষদ এখানে বলছেন, আমাদের ‘ওম্’কে ধ্যান করতে হবে। শর হল জীবাত্মা, ওম্ হল ধনুক এবং লক্ষ্য স্বয়ং ব্রহ্ম। ধনুকটি তুলে লক্ষ্যভেদে সচেষ্ট হতে হবে। ‘অপ্রমত্তেন’—নির্ভুল ভাবে। শরটিকে অভ্রান্তভাবে লক্ষ্যে স্থির করতে হবে। অখণ্ড মনোযোগের সঙ্গে শরনিক্ষেপ করতে হবে। ব্রহ্মচিন্তায় শরটি যেন তন্ময় থাকে। জীবাত্মা তখন ব্রহ্মের সঙ্গে এক হয়ে যাবে।
যস্মিন্দ্যৌঃ পৃথিবী চান্তরিক্ষমোতং
মনঃ সহ প্রাণৈশ্চ সর্বৈঃ।
তমেবৈকং জানথ আত্মানমন্যা
বাচো বিমুঞ্চথামৃতস্যৈষ সেতুঃ॥৫।।
অন্বয়: যস্মিন্ (যে অক্ষরে); দ্যৌঃ (দ্যুলোক); পৃথিবী (পৃথিবী); চ (এবং); অন্তরিক্ষম্ (পৃথিবী ও দ্যুলোকের অন্তর্বর্তী স্থান); সর্বৈঃ প্রাণৈঃ সহ মনঃ চ (মন ও ইন্দ্রিয়সকল); ওতম্ (সমর্পিত); তম্ (সেই); একম্ (অদ্বিতীয়); আত্মানম্ এব (আত্মাকেই); জানথ (জান); অন্যাঃ বাচঃ (অন্য সব কথা); বিমুঞ্চথ (পরিত্যাগ কর); এষঃ (এই আত্মজ্ঞান); অমৃতস্য (অমৃতের অর্থাৎ নিত্যকে লাভ করার); সেতুঃ (উপায়, সেতু)।
সরলার্থ: স্বর্গ, মর্ত, অন্তরীক্ষ, ইন্দ্রিয় ও প্রাণসহ মন, সবই এই পরমাত্মায় প্রতিষ্ঠিত। এই এক ও অভিন্ন আত্মাকে জানেনা। আত্মজ্ঞানই অমরত্বের পথে সেতুস্বরূপ। অন্য অসার আলোচনায় সময় অপচয় করো না।
ব্যাখ্যা: ‘অন্যাঃ বাচঃ বিমুঞ্চথ’—অসার আলাপ-আলোচনা বন্ধ কর, অন্য সব কথা ভুলে যাও। তুমি এবং ব্রহ্ম এক ও অভিন্ন—এই উপনিষদের মূল সুর। এই তত্ত্বটিতে মন একাগ্র কর, আর অন্য সব বিষয় ভুলে যাও। অন্য সব কিছু অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয়। ‘এষঃ অমৃতস্য সেতুঃ’—এটিই অমৃতের সেতু, অমৃতের পথ। ব্রহ্মজ্ঞানই সেই সেতু যা মানুষকে মৃত্যুর পারে অমৃতলোকে নিয়ে যায়। অমরত্ব লাভের আর অন্য কোন উপায় নেই।
অরা ইব রথনাভৌ সংহতা যত্র নাড্যঃ
স এষোঽন্তশ্চরতে বহুধা জায়মানঃ।
ওমিত্যেবং ধ্যায়থ আত্মানং
স্বস্তি বঃ পারায় তমসঃ পরস্তাৎ॥৬।।
অন্বয়: রথনাভৌ (রথচক্রের নাভিতে অর্থাৎ কেন্দ্রে); অরাঃ ইব (চক্র শলাকার মতো); যত্র (যেখানে); নাড্যঃ (নাড়ীসমূহ); সংহতাঃ (একত্র হয়); স এষঃ (সেই তিনি); বহুধা জায়মানঃ (নানা রূপে প্রকাশিত হয়ে); অন্তঃ (হৃদয় মধ্যে); চরতে (বিচরণ করেন); আত্মানম্ (আত্মাকে); ওম্ ইত্যেবম্ (ওঁকার রূপে); ধ্যায়থ (চিন্তা কর বা ধ্যান কর); তমসঃ (অন্ধকার থেকে অর্থাৎ অজ্ঞানতা থেকে); পরস্তাৎ (পারে); পারায় (উত্তীর্ণ হওয়ার নিমিত্ত); বঃ (তোমাদের); স্বস্তি (মঙ্গল হোক)।
সরলার্থ: রথচক্রের কেন্দ্রে বহু শলাকা সংযুক্ত থাকে; একই ভাবে, বহু ধমনী হৃদ্যন্ত্রে যুক্ত থাকে। পরমাত্মা সেই হৃদয়ের মধ্যে নানা রূপে (যথা ক্রোধ, বিদ্বেষ ইত্যাদি রূপে) নিজেকে প্রকাশ করে অন্তরে বিচরণ করেন। অন্ধকারের পারে যাওয়ার জন্য সেই আত্মায় ধ্যানমগ্ন হও। তোমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হোক।
ব্যাখ্যা: এই জগতের সঙ্গে ব্রহ্মের কি সম্পর্ক বর্তমান উপনিষদ আবার সেই প্রসঙ্গ আলোচনা করছেন। এবার উপনিষদ রথচক্রের দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন। রথচক্রে বহু শলাকা থাকে; আর এইসব শলাকা চক্রের কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। চক্রের একটি কেন্দ্র বা নাভি থাকে আর সেই কেন্দ্র থেকেই সব শলাকা নির্গত হয়। কেন্দ্রটি না থাকলে শলাকাগুলিও থাকতে পারে না। একই ভাবে, সমগ্র জগৎ ব্রহ্মে আশ্রিত। ব্রহ্ম ছাড়া জগতের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। এই শ্লোকে হৃদ্যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ধমনীগুলিকে চক্রের শলাকাগুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এই ধমনীগুলি হৃদ্যন্ত্রে কেন্দ্রীভূত ।
এরপর উপনিষদ হৃদয়ে ‘ওম্’কে ধ্যান করার উপদেশ দিচ্ছেন। উজ্জ্বল, দীপ্ত, জ্যোর্ত্মিয় ‘ওম্’-এর উপর ধ্যান করতে হবে। আমাদের অন্তরস্থ আত্মাকে ‘ওম্’ বলে চিন্তা করতে হবে। যাঁরা যোগাভ্যাস করেন তাঁরা জানেন ধ্যেয় বস্তুকে জ্যোতির্ময় সত্তা রূপে কল্পনা করতে হয়। ব্রহ্মকে ধ্যান করা বড় কঠিন, কারণ ব্রহ্ম নিরাকার। তাই উপনিষদ সূচনাতে ‘ওম্’ তথা প্রণবকে ধ্যান করতে বলেছেন, কারণ ‘ওম্’ ব্রহ্মের প্রতীক। পরিণত সাধক পরবর্তীকালে ‘ওম্’কে অতিক্রম করেন। ব্রহ্মের সঙ্গে একত্ব বোধ হলে আর কোন রূপের ধ্যান করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সাধনার আরম্ভে অন্তরস্থ আত্মাকে উজ্জ্বল ওঁকার রূপে ধ্যান করার নির্দেশ দিচ্ছেন উপনিষদ। এই ভাবে ধ্যান করার অভ্যাস করলে মানুষ অজ্ঞানতা ও অন্ধকারের পারে যেতে সক্ষম হন। শিষ্য যেন সেই অবস্থা প্রাপ্ত হন, এখানে গুরু তাঁকে সেই আশীর্বাদই করছেন।
যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্যস্যৈষ মহিমা ভুবি।
দিব্যে ব্রহ্মপুরে হ্যেষ ব্যোম্ন্যাত্মা প্রতিষ্ঠিতঃ॥
মনোময়ঃ প্রাণশরীরনেতা
প্রতিষ্ঠিতোঽন্নে হৃদয়ং সন্নিধায়।
তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা
আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি॥৭।।
অন্বয়: যঃ (যিনি); সর্বজ্ঞঃ (সাধারণ ভাবে সব বিষয় জানেন); সর্ববিৎ (বিশেষ রূপে সকল বিষয় জানেন); ভুবি (জগতে); যস্য (যাঁর); এষঃ মহিমা (এইরূপ মহিমা); এষঃ আত্মা হি (এই আত্মাই); দিব্যে (জ্যোতির্ময়); ব্রহ্মপুরে ব্যোম্নি (ব্রহ্মের আবাস হৃদয়াকাশে); প্রতিষ্ঠিতঃ (অবস্থিত); [তিনি] হৃদয়ং সন্নিধায় (হৃদয়ে থেকে); মনোময়ঃ (মনোময়); প্রাণশরীরনেতা (প্রাণবায়ু ও সূক্ষ্ম শরীরের নিয়ামক); অন্নে (অন্নময় অর্থাৎ স্থূল শরীরে প্রকাশিত); প্রতিষ্ঠিতঃ (আশ্রয়স্থল); ধীরাঃ (প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ); তদ্বিজ্ঞানেন (তাঁর সঙ্গে অভিন্নভাবে নিজেকে জেনে) যৎ আনন্দরূপম্ অমৃতম্ (যিনি আনন্দস্বরূপ ও নিত্য); বিভাতি (প্রকাশিত হন); পরিপশ্যন্তি (তাঁরা [আত্মাকে] সম্যক্-রূপে জানেন)।
সরলার্থ: যিনি সাধারণভাবে এবং বিশেষভাবে সব কিছু জানেন, এ জগতের সকল বস্তুই যাঁর মহিমার প্রকাশ, সেই পরমাত্মা জ্যোতির্ময় হৃদয়াকাশে অবস্থান করেন। তাই হৃদয়াকাশের আর এক নাম ব্রহ্মপুর। মন রূপে প্রকাশিত এবং প্রাণ ও সূক্ষ্মদেহের চালক হিসেবে পরমাত্মা স্থূলদেহের অভ্যন্তরে হৃদয়ে বাস করেন। বিবেকী পুরুষরা এই অবিনাশী ও আনন্দস্বরূপ আত্মাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আত্মাকে এইভাবে উপলব্ধি করতে পারলে তাঁকে সম্যক্ ভাবে জানা যায়।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মকে কি ভাবে বর্ণনা করা যায়? তিনি ‘সর্বজ্ঞ’, সব কিছু জানেন এবং ‘সর্ববিৎ’, সব কিছু বোঝেন। ‘যস্য এষঃ মহিমা ভুবি’—এই বিশ্ব তাঁরই মহিমা। কোন্ অর্থে? এর অর্থ, সকল বস্তুর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকেই প্রকাশ করেন। যা কিছু আমরা দেখি সবই ব্রহ্ম। তিনি বাইরে আছেন, আবার ভিতরেও আছেন। তিনি একযোগে বিশ্বগত এবং বিশ্বাতীত। সমগ্র জগৎ তাঁর দ্বারা আচ্ছাদিত। আবার তিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন। ব্রহ্মপুরে অর্থাৎ ব্রহ্মের আবাসে তথা হৃদয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত।
হৃৎপদ্মের মধ্যে রয়েছে শূন্য আকাশ। বাইরেও আছে সেই একই আকাশ। এই হৃদয়াকাশেই ব্রহ্মের অবস্থান। তাই এর নাম ব্রহ্মপুর। হৃদয়াকাশ জ্যোতির্ময় বলে একে দিব্য বলা হয়। আমাদের আবেগ ও অনুভূতিগুলি হৃদয়েই হয়ে থাকে। এই সব অনুভূতির দ্বারাই ব্রহ্মের উপস্থিতি বোধ করা যায়। যোগিগণ ব্রহ্মকে নিজ হৃদয়স্থ আত্মারূপে কল্পনা করেন।
ধরা যাক, কোন ব্যক্তি ব্যবহারিক জগতের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। আসলে তিনি কোথায় গেছেন? কোথাও যাননি। এই জগৎ তাঁর নিজেরই মহিমা, এরূপ তিনি বোধে বোধ করেছেন। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, সমুদ্র সব চক্রাকারে ঘুরছে। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তারা চলে। একই ভাবে দেশকালও নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যাঁর স্বরূপ জ্ঞান হয়েছে, তিনি এই সমগ্র দৃশ্যমান জগতের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন। এই জগতের আশ্চর্য সব ঘটনাকে তিনি তাঁর নিজের গৌরব বলে অনুভব করেন। সব কিছুই তাঁর মধ্যে রয়েছে, বাইরে আর কিছুই নেই।
ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদ্যন্তে সর্বসংশয়াঃ।
ক্ষীয়ন্তে চাস্য কর্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে॥৮।
অন্বয়: তস্মিন্ পরাবরে দৃষ্টে (কারণ ও কার্য উভয়রূপে ব্রহ্মকে জানলে); অস্য (সেই তত্ত্বজ্ঞানীর); হৃদয়গ্রন্থিঃ (হৃদয়ের অবিদ্যারূপ বন্ধন); ভিদ্যতে (ছিন্ন হয় অর্থাৎ বিনষ্ট হয়); সর্বসংশয়াঃ (সকল সংশয়); ছিদ্যন্তে (ছিন্ন হয়); কর্মাণি চ (কর্মফলসমূহও); ক্ষীয়ন্তে (ক্ষয়প্রাপ্ত হয়)।
সরলার্থ: যিনি কারণ ব্রহ্ম ও কার্য ব্রহ্ম উভয়কেই নিজ আত্মারূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তাঁর হৃদয়ের সকল জটিলতা দূর হয়, তাঁর সকল সংশয় নাশ হয়, তাঁর কর্মফলও ক্ষয় হয়ে যায়।
ব্যাখ্যা: স্বরূপজ্ঞান হলে কি হয় এখানে সেকথাই বলা হয়েছে। তখন নিজেকে সব কিছুর কারণ ও কার্য বলে বোধ হয়। এর ফলে ক্ষুদ্র অহং বা ‘কাঁচা আমি’র বিনাশ হয়। ব্রহ্মকে জানার আগে পর্যন্ত মানুষ নিজেকে কর্তা ও ভোক্তা বলে মনে করে। মানুষ তখন দেহ-মনের সঙ্গে অভিন্ন বোধ করে। স্বভাবতই দেহ-মনের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে সে আবদ্ধ করে ফেলে। আর এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। কামনা-বাসনা তাকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আশা-নিরাশার দোলায় মানুষ তখন মনের স্থিরতা হারায়। এক কথায়, তখন আর তাকে স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না। তার চরিত্রে নানা অঙ্কট-বঙ্কট অর্থাৎ গোলমাল দেখা দেয়। নিজের স্বরূপ না জানার ফলেই এসব অঘটন ঘটে। যখন মানুষ নিজেকে পরমাত্মা তথা সর্বভূতের অন্তরাত্মা বলে জানতে পারে তখন তার দুই-বোধ চিরতরে ঘুচে যায়। এই জগৎ কার্য-কারণের সমষ্টি। কার্য ও কারণ এক ও অভিন্ন, আর মানুষই সেই অভিন্ন সত্তা। মানুষই ব্রহ্ম। এই অবস্থায় তার আর কোন কর্ম থাকে না। অতএব কর্মফলও থাকে না। অন্ধকার ঘরে একটি দেশলাই কাঠি জ্বালালে যেমন বহুযুগের অন্ধকার দূর হয় তেমনি আত্মজ্ঞান হলে সঞ্চিত কর্ম ক্ষয় হয়ে যায়। তখন কর্তব্য কর্ম আর কিছু থাকে না, কারণ মানুষের অহংবুদ্ধি পুরোপুরি মুছে যায়। যদিও প্রারব্ধ কর্ম অর্থাৎ যে কর্ম ফল দিতে শুরু করেছে তা চলতেই থাকে, কিন্তু আসলে তিনি মুক্ত।
‘পর’ অর্থ হল উৎকৃষ্ট আর ‘অবর’ অর্থ নিকৃষ্ট। কারণ হিসাবে ব্রহ্ম (অর্থাৎ নির্গুণ ব্রহ্ম) উৎকৃষ্ট, তাই তাঁকে ‘পর’ বলা হয়। আবার তাঁকে ‘অবর’ বলা হয়, যেহেতু কার্য হিসাবে (অর্থাৎ জগৎ-রূপে প্রকাশিত) ব্ৰহ্ম নিকৃষ্ট।
হিরন্ময়ে পরে কোশে বিরজং ব্রহ্ম নিষ্কলম্।
তচ্ছুভ্রং জ্যোতিষাং জ্যোতিস্তদ্যদাত্মবিদো বিদুঃ॥৯।।
অন্বয়: হিরন্ময়ে (জ্যোতির্ময়); পরে (শ্রেষ্ঠ); কোশে (কোষের মধ্যে অর্থাৎ হৃদয় মধ্যে); বিরজম্ (শুদ্ধ, নিরঞ্জন); নিষ্কলম্ (যাঁর কলা নেই [অর্থাৎ নিরাকার]); তৎ ব্রহ্ম (সেই ব্রহ্ম); শুভ্রম্ (শুদ্ধ); তৎ জ্যোতিষাং জ্যোতিঃ (জ্যোতির জ্যোতিস্বরূপ); যৎ (যা); আত্মবিদঃ (আত্মজ্ঞানীরা); বিদুঃ (জানেন)।
সরলার্থ: ব্রহ্ম নিষ্কলঙ্ক এবং নিরাকার। হৃদয়ের জ্যোতির্ময় শ্রেষ্ঠ কক্ষে তাঁর আবাস। সেই ব্ৰহ্ম শুদ্ধ এবং আলোর চেয়েও উজ্জ্বল। যিনি আত্মাকে জানেন তিনি ব্রহ্মকেও জানেন।
ব্যাখ্যা: খাপের মধ্যে যেমন তলোয়ার থাকে, হৃদয়েও তেমনি ব্রহ্ম লুকিয়ে আছেন। হৃদয়েই ব্রহ্মের উপলব্ধি হয়। সেই জন্য হৃদয়কে ব্রহ্মের ‘কক্ষ’ বলা হয়েছে। এই কক্ষকে শ্রেষ্ঠ বলে বিশেষিত করা হয়েছে, কারণ দেহের অন্তরতম প্রদেশে এই কক্ষের অবস্থান। আত্মা জ্যোতির্ময়; তিনিই মনকে আলোকিত করেন। আবার তিনি আলোর চেয়েও উজ্জ্বল কারণ তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞানের উৎস। মন আমাদের যে আলো দান করে তা ব্রহ্ম থেকেই আসে। ব্রহ্ম শুদ্ধ, কারণ তিনি জ্ঞানস্বরূপ। অজ্ঞানতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোঽয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং
তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি॥১০।।
অন্বয়: তত্র (সেই ব্রহ্মে); সূর্যঃ (সূর্য); ন ভাতি (দীপ্তি পায় না); ন চন্দ্রতারকম্ (চন্দ্রতারাও না); ইমাঃ বিদ্যুতঃ (এই বিদ্যুৎ); ন ভান্তি (দীপ্তি পায় না); অয়ম্ অগ্নিঃ কুতঃ (এই অগ্নি কি করে প্রকাশ পাবে); তম্ এব ভান্তম্ (তিনি দীপ্যমান হলে); সর্বম্ (সব কিছু); অনুভাতি (তাঁর আলোতেই প্রকাশিত হয়); তস্য ভাসা (তাঁর জ্যোতিতেই); সর্বমিদম্ (এই সব কিছু); বিভাতি (জ্যোতির্ময়)।
সরলার্থ: ব্রহ্মের উপস্থিতিতে সূর্য, চন্দ্র, তারা কেউই কিরণ দান করে না। এমন-কি বিদ্যুৎও তার উজ্জ্বলতা হারায়। এমন অবস্থায় অগ্নি কি করে দীপ্তি পাবে? ব্রহ্মের জ্যোতিতেই এই সব কিছু জ্যোতির্ময়। ব্রহ্মের আলোকেই সব আলোকিত।
ব্যাখ্যা: সূর্যকিরণ সব বস্তুকে প্রকাশ করে, ব্রহ্মকে প্রকাশ করতে পারে না। চন্দ্র, তারা ও অন্যান্য উজ্জ্বল বস্তু সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। এই সব বস্তুর মধ্যে কোনটিরই নিজস্ব জ্যোতি নেই। এরা ব্রহ্মের জ্যোতিতেই জ্যোতিষ্মান। একমাত্র ব্রহ্মই স্বয়ং-প্রকাশ। দীপের আলোর মতো ব্রহ্মও নিজেকে নিজেই প্রকাশ করেন। ব্রহ্ম সব কিছুর উৎস। ব্রহ্ম আছেন, তাই অন্যান্য বস্তুরও অস্তিত্ব আছে। ব্রহ্মকে বাদ দিয়ে কোন কিছুরই অস্তিত্ব সম্ভব নয়। সেই ব্রহ্মের অধিষ্ঠান আমাদের হৃদয়ে। অর্থাৎ আমিই সেই ব্রহ্ম।
ব্রহ্মৈবেদমমৃতং পুরস্তাদ্ব্রহ্ম
পশ্চাদ্ব্রহ্ম দক্ষিণতশ্চোত্তরেণ।
অধশ্চোর্ধ্বং চ প্রসৃতং
ব্রহ্মৈবেদং বিশ্বমিদং বরিষ্ঠম্॥১১।।
অন্বয়: ইদম্ অমৃতম্ (এই আনন্দস্বরূপ); ব্রহ্ম এব (ব্রহ্মই); পুরস্তাদ্ ব্ৰহ্ম (সম্মুখে ব্রহ্ম); পশ্চাৎ (পিছনে); দক্ষিণতঃ (দক্ষিণে অর্থাৎ ডাইনে); চ (এবং); উত্তরেণ (উত্তরে); ব্রহ্ম (ব্রহ্ম); অধঃ (নীচে); ঊর্ধ্বং চ (উপরেও); ইদং ব্রহ্ম এব প্রসৃতম্ (এই ব্রহ্মই ব্যাপ্ত আছেন); ইদং বিশ্বং বরিষ্ঠম্ (এই জগৎ ব্রহ্ম [শ্রেষ্ঠ ])।
সরলার্থ: আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম তোমার সম্মুখে; তিনি আবার তোমার পিছনেও বটে। দক্ষিণে, উত্তরে, উপরে, নীচে সর্বত্রই তিনি। তিনি সর্বব্যাপী। এ জগৎ স্বয়ং ব্রহ্ম।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। তিনি স্বয়ং-প্রকাশ। তিনিই একমাত্র অধিষ্ঠান যাঁর উপর সব কিছু আরোপিত উপাধি মাত্র। উপাধিগুলি সত্য নয়। যেমন রজ্জুতে আরোপিত সর্প অথবা মরুভূমিতে আরোপিত মরীচিকা সত্য নয়, এ-ও ঠিক তেমনি।
কিন্তু একথার অর্থ এই নয় যে, এই দৃশ্যমান জগৎ মিথ্যা। এ জগৎ আপেক্ষিক ভাবে সত্য; একটি বিশেষ দেশ ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে সত্য। দেশ-কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই জগতের লয় হয়।
অন্ধকারে রজ্জুতে সর্পদর্শনে, সাপটিকে যে সত্য বলে মনে হয় তার কারণ সাপটি দড়ির উপরে অর্থাৎ একটি সত্য বস্তুর উপর আরোপিত। দড়ি সরিয়ে নিলে সাপও অদৃশ্য হয়। তেমনি ব্রহ্মকে আশ্রয় করে আছে বলেই জগৎকে সত্য বলে মনে হয়।
ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নেই। ব্রহ্ম সর্বত্র রয়েছেন। তিনি সর্বব্যাপী। তিনিই একমাত্র সত্য। সব কিছুকে ব্রহ্মের প্রকাশ রূপে দেখতে হবে। এ-ই যথার্থ জ্ঞান। জগৎকে জগৎ রূপে দেখার নামই অজ্ঞানতা।
।। মুণ্ডক উপনিষদের দ্বিতীয় মুণ্ডকের দ্বিতীয় অধ্যায় এইখানে সমাপ্ত।।
