মুণ্ডক উপনিষদের দ্বিতীয় মুণ্ডক প্রথম অধ্যায়ে মহর্ষি অঙ্গিরা শিষ্য শৌনককে ‘ব্রহ্মবিদ্যা’ বা পরমাত্মার জ্ঞান দান করেছেন । এখানে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে পরম ব্রহ্মের সম্পর্ক বর্ণনা করে বোঝানো হয়েছে যে, এই নিখিল বিশ্ব ও তার সমস্ত উপাদান সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্ম থেকেই উৎপন্ন হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাতেই লীন হয়েছে ।
দ্বিতীয় মুণ্ডক প্রথম অধ্যায়
তদেতৎ সত্যম্-যথা সুদীপ্তাৎ পাবকাদ্
বিস্ফুলিঙ্গাঃ সহস্রশঃ প্রভবন্তে সরূপাঃ।
তথাঽক্ষরাদ্ বিবিধাঃ সোম্য ভাবাঃ
প্রজায়ন্তে তত্র চৈবাপিযন্তি॥১।।
অন্বয়: তৎ এতৎ (সেই অক্ষর পুরুষই); সত্যম্ (সত্যস্বরূপ); যথা (যেভাবে); সুদীপ্তাৎ পাবকাৎ (প্রদীপ্ত অগ্নি থেকে); সরূপাঃ বিস্ফুলিঙ্গাঃ (সমান রূপ বিশিষ্ট স্ফুলিঙ্গগুলি); সহস্রশঃ প্রভবন্তে (সহস্র সহস্র উৎপন্ন হয়); সোম্য (হে সৌম্য); তথা (সেইরূপ); অক্ষরাৎ (অক্ষর পুরুষ থেকে); বিবিধাঃ ভাবাঃ (বিভিন্ন বস্তু ও জীব সমূহ); প্রজায়ন্তে (জন্মায়); তত্র চ এব অপিযন্তি (তাতেই আবার লয় হয়)।
সরলার্থ: সেই ব্রহ্মই সত্য। জুলন্ত অগ্নি থেকে যেমন অগ্নিময় স্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়, হে সৌম্য, সেই ভাবেই ব্ৰহ্ম থেকে বিবিধ বস্তুর উদ্ভব হয়, এবং সেগুলি আবার ব্রহ্মেই লোপ পায়।
ব্যাখ্যা: এখন প্রশ্ন হল—জগতের সঙ্গে ব্রহ্মের সম্পর্ক কি? আমাদের হয়তো মনে আছে, এই উপনিষদের সূচনা হয়েছিল আচার্যের প্রতি শিষ্যের একটি প্রশ্ন দিয়ে, ‘কস্মিন্ নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বম্ ইদং বিজ্ঞাতং ভবতি’—‘হে প্রভু, কি জানলে বা কোন্ বস্তুকে জানলে (কস্মিন্ নু বিজ্ঞাতে) এই সব কিছুকে (সর্বম্ ইদম্) জানা যায় (বিজ্ঞাতং ভবতি)?’ ‘এই সব’ (সর্বম্ ইদম্) বলতে কি বোঝায়? এই দৃশ্যমান জগৎকে, এই বিশ্বকে বোঝায়। ‘কি জানলে বা কাকে জানলে আমি সমগ্র জগৎকে জানতে পারি?’ উপনিষদের মতে, একমাত্র পরমাত্মাকে জানলেই সমগ্র জগৎকে জানা যায়। পরমাত্মাই এই জগতের মধ্য দিয়ে আপনাকে প্রকাশ করেছেন, এবং এই জগৎ পরমাত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈশ্বরের সঙ্গে জীব ও জগতের সম্পর্ক কি এই নিয়ে যুগ যুগ ধরে তুমুল বিতর্ক চলে আসছে। হিন্দুদর্শন অনুযায়ী, এই জগৎ ব্রহ্মেরই প্রকাশ বা অভিব্যক্তি। এই ভাবে নিজেকে প্রকাশ করে ব্রহ্ম যেন জগতের কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছেন। এই জন্যই ঈশ্বরকে বলা হয় অন্তরাত্মন্ বা অন্তর্যামী—তিনিই সর্বভূতের অন্তরাত্মা। তিনি অন্তরেও আছেন, আবার বাইরেও আছেন। অর্থাৎ তিনি সর্বত্র রয়েছেন।
এই শ্লোকে উপনিষদ বলছেন, ‘তৎ এতৎ সত্যম্’—এ-ই সত্য। একেই সত্য বলে জান। আচার্য শিষ্যের প্রশ্নের উত্তর দিতে চলেছেন। ‘যথা সুদীপ্তাৎ পাবকাৎ’—যেমন জ্বলন্ত অগ্নি থেকে; ‘বিস্ফুলিঙ্গাঃ সহস্রশঃ প্রভবন্তে’—সহস্র স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয়; ‘সরূপাঃ’—তাদের সব লক্ষণ অগ্নিরই মতো। ‘অক্ষর’ বলতে পরমাত্মা বা ব্রহ্মকে বোঝানো হয়েছে। কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘অক্ষয়’। আত্মা নিত্য, অবিকারী এবং অপরিবর্তনীয়। ‘বিবিধাঃ ভাবাঃ প্রজায়ন্তে’—বিভিন্ন বস্তু এবং ব্যক্তি ব্ৰহ্ম থেকে উদ্ভূত হয়। ‘তত্র চ এব অপিযন্তি’—এবং তারা সেখানেই ফিরে যায়। অর্থাৎ তারা ব্ৰহ্ম থেকেই আসে, আবার ব্রহ্মেই ফিরে যায়। এ-ই তাদের সম্পর্ক। এর আগে উপনিষদ মাকড়সা এবং তার জালের দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন। মাকড়সা নিজের ভেতর থেকে জাল বের করে, আবার নিজের মধ্যেই সেই জাল গুটিয়ে নেয়। এই শ্লোকে উপনিষদ আগুন ও তার স্ফুলিঙ্গের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। আগুন ছাড়া স্ফুলিঙ্গের কোন অস্তিত্বই নেই। ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্কও সেই রকম। ব্রহ্মই এই জগতের উৎস, এই জগতের মূল। ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম সকল বস্তু ব্রহ্ম থেকেই এসেছে, এবং ব্রহ্মেই ফিরে যাবে। একটি কথা সবসময় মনে রাখতে হবে তা হল, বেদান্ত মতে সৃষ্টি বলে কিছু নেই। ‘শূন্য’ থেকে কিছু সৃষ্টি হতে পারে একথা বেদান্ত স্বীকার করেন না। জগৎ সৃষ্টি হয়নি, প্রকাশিত হয়েছে—এই হল বেদান্তের কথা। ব্রহ্মই জগতের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছেন।
ব্রহ্ম আছেন বলেই জগতে সব কিছু আছে। ব্রহ্ম নিত্য বিদ্যমান, সৎস্বরূপ। তাই ব্রহ্মকে সৎ বলা হয়। তাঁকে চৈতন্য বা চিৎও বলা হয়—তিনি শুদ্ধ চৈতন্য। ব্রহ্ম স্বরূপত সৎ এবং চিৎ। আমরা কোন ব্যক্তিকে দেখি, আবার একই সঙ্গে দেখি তিনি চলাফেরাও করছেন। অর্থাৎ তিনি চৈতন্যযুক্ত। এই চৈতন্য কোথা থেকে আসে? ব্রহ্ম থেকে। ব্রহ্মই তাঁর মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছেন। ব্যক্তিটি যেন তাঁর প্রকাশের একটি মাধ্যম, যেমন বৈদ্যুতিক আলো বা বাতির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকাশিত হয়। কিছু বাতি যেমন বেশি শক্তি-সম্পন্ন, ঠিক তেমনি মানুষের মধ্যেও কেউ কেউ বেশী শক্তিমান। আবার কিছু বাতির আলো ক্ষীণ, দুর্বল; তেমনি মানুষের মধ্যেও কিছু মানুষ আছেন যাঁরা দুর্বল। হিন্দু দর্শন বলে, যা কিছু আছে সবই চৈতন্য। চৈতন্য ছাড়া আর কিছুই নেই। এই চৈতন্য কোথাও প্রকাশিত, কোথাও বা অপ্রকাশিত। একটি কাঠের টুকরোকে আমরা জড় বলি। কিন্তু হিন্দু দর্শন মতে, ‘এ জড় নয়, চেতন। তবে চৈতন্য এখানে অপ্রকাশিত অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন রয়েছে।’ চৈতন্য সর্বত্র এবং সতত বিদ্যমান। এ জগৎ চৈতন্যে পূর্ণ। এই সর্বব্যাপী চৈতন্যই জগতের প্রাণ। চৈতন্যের প্রকাশের তারতম্যেই বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
এই চৈতন্যস্বরূপ আত্মাই দেহকে সচল রাখে। আত্মা বেরিয়ে গেলে হাত আর কাজ করে না, হৃদ্যন্ত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, মস্তিষ্ক অচল হয়ে যায়, শাসক্রিয়া স্তব্ধ হয়। এহেন অবস্থায় ব্যক্তিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। আত্মা দেহকে সক্রিয় রাখে। আত্মাই এই দেহের আশ্রয়। আত্মা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলে এই দেহের মৃত্যু হয়; দেহটি তখন খসে পড়ে। কাপড় ছিঁড়ে গেলে তা যেমন আমরা পরিত্যাগ করি, আত্মার দেহত্যাগও সেই রকম। একেই বলে মৃত্যু। আসলে আত্মার কিন্তু মৃত্যু হয় না।
জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে পার্থক্য আমাদের মনে রাখতে হবে। প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ এক একটি জীবাত্মা। কিন্তু পরমাত্মা এক ও অভিন্ন। নামরূপ আরোপিত হয়ে এক পরমাত্মা ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতিভাত হন। নামরূপের জন্যই আমরা নিজেদের একে অপরের থেকে পৃথক বলে মনে করি। বস্তুত আমরা আলাদা নই, সেই এক পরমাত্মা। একথা কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। উদ্ভিদ, প্রাণিকুল, এককথায় সব কিছুই এই নামরূপের বৈচিত্র মাত্র। নামরূপই পরমাত্মাকে সীমাবদ্ধ করে। নামরূপের কারণেই আমরা নিজেদের খণ্ডিত বলে মনে করি। সেহেতু আমাদের পরিচয়ও স্বতন্ত্র। কিন্তু নামরূপ তুলে নিলে থাকে শুধু এক ও অভিন্ন সত্তা, পরমাত্মা। যেমন স্ফুলিঙ্গ অগ্নির প্রকাশ, ঠিক তেমনি সকল জীবাত্মা সেই অভিন্ন পরমাত্মা তথা ব্রহ্মেরই প্রকাশ।
দিব্যো হ্যমূর্তঃ পুরুষঃ সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ।
অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রো হ্যক্ষরাৎপরতঃ পরঃ॥২।।
অন্বয়: [সঃ] দিব্যঃ (জ্যোতির্ময়); পুরুষঃ (পুরুষ); হি অমূর্তঃ (রূপহীন); সবাহ্যাভ্যন্তরঃ (বাইরে এবং ভিতরে); হি অজঃ (জন্মরহিত); অপ্রাণঃ (প্রাণ-রহিত [নিঃশ্বাস গ্রহণ করেন না]); হি অমনাঃ (মন বর্জিত); শুভ্রঃ (বিশুদ্ধ); হি অক্ষরাৎ (অক্ষর বা কার্য ব্রহ্ম থেকে); পরতঃ পরঃ (শ্রেষ্ঠ থেকেও শ্রেষ্ঠতর)।
সরলার্থ: এই জ্যোতির্ময় পুরুষের কোন রূপ নেই (অর্থাৎ তিনি নির্বিশেষ)। ইনি সর্বব্যাপী—বাইরেও আছেন, ভিতরেও আছেন। ইনি অজাত (অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টি হয়নি)। ইনি প্রাণবায়ু বর্জিত (কারণ ইনি দেহহীন, যেহেতু দেহ থাকলেই দেহের পরিবর্তন থাকবে), এঁর মনও নেই। ইনি শুদ্ধ (নির্গুণ)। এই স্থূল মায়া জগতের (নামরূপের জগৎ) ঊর্ধ্বে তিনি। এমনকি তিনি জগতের বীজরূপ অব্যক্ত প্রকৃতিরও ঊর্ধ্বে।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মের স্বরূপ কি? ‘দিব্যঃ’—জ্যোতির্ময়, দীপ্ত, উজ্জ্বল, এবং ‘অমূর্তঃ’—এঁর কোন রূপ নেই, ‘পুরুষঃ’—ব্রহ্ম সর্বভূতের অন্তরাত্মা। তিনি সর্বত্র রয়েছেন। ‘সবাহ্যাভ্যন্তরঃ’—তিনি সকল বস্তুর ভিতরেও আছেন বাইরেও আছেন। তিনি সর্বব্যাপী। ‘অজঃ’—তাঁর জন্ম নেই। আবার যাঁর জন্ম নেই তাঁর মৃত্যুও নেই। জীব হিসেবে আমরা সকলেই জন্মমৃত্যুর অধীন। কিন্তু পরমাত্মার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। ‘অপ্রাণঃ’—এর আক্ষরিক অর্থ যাঁর প্রাণবায়ু নেই। এর অন্য অর্থ— নিষ্ক্রিয়, দৈহিক কর্মবিহীন এবং অচঞ্চল। নিজে নিষ্ক্রিয় হয়েও ব্রহ্মই সকল কর্ম নিয়ন্ত্রিত করেন। একই ভাবে, ‘অমনাঃ’ কথাটির একটি অর্থ যাঁর মন নেই, মন বর্জিত; এর অপর অর্থ মনের ক্রিয়া যাঁর স্তব্ধ। ‘শুভ্রঃ’—অর্থাৎ নির্মল, শুদ্ধ এবং নির্বিশেষ। ব্রহ্ম তথা পরমাত্মা স্বাধীন, নির্গুণ, অপরিবর্তিত এবং অপরিবর্তনীয়। আমরা কিন্তু বাইরের অবস্থার উপর নির্ভরশীল। যেমন, আলোতে আমরা দেখতে পাই; কিন্তু রাতের অন্ধকারে আমরা অন্ধ। পরমাত্মা কিন্তু বাইরের কোন অবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হন না।
‘অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ’—সেই নির্গুণ ব্রহ্ম সগুণ ব্রহ্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাহলে দেখা যাচ্ছে ব্রহ্ম একযোগে সগুণ এবং নির্গুণ। ব্রহ্মকে যখন এই জগৎ-রূপে চিন্তা করি, তখন তাঁকে বলি সগুণ ব্রহ্ম। সগুণ ব্রহ্মই এই জগৎ হয়েছেন। কিন্তু যখন জগতের কথা বাদ দিয়ে শুদ্ধ ব্ৰহ্মকে চিন্তা করি তখন তিনি পরঃ অর্থাৎ পরম্। তখন তিনি নির্গুণ ব্রহ্ম। আসলে দুই-ই অভিন্ন। ব্রহ্মকে গুণের দ্বারা বিশেষিত করলে তিনি সগুণ, আর গুণবর্জিত অর্থাৎ নির্বিশেষ রূপে চিন্তা করলে ব্রহ্ম নির্গুণ। অক্ষর বলতে সগুণ ব্রহ্মকে বোঝায়, যদিও এই সব গুণ তখনও বীজাকারে রয়েছে। অক্ষরকে অব্যক্ত বা প্রকৃতিও বলা হয়। সগুণ ব্রহ্ম নিজেকে এই স্থূল নামরূপের জগৎ-রূপে পূর্ণ প্রকাশ করেন এবং অক্ষর এই জগতের ঊর্ধ্বে। ব্রহ্ম তথা পুরুষ আবার এই অক্ষরের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। ইনি-ই শুদ্ধ চৈতন্য তথা নির্গুণ ব্রহ্ম।
এই পরম সত্যকে কিভাবে বর্ণনা করব তা আমরা জানি না। আর সেই জন্যেই আমরা তাঁর উপর নানা গুণ আরোপ করি। আমরা বলি ঈশ্বর মঙ্গলময়। কিন্তু কেমন করে বুঝব তিনি মঙ্গলময়? বস্তুত তা আমরা বুঝতে পারি না। এই গুণ আমরা ঈশ্বরের উপর আরোপ করি মাত্র। এইভাবে গুণের দ্বারা বিশেষিত না করে আমরা ঈশ্বর বা আত্মা সম্পর্কে কিছুই বলতে পারি না। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, এই জগতের কথা চিন্তা করতে গিয়ে আমরা ঈশ্বরের উপর সৃষ্টিকর্তার ভূমিকা আরোপ করি। আমরা বলি, তিনিই জগৎকে প্রকাশ করেছেন। তিনি তখন সগুণ। আমরা তাঁকে বিশেষিত করছি। আবার যখন উপনিষদ বলেন যে, জ্বলন্ত আগুন থেকে যেমন স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয় তেমন ভাবেই এই জগৎ ও তার সব বস্তু ব্রহ্ম থেকে আসে, তখন এই ব্রহ্মই সগুণ ব্রহ্ম। নির্গুণ ব্রহ্মকে কোনভাবেই জানা যায় না। তাঁর সম্পর্কে আমরা কিছু বলতে পারি না। এই জন্যই এখানে উপনিষদ বলছেন— ‘অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ’। নির্গুণ ব্রহ্মই পরম এবং সর্বোচ্চ।
এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্বেন্দ্রিয়াণি চ।
খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী॥৩।।
অন্বয়: এতস্মাৎ (এর থেকে অর্থাৎ অক্ষর ব্রহ্ম থেকে); প্রাণঃ (প্রাণ); মনঃ (মন); সর্বেন্দ্রিয়াণি (সকল ইন্দ্রিয়); খম্ (আকাশ); বায়ুঃ (বায়ু); জ্যোতিঃ (তেজ); আপঃ (জল); চ (এবং); বিশ্বস্য (বিশ্বের); ধারিণী (ধারক); পৃথিবী (পৃথিবী); জায়তে (উদ্ভূত হয়েছে)।
সরলার্থ: প্রাণ, মন, সকল ইন্দ্রিয়, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল এবং সর্ববস্তুর আশ্রয় এই পৃথিবী, সব এর থেকেই (অর্থাৎ সগুণ ব্রহ্ম থেকে) এসেছে।
ব্যাখ্যা: উপনিষদ বলছেন, সব কিছু এসেছে এর থেকে (এতস্মাৎ) অর্থাৎ সগুণ ব্রহ্ম থেকে। প্রাণ, মন, সকল ইন্দ্রিয়, আকাশ, বায়ু, জ্যোতি (অগ্নি), জল এবং পৃথিবী—এককথায় পঞ্চভূত এই সগুণ ব্রহ্ম থেকে এসেছে। পৃথিবীকে বলা হচ্ছে ‘বিশ্বস্য ধারিণী’ অর্থাৎ সর্ববস্তুর আশ্রয়। এই দৃশ্যমান সমগ্র জগৎ ও তার অন্তর্গত নরনারী, উদ্ভিদ, পশু, সব কিছুকে পৃথিবী ধারণ করে আছে। পৃথিবী এই দৃশ্যমান জগতের প্রতিষ্ঠাভূমি। কিন্তু মূলত সকল বস্তুই এসেছে ব্রহ্ম থেকে। ব্রহ্মই সকল বস্তুর মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
একটি কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, এই জগৎ ব্রহ্মে আরোপিত। বেদান্তে একটি সহজ উপমা পাই—রজ্জু-সর্পের উপমা। মাটিতে দড়ি পড়ে আছে, অন্ধকারে দেখে মনে হল সাপ। ভয়ে চীৎকার করে উঠলাম। কিন্তু সেটা আদৌ সাপ ছিল না, দড়ি ছিল। কিন্তু ভুলবশত মনে করেছি সাপ। এই জগৎও সেই রকম। সাপ যেমন দড়িতে আরোপিত, ঠিক তেমনি এই জগৎও ব্রহ্মে আরোপিত। আসল কথা, ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নেই।
আর একটি উপমা দেওয়া যেতে পারে। সম্ভবত এই উপমাটি বেশী উপযুক্ত—পর্দায় ফেলা চলমান ছায়াছবি। দর্শকের আসনে বসে আমরা পর্দার উপর কত বিচিত্র দৃশ্যই না দেখি। তা কখনও হাস্যকর, কখনও বা সংঘাতের। সেগুলি দেখে মনে নানাপ্রকার আবেগের সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সব দৃশ্য তো সত্য নয়। তবে সত্য কি? পেছনের পর্দাটিই সত্য। পর্দা আধার, আর চলমান ছবিগুলি তার উপর আরোপিত। পর্দা ছাড়া এই সব ছবির কোন অস্তিত্বই নেই। একই ভাবে বলা যায়, ব্রহ্ম ছাড়া, পরমাত্মা ছাড়া এ জগতের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। পরমাত্মাই প্রতিষ্ঠাভূমি, পরমাত্মাই আশ্রয়, আর সমগ্র জগৎ তাঁতে আশ্রিত। আত্মাকে সরিয়ে নিলে জগতের কোন অস্তিত্বই থাকে না। শ্রীরামকৃষ্ণ ‘১’ সংখ্যার উদাহরণ দিতেন। একের পিঠে একটি শূন্য যোগ করলে পাই ১০, আর একটি যোগ করলে পাই ১০০, তারপর ১০০০। কিন্তু ১ সংখ্যাটি সরিয়ে নিলে থাকে শুধুই শূন্য, অর্থাৎ কিছুই থাকে না। সেই ‘১’ সংখ্যাটি হল ব্রহ্ম। ব্রহ্মকে বাদ দিলে জগৎ বলতে আর কিছুই থাকে না।
অগ্নির্মূর্ধা চক্ষুষী চন্দ্ৰসূর্যৌ
দিশঃ শ্রোত্রে বাগ্নিবৃতাশ্চ বেদাঃ।
বায়ুঃ প্রাণো হৃদয়ং বিশ্বমস্য
পদ্ভ্যাং পৃথিবী হ্যেষ সর্বভূতান্তরাত্মা॥৪।।
অন্বয়: অস্য (যাঁর); অগ্নিঃ (দ্যুলোক); মূর্ধা (মস্তক); চন্দ্ৰসূর্যৌ (চাঁদ এবং সূর্য); চক্ষুষী (দুটি চোখ); দিশঃ (দিক সমূহ); শ্রোত্রে (দুটি কান); চ (এবং); বিবৃতাঃ বেদাঃ (প্রকটিত বেদ সমূহ); বাক্ (বাক্য); বায়ুঃ (বায়ু); প্রাণঃ (প্রাণ); বিশ্বম্ (বিশ্ব); হৃদয়ম্ (হৃদয়); পৃথিবী (পৃথিবী); পদ্ভ্যাম্ (দুটি পায়ের জন্য [অর্থাৎ দুটি পায়ের জন্যই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে]); এষঃ হি (ইনিই); সর্বভূতান্তরাত্মা (সর্বভূতের অন্তরাত্মা)।
সরলার্থ: স্বর্গ তাঁর মস্তক, চন্দ্র সূর্য তাঁর দুই চোখ, দিক সকল তাঁর দুই কান, প্রকটিত বেদসমূহ তাঁর বাক্য, বায়ু তাঁর নিঃশ্বাস, বিশ্ব তাঁর হৃদয় এবং তাঁর চরণ-যুগলের জন্যই এই পৃথিবী। তিনিই সর্বভূতের অন্তরতম আত্মা।
ব্যাখ্যা: আমাদের সম্মুখে ছড়ানো রয়েছে এই সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু পৃথিবীর সামগ্রিক রূপ আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। এর সামান্য অংশ মাত্র আমরা দেখতে পাই। আমরা জানি, আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে অন্যান্য বহু ছায়াপথ রয়েছে। সূর্যকে দেখে আমাদের মনে হয়: ‘আহা! কি অপূর্ব!’ কিন্তু আবার একথাও জানি যে, এই সূর্যের চেয়ে বৃহত্তর এবং আরও শক্তিশালী অনেক সূর্য আছে। উপনিষদ আমাদের কল্পনা করতে বলছেন, দ্যুলোক (অগ্নিঃ) ব্রহ্মের মস্তক (মূর্ধা) মাত্র। চন্দ্রাতপ সদৃশ নক্ষত্র-খচিত আকাশ তাঁর শির, সূর্য এবং চন্দ্র তাঁর দুই চোখ, চারটি দিক (দিশঃ) তাঁর কান। ‘বিবৃতাঃ বেদাঃ’—ব্রহ্মের বাক্-রূপে বেদসমূহের প্রকাশ। ‘বায়ুঃ প্রাণঃ’—বাতাস তাঁর প্রাণবায়ু এবং এই বিশ্ব তাঁর হৃদয়। ‘পদ্ভ্যাং পৃথিবী’—তাঁর পদযুগলের জন্য এই পৃথিবী। ‘এষঃ সর্বভূতান্তরাত্মা’—তিনিই সর্ববস্তুর অন্তরাত্মা, আদি কারণ, সারাৎসার। জগতে সকল অস্তিত্বের মূল এই ব্রহ্মোই প্রতিষ্ঠিত।
তস্মাদগ্নিঃ সমিধো যস্য সূর্যঃ।
সোমাৎপর্জন্য ওষধয়ঃ পৃথিব্যাম্।
পুমান্ রেতঃ সিঞ্চতি যোষিতায়াং
বহ্বীঃ প্রজাঃ পুরুষাৎসংপ্রসূতাঃ॥৫।।
অন্বয়: তস্মাৎ (তাঁর থেকে [অর্থাৎ সেই পুরুষ থেকে]); অগ্নিঃ (দ্যুলোক [জন্ম নেয়]); যস্য (যার অর্থাৎ এই দ্যুলোকের); সমিধঃ (ইন্ধন [হল]); সূর্যঃ (সূর্য); সোমাৎ ([দ্যুলোক থেকে যার জন্ম] সেই চন্দ্র থেকে); পর্জন্যঃ (মেঘ [অর্থাৎ বৃষ্টি হয়]); পৃথিব্যাম্ (পৃথিবীতে); ওষধয়ঃ (ওষধি বৃক্ষসমূহ); [জন্মায়] পুমান্ (মানুষ); যোষিতায়াম্ (স্ত্রীতে); রেতঃ (শুক্র); সিঞ্চতি (সিঞ্চন করে); [এই রূপে] পুরুষাৎ (পরমপুরুষ অক্ষর থেকে); বহ্বীঃ (অনেক); প্রজাঃ ( জীবসমূহ); সংপ্রসূতাঃ (জন্ম নেয়)।
সরলার্থ: সূর্য যেন ওই অগ্নির (অর্থাৎ দ্যুলোকের) ইন্ধন। ওই অগ্নি বা দ্যুলোক এই মহান পুরুষ থেকে এসেছে। চন্দ্র এসেছে দ্যুলোক থেকে এবং বৃষ্টি চন্দ্র থেকে। আবার এই বৃষ্টি থেকে পৃথিবীতে শস্যাদির জন্ম। শস্য থেকে উৎপন্ন পুরুষবীর্য রমণীতে সিঞ্চিত হয়। এইভাবে সেই মহান পুরুষ (হিরণ্যগর্ভ, সগুণ ব্রহ্ম, পরমাত্মা) থেকে পরম্পরাক্রমে সর্ব বস্তুর উদ্ভব।
ব্যাখ্যা: ধরা যাক, কোন সৎ ব্যক্তি যজ্ঞকর্ম সম্পাদন করেছেন। মৃত্যুর পরে তিনি স্বর্গলোকে যাবেন এবং কিছু কাল স্বর্গসুখ ভোগ করবেন। কিন্তু সৎকর্মের ফল নিঃশেষিত হলে তাঁকে আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হবে। এই প্রত্যাবর্তন কি ভাবে হয়? উপনিষদ বলেন, মৃত্যুর পর মানুষ প্রথমে মেঘলোকে যায়। মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি হয় তখন সেই বৃষ্টিধারার সঙ্গে সে পৃথিবীতে নেমে আসে। সেই বৃষ্টির জল উদ্ভিদ শোষণ করে। সেই সঙ্গে জীবের সূক্ষ্ম দেহও উদ্ভিদে প্রবেশ করে। সেই উদ্ভিদজাত শস্য নরনারী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সেখান থেকেই আবার মানুষের পুনর্জন্ম হয়। পুনর্জন্ম প্রক্রিয়াটি এখানে এই ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কেউ কেউ বলতেই পারেন, ব্যাখ্যাটি বিজ্ঞানভিত্তিক নয়, অতএব অগ্রাহ্য। কিন্তু এখানে মূল কথাটি হল, মানুষের পুনর্জন্ম হয় এবং এর থেকে তার সহজে নিস্তার নেই। কিভাবে পুনর্জন্ম ঘটে সে প্রসঙ্গ আলাদা।
‘প্রজাঃ’ অর্থাৎ যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে; ‘বহ্বীঃ’—বহু। এই সব কিছু কোথা থেকে আসে? পুরুষ তথা ব্রহ্ম থেকে। মাকড়সা যেমন জাল বিস্তার করে এবং সেই জাল ক্রমশ বড় হতে থাকে ঠিক তেমনি ব্রহ্ম যেন নিজেকে বিস্তার করেছেন। এই ভাবে প্রাণী পরম্পরার মধ্য দিয়ে ব্রহ্ম আপনাকে প্রকাশ করেন।
তস্মাদৃচঃ সাম যজূংষি দীক্ষা
যজ্ঞাশ্চ সর্বে ক্রতবো দক্ষিণাশ্চ।
সংবৎসরশ্চ যজমানশ্চ লোকাঃ
সোমো যত্র পবতে যত্র সূর্যঃ॥৬।।
অন্বয়: তস্মাৎ (তাঁর থেকে [সেই পুরুষ থেকে]); ঋচঃ (ঋক্-বেদ); সাম (সাম বেদ); যজূংষি (যজুর্বেদ); দীক্ষা ([যজ্ঞকর্ম আরম্ভ করার পূর্বে] দীক্ষা); যজ্ঞাঃ (অগ্নিহোত্রাদি কর্ম); চ (এবং) সর্বে ক্রতবঃ (যজ্ঞসমূহ [যেখানে পশুবলি দেওয়া হয়]); চ (এবং); দক্ষিণাঃ ([দিক্ষিণাসমূহ যা যজ্ঞের অঙ্গ]); চ (এবং); সংবৎসরঃ (শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী যজ্ঞের কাল); যজমানঃ (যজমান); চ (এবং); লোকাঃ (কর্মফলরূপ লোকসমূহ); যত্র (যেখানে বা যে লোকে); সোমঃ (চন্দ্র); পবতে (পবিত্র করে); যত্র সূর্যঃ (যেখানে বা যে লোকে সূর্য); [তপতে (তাপ দেয়, আলোকিত করে)।
সরলার্থ: সেই পুরুষ থেকে সবকিছুর উৎপত্তি। যথা: ঋক্, সাম এবং যজুঃ বেদ, দীক্ষা (অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞ শুরু করার আগে যে মঙ্গলাচরণ করা হয়) সম্বন্ধে জ্ঞান, পশুবলি, দক্ষিণা দান (যা সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অঙ্গ; অর্থ বা পশু ইত্যাদি দক্ষিণা যা ঋত্বিককে দেওয়া হয়), শাস্ত্রমতে যজ্ঞের সময় সীমা, যজমানের যজ্ঞ করার যোগ্যতা এবং যজ্ঞকর্মের ফল রূপ লোকসমূহ। চন্দ্র যেসব লোক পবিত্র করে (যেমন দেবলোক) এবং সূর্য যেসব লোক (যথা পিতৃলোক) আলোকিত করে সবই ব্রহ্ম থেকে এসেছে।
ব্যাখ্যা: এই উপনিষদের প্রথম প্রশ্ন ছিল—‘কি বা কাকে জানলে সব কিছুকে জানা যায়?’ উপনিষদের উত্তর : ব্রহ্ম, কারণ ব্রহ্ম থেকেই সব কিছু আসে। ‘তস্মাৎ’—তাঁর থেকে অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে বেদসকল যথা ঋক্-বেদ, সামবেদ ও যজুর্বেদ এসেছে। বেদসমূহের পর এসেছে ‘দীক্ষা’, যার অর্থ যজ্ঞ করার অধিকার অর্জনের জন্য দীক্ষা পাওয়া। দীক্ষার অপর অর্থ যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রাক্ প্রস্তুতি রূপে যজ্ঞের পূর্বে অন্যান্য অনুষ্ঠান করা—যেমন সঙ্কল্প গ্রহণ অর্থাৎ যজ্ঞ সম্পাদনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ; ‘ক্রতবঃ’—পশুবলি সহ অনুষ্ঠান; ‘দক্ষিণাঃ’— ব্রাহ্মণকে দান না করে কোন যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয় না। অর্থদান, বস্ত্রদান, গোদান এসবই দক্ষিণার অন্তর্গত। ‘সম্বৎসরঃ’—যজ্ঞের যথাবিধি সময়সীমা। এমন যজ্ঞ আছে যা শেষ করতে বছর ঘুরে যায়। আবার কিছু যজ্ঞ এক ঘণ্টা বা কয়েক ঘণ্টায় সম্পন্ন হয়। ‘যজমান’—যিনি যজ্ঞ করেন। ‘লোকাঃ’—বিভিন্ন লোক (স্বর্গলোক, চন্দ্রলোক ইত্যাদি)। যজ্ঞের ফল অনুযায়ী মৃত্যুর পর যজমান বিশেষ বিশেষ লোকে যান। উপনিষদে সোম অর্থাৎ চন্দ্রলোক এবং সূর্যলোকের উল্লেখ আছে। বেদসমূহ, যজ্ঞাদি, যজমান এবং যজ্ঞফল সবই ব্ৰহ্ম থেকে উদ্ভূত — এই হল উপনিষদের বক্তব্য।
উপনিষদে একই কথার পুনরাবৃত্তি আমাদের কিছুটা বিস্মিত করে। কিন্তু উপনিষদ মনে করেন, বারবার আমাদের একথা স্মরণ করিয়ে না দিলে আমরা ভুলে যেতে পারি। কেন আমরা ভুলে যাই? কঠ উপনিষদ বলছেন, চোখ কান ইত্যাদি সকল ইন্দ্রিয়ই স্বভাবত বহির্মুখী। সেই কারণে বাইরের জগতের প্রতি আমরা আকৃষ্ট হই এবং একই সঙ্গে এই আকর্ষণের মূল উৎসকে আমরা ভুলে যাই। এই জন্য উপনিষদ বলছেন : ‘হ্যাঁ, এই জগৎ বড় সুন্দর, বড় চমৎকার। কিন্তু মনে রেখো, ব্রহ্ম আছেন বলেই জগৎকে এত সুন্দর লাগে, কারণ সব বস্তুর মধ্যে ব্রহ্মই রয়েছেন।’ জগতের সকল অস্তিত্ব ব্রহ্মের উপর নির্ভরশীল। যদি এ সত্যকে অস্বীকার করি, ব্রহ্মকে যদি দেখতে না পাই, তবে সে ভুল আমাদের। এই মূল সত্যের দিকেই উপনিষদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। সেই জন্যই উপনিষদকার বহু যত্নে এই দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছেন। নয়তো আমরা মূল সত্যটি ভুলে যাব।
এক জায়গায় উপনিষদ পর্বতের গা বেয়ে বৃষ্টিধারা নেমে আসার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। যে কোন পার্বত্য অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাতের সময়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। পর্বতের ঢাল বেয়ে শত শত জলধারা নেমে আসে। পরে সেগুলি একত্র হয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে। তারপর দীর্ঘ পথ পার হয়ে শেষে সাগরে বিলীন হয়। এই জলধারাগুলির বৈচিত্র লক্ষ্য করার মতো। এক একটি জলধারা এক একজন মানুষের প্রতীক। এই জগতে বহু মানুষের বাস এবং প্রত্যেকেরই নাম ও রূপ স্বতন্ত্র। এর উপর আবার আছে নানা উপাধি অর্থাৎ গুণ। কেউ ফরসা, কেউ কালো; কেউ বিদ্বান, কেউ বা অশিক্ষিত। কিন্তু এ সবই উপাধি। উপনিষদের মতে, এই সব খুঁটিনাটি একেবারেই গৌণ। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে আছেন শুধু ব্রহ্ম। লম্বা-বেঁটে, ফরসা- কালো, নারী-পুরুষ—সবই সেই এক ব্রহ্ম। ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নেই। সেই এক ব্রহ্মই নানা রূপে, নানা নামে, নানা উপাধিতে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
উপনিষদ আবার বলছেন, ‘এই জগতের বৈচিত্রের দিকে তাকিয়ে দেখ—সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, অগ্নি সব নিয়ে এই বিশাল জগৎ। এর স্বরূপ কি? স্বরূপত এই জগৎ ব্ৰহ্ম বৈ কিছু নয়।’ স্ফুলিঙ্গ যেমন জ্বলন্ত আগুন থেকে বেরোয় এই জগৎও তেমনি ব্রহ্ম থেকে বেরিয়েছে। সর্বত্র সেই একই আত্মা বিরাজিত। নরনারী, উদ্ভিদ, প্রাণিকুল, আকাশ-বাতাস সর্বত্র সেই এক পুরুষ, এক অন্তরাত্মা বিদ্যমান—একই ব্রহ্ম নানারূপে। পশু, মানুষ, নারী এভাবে পৃথক করে না দেখে সবাইকে ব্রহ্মরূপে দেখতে হবে। এমন করে যিনি দেখতে পারেন তাঁরই জ্ঞান হয়েছে। যদি এক ব্রহ্মকে না দেখে বহু দেখি তবে সেটা আমার ভুল। ‘একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ’—সকলের মধ্যে এক অন্তরাত্মাকে দেখ। তবেই তুমি মুক্ত। তুমি যথার্থ জ্ঞানী। দুর্ভাগ্যবশত আমরা বহু দেখি। আর সেহেতু একজনকে বলি বন্ধু, আর একজনকে শত্রু। এইভাবে আমরা অনুরাগ- বিরাগের ঘূর্ণাবর্তে আবদ্ধ হই। অধিকাংশ মানুষের জীবন এভাবেই কেটে যায়। কিন্তু উপনিষদ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, বৈচিত্রের মধ্যে বহুর মধ্যে সেই এককে দেখতে হবে। এই এক জ্ঞানই যথার্থ জ্ঞান।
উপনিষদ আমাদের আরও একটি নির্দেশ দিচ্ছেন। আমাদের ফিরে তাকাতে বলছেন মূল উৎসের দিকে। ধরা যাক কোন বই পড়ে আমি অনেক অজানা তথ্য জানতে পেরেছি। লেখকের পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু উপনিষদ বলছেন: ‘একেবারে উৎসমুখে চলে যাও। গ্রন্থকার কোথা থেকে এ জ্ঞান লাভ করলেন? ব্রহ্ম থেকে।’ গ্রন্থকার ও তাঁর লেখা বই থেকে যে জ্ঞান আমার মধ্যে এসেছে তার উৎস সেই একই ব্রহ্ম, একথা যেন ভুলে না যাই।
তস্মাচ্চ দেবা বহুধা সংপ্রসূতাঃ
সাধ্যা মনুষ্যাঃ পশবো বয়াংসি।
প্রাণাপানৌ ব্রীহিযবৌ তপশ্চ
শ্রদ্ধা সত্যং ব্রহ্মচর্যং বিধিশ্চ॥৭।।
অন্বয়: তস্মাৎ চ (এবং তাঁর থেকে [অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে]); বহুধা (বহু প্রকার); দেবাঃ ([বসু প্রভৃতি] দেবতাগণ); সংপ্রসূতাঃ (সম্যক্-রূপে উৎপন্ন হয়েছে); সাধ্যাঃ (সাধ্য দেবতাগণ); মনুষ্যাঃ (মানুষেরা); পশবঃ (পশুসমূহ); বয়াংসি (পাখীরা); প্রাণাপানৌ (প্রাণ এবং অপানবায়ু; ব্রীহিযবৌ (ধান ও যব); তপঃ (তপস্যা); শ্রদ্ধা (আস্তিক্য বুদ্ধি; বিশ্বাস); সত্যম্ (সত্য); ব্রহ্মচর্যম্ (ব্রহ্মচর্য); চ (এবং); বিধিঃ (শাস্ত্রের নিয়ম [সম্যক্-রূপে উৎপন্ন হয়েছে])।
সরলার্থ: সেই পুরুষ (হিরণ্যগর্ভ) থেকে বিবিধ দেবদেবী ও বসুগণ এসেছেন। এভাবে পরপর এসেছেন সাধ্যগণ (অন্যান্য দেবদেবীর চেয়ে উচ্চস্তরের দেবতা, সংখ্যায় বারজন), মানুষ, প্রাণী বর্গ, পক্ষিকুল, প্রাণ ও অপানরূপ শ্বাসবায়ু, ধান-গম, তপস্যা, শ্রদ্ধা, সত্য, ব্রহ্মচর্য, এবং শাস্ত্রবিধি সকল।
ব্যাখ্যা: এই সব কিছু, জগৎ ও তার সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়সকল ব্রহ্ম থেকে এসেছে। উপনিষদ বলছেন, ব্রহ্মকে জানলেই সব জানা যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ উপমা দিচ্ছেন—হাঁড়িতে ভাত রান্না হচ্ছে। ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা জানতে গেলে এক কণা ভাত টিপে দেখলেই যথেষ্ট; নরম হলে বোঝা যায় ভাত তৈরী। হাঁড়ির সব ভাত আলাদাভাবে টিপে দেখার প্রয়োজন হয় না। ব্রহ্মের বেলাতেও একই কথা খাটে। উপনিষদ বলছেন, জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় জানার প্রয়োজন নেই। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, দেবদেবী, পঞ্চভূত, নরনারী, জীবজন্তু, উদ্ভিদ জগৎ—এই সব কিছুর মধ্য দিয়েই ব্রহ্মের প্রকাশ। সেইজন্য ব্রহ্মকে জানলেই সব জানা হয়ে যায়।
সপ্ত প্রাণাঃ প্রভবন্তি তস্মাৎ
সপ্তার্চিষঃ সমিধঃ সপ্ত হোমাঃ।
সপ্ত ইমে লোকা যেষু চরন্তি প্রাণা
গুহাশয়া নিহিতাঃ সপ্ত সপ্ত॥৮।।
অন্বয়: তস্মাৎ (তাঁর থেকে [অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে]); সপ্ত প্রাণাঃ (সাতটি ইন্দ্রিয় [দুই চোখ; দুই নাসারন্ধ্র; দুই কান এবং মুখ]); প্রভবন্তি (উদ্ভূত হয়েছে); সপ্ত অর্চিষঃ ([এই ইন্দ্রিয়গুলির] সাতটি বিষয়); সমিধঃ (ইন্ধন অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু); সপ্ত (সাতটি); হোমাঃ (এইসব বিষয়ের জ্ঞান); ইমে সপ্ত লোকাঃ (প্রাণী-দেহের অভ্যন্তরে সাতটি ইন্দ্রিয়ের যে অবস্থান); যেযু (যাতে); সপ্ত সপ্ত নিহিতাঃ (সাতটি সাতটি করে এই ইন্দ্রিয়গুলি [ঈশ্বর] প্রাণী-দেহে স্থাপন করেছেন); গুহাশয়াঃ ([সুষুপ্তিতে] হৃদয়ে লীন হয়ে থাকে); প্রাণাঃ (সাতটি ইন্দ্রিয়); চরন্তি (বিচরণ করে)।
সরলার্থ: সেই ব্রহ্ম থেকেই সাতটি ইন্দ্রিয়ের উদ্ভব। এই সাত ইন্দ্রিয়ের সাতটি বিষয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসকল, সাত প্রকার বিষয় জ্ঞান, জীবদেহে এই সাত ইন্দ্রিয়ের সাতটি অধিষ্ঠান—এ সবই ব্ৰহ্ম থেকে এসেছে। নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ইন্দ্রিয়সকল আত্মায় বিলীন হয়। আত্মা তখন (যেমন সুষুপ্তিকালে) হৃদয়াকাশে বিরাজ করেন।
ব্যাখ্যা: সাতটি প্রাণ কি কি? এগুলি হল ইন্দ্রিয়—দুটি চোখ, দুটি কান, দুটি নাসারন্ধ্র এবং জিভ। এই জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘অর্চিষঃ’—কথাটির অর্থ শিখা, আলো বা কিরণ। এই ইন্দ্রিয়গুলির যেন শিখা বা কিরণ রয়েছে এবং তারা অনুভব করতে পারে। যেমন, আমরা যখন জিভ দিয়ে কোন স্বাদ গ্রহণ করি তখন আমরা কিসের স্বাদ পাচ্ছি তা বুঝতে পারি। ‘সমিধঃ’ বলতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে বোঝানো হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে ‘সমিধঃ’ কথাটির অর্থ ইন্ধন। যেমন, আগুন জ্বালাতে ইন্ধন লাগে। ইন্দ্রিয়গুলি যেন যজ্ঞ করছে। কি ভাবে? ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা যা কিছু করি তা এক ধরনের যজ্ঞ। গীতাতেও একটি শ্লোকে আছে, ‘ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিঃ…’ অর্থাৎ আমরা যা কিছু করি তা ব্রহ্মের উদ্দেশে যজ্ঞ বিশেষ। সবকিছু ব্রহ্ম থেকে আসে, আবার ব্রহ্মেই ফিরে যায়। যা কিছু দেখি সবই ব্রহ্ম। যজ্ঞের কুশি (অর্থাৎ তামার পাত্র বিশেষ যা দিয়ে আহুতি দেওয়া হয়), যজ্ঞের আহুতি, যজ্ঞাগ্নি এবং ঋত্বিক—সব ব্রহ্ম। ব্রহ্ম বৈ আর কিছুই নেই। ‘সব কিছু ব্রহ্মে সমর্পিত’, এই সত্যকে যদি ধ্যান করা যায়, যদি স্বয়ং ব্রহ্মরূপে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা যায় তবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। ইন্দ্রিয়গুলি যে কেবলমাত্র ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে তা নয়, তারা যা কিছু গ্রহণ করে তাও ব্রহ্মের উদ্দেশে নিবেদন করে। এমন নয় যে, আমি ব্রহ্মকে ঘ্রাণে গ্রহণ করছি, ব্রহ্মই ব্ৰহ্মকে আঘ্রাণ করছেন। একইভাবে ব্রহ্মই ব্রহ্মকে দেখছেন, ব্রহ্মই ব্রহ্মকে খাচ্ছেন। ওই ব্রহ্ম চলেছেন। কোথায় চলেছেন? ব্রহ্ম ব্রহ্মের কাছেই যাচ্ছেন। ব্রহ্মেই যাত্রার আরম্ভ, আবার ব্রহ্মেই পরিসমাপ্তি। এক ব্রহ্মই কেবল আছেন।
যেহেতু আমরা যা কিছু করি তা-ই যজ্ঞ, সেহেতু আমাদের সকল কর্মই উপাসনা। আমাদের কোন কিছুই ধর্মকে বাদ দিয়ে নয়। সবই আধ্যাত্মিক। সুতরাং সব কাজ আমাদের অতি যত্ন সহকারে করতে হবে। এমন ভাবে কাজ করতে হবে যা আমাদের আত্মজ্ঞানের লক্ষ্যে এগিয়ে দেয়।
অতঃ সমুদ্রা গিরয়শ্চ সর্বেঽস্মাৎ
স্যন্দন্তে সিন্ধবঃ সৰ্বরূপাঃ।
অতশ্চ সব ওষধয়ো রসশ্চ
যেনৈষ ভূতৈস্তিষ্ঠতে হ্যন্তরাত্মা॥৯।।
অন্বয়: অতঃ (এই পুরুষ [ব্রহ্ম] থেকে); সর্বে (সকল); সমুদ্রাঃ (সমুদ্র সমূহ); চ (এবং); গিরয়ঃ (পর্বত সমূহ [জন্মেছে]); অস্মাৎ (এই পুরুষ থেকে); সর্বরূপঃ সিন্ধবঃ (ছোট বড় নদী সমূহ); স্যন্দন্তে (প্রবাহিত হয়); অতঃ চ (এবং এই পুরুষ থেকে); সর্বাঃ (সকল); ওষধয়ঃ (ধানযব বৃক্ষলতা ইত্যাদি); চ (এবং); রসঃ (সব রস); যেন হি (যাঁর দ্বারা); এষঃ অন্তরাত্মা (এই অন্তরাত্মা); ভূতৈঃ (পঞ্চভূতের দ্বারা বেষ্টিত); তিষ্টতে (থাকেন)।
সরলার্থ: এই ব্রহ্ম থেকেই বিশাল সমুদ্র ও পর্বতমালা এসেছে এবং নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। ধানযবাদি সমুদয় বৃক্ষলতা এবং মধু ইত্যাদি সকল প্রকার খাদ্যরস এই ব্রহ্ম থেকেই উৎপন্ন। ব্রহ্ম আছেন বলেই সব কিছু আছে। ব্রহ্মই সকল বস্তুকে একসঙ্গে ধরে রেখেছেন। সূক্ষ্ম কোষ রূপে খাদ্যরসই অন্তরাত্মাকে বেষ্টন করে আছে।
ব্যাখ্যা: অন্তরাত্মা বলতে কী বোঝায়? আমাদের এই দেহ স্থূল। স্থূল শরীরের মধ্যে আছে সূক্ষ্ম শরীর। এই সূক্ষ্ম শরীরকে অন্তরাত্মাও বলা হয়। পঞ্চভূত ছাড়া স্থূলদেহ থাকতে পারে না। অর্থাৎ খাদ্য পানীয় ছাড়া স্থূলদেহ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই জন্যই স্থূলদেহকে অন্নময় কোষ বলা হয়। খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে স্থূলদেহের মৃত্যু হয়। খাদ্য পানীয় রূপে পঞ্চভূত এই স্থূলদেহকে পরিপুষ্ট করে। আর এই দেহের অভ্যন্তরে আছেন অন্তরাত্মা। স্থূলদেহ ও আত্মার মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম শরীরই অন্তরাত্মা। সূক্ষ্মরূপে পঞ্চভূত [অর্থাৎ তন্মাত্রা] এই অন্তরাত্মাকে ধারণ করে আছে।
পুরুষ এবেদং বিশ্বং কর্ম তপো ব্রহ্ম পরামৃতম্।
এতদ্যো বেদ নিহিতং গুহায়াং সোঽবিদ্যাগ্রন্থিং
বিকিরতীহ সোম্য॥১০।।
অন্বয়: পুরুষঃ এব (সেই পুরুষই); ইদম্ (এই); বিশ্বম্ (বিশ্ব); কর্ম (যজ্ঞাদি কর্ম); তপঃ (তপস্যা); [তিনিই] ব্ৰহ্ম (ব্রহ্ম); পর অমৃতম্ (পরম অমৃত); এতৎ পরামৃতং ব্রহ্ম (এই পরম, আনন্দঘন ব্রহ্মকে); যঃ (যিনি); গুহায়াম্ (হৃদয়গুহাতে); নিহিতম্ (নিহিত রূপে); বেদ (জানেন); সঃ (তিনি); সোম্য (হে সৌম্য); ইহ (ইহলোকেই); অবিদ্যাগ্রন্থিম্ (অবিদ্যারূপ বন্ধনকে); বিকিরতি (অতিক্রম করেন)।
সরলার্থ: এই ব্রহ্মই বিশ্ব। তিনিই অগ্নিহোত্রাদি সকল প্রকার কর্ম। তিনি জ্ঞান, তিনিই পরম। তিনি অবিনাশী এবং আনন্দঘন। সকল হৃদয়ে তিনি লুকিয়ে রয়েছেন। হে সৌম্য, যিনি একথা জানেন, তিনি এই জীবনেই অবিদ্যার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মকে এখানে পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরুষ কেন? এই দেহ হল পুর (নগর), এবং যিনি এখানে বাস করেন তিনিই পুরুষ। পুরুষ বলতে আত্মা এবং ব্রহ্মকেও বোঝায়। পুরুষ নিজেকে এই নিখিল বিশ্বরূপে (ইদং বিশ্বম্) প্রকাশ করেন। সকল প্রকার কর্মও এই পুরুষের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘তপঃ’ বলতে বোঝায় তপস্যা, কৃচ্ছ্রতা। এও ব্রহ্মেরই প্রকাশ। বস্তুত ভাল মন্দ যা কিছু আমরা করি, সব ব্রহ্মেরই প্রকাশ। আমরা ব্রহ্মেই রয়েছি, আমাদের সত্তা ব্রহ্মেই প্রতিষ্ঠিত। এই ব্রহ্ম অদ্বিতীয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম। ‘অমৃতম্’, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি আনন্দস্বরূপ।
গুহা বলতে কি বোঝায়? মানুষের হৃদয়। গুহা শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ পর্বতকন্দর। গুহার অভ্যন্তরে কোন পশু থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে এত অন্ধকার যে, আমরা পশুটিকে দেখতে পাই না। একই ভাবে, ব্ৰহ্ম আমাদের হৃদয়ে আছেন, কিন্তু আমরা তাঁকে দেখতে পাই না। ‘নিহিতম্’—বাস করা। ব্রহ্ম আমাদের অন্তরে বাস করছেন। উপনিষদ বলছেন যে, যদি কেউ নিজ হৃদয়ে ব্রহ্মকে দর্শন করেন তবে ‘অবিদ্যাগ্রন্থিং বিকিরতি’, তিনি অজ্ঞানতার বন্ধন ছিন্ন করেন। তাঁর সব গ্রন্থি শিথিল হয়ে যায়, শৃঙ্খল ভেঙ্গে যায়।
প্রকৃত সত্যকে আমরা দেখতে পাই না; যা দেখি তা সত্যের বাহ্যরূপ। আমরা নিজেদের নাম-রূপের সঙ্গে অভিন্ন করে দেখি। ধরা যাক, একটি বালক বাঁদরের মুখোশ পরে আছে। তার দিকে চেয়ে আমরা বলি, ‘ওই যে একটা বাঁদর’। আসলে মুখোশের আড়ালে রয়েছে সেই ছেলেটি। উপনিষদ তাই বলছেন যে, মানুষ যদি প্রকৃত সত্যকে জানতে পারে, তবে তার অজ্ঞানতার সব বন্ধন ছিঁড়ে যায়। সে আর কোনদিনই মোহগ্রস্ত হয় না।
শ্রীমদ্ভাগবতে জড়ভরতের কাহিনী আছে। তিনি ছিলেন মুক্ত পুরুষ, কিন্তু বোবা ও জড়ের ভান করে থাকতেন। সকলেই তাঁকে জড়বুদ্ধি বলে মনে করত। একবার পালকিতে চড়ে এক রাজা চলেছেন। জড়ভরতকে পালকি বইতে বাধ্য করা হয়েছে। জড়ভরতের দেহ সবল ছিল ঠিকই, কিন্তু পালকি কাঁধে চলতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না; তাই তিনি অন্যান্য বাহকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছিলেন না। ফলে পালকি অস্বাভাবিক রকম দুলছিল। অবশেষে রাজা তাঁকে তিরস্কার করতে শুরু করলেন : ‘হে নির্বোধ, ব্যাপারটা কি? তুমি কি ক্লান্ত? যদি ক্লান্তই হয়ে থাক, তবে বিশ্রাম করতে চাইছ না কেন? তোমার উল্টো-পাল্টা পা ফেলার জন্য আমি পালকির ভেতর সোজা হয়ে বসে থাকতে পারছি না।’ এর আগে পর্যন্ত জড়ভরত সবসময় নির্বাক থাকতেন। কিন্তু সেই মুহুর্তে হঠাৎ গভীর জ্ঞানগর্ভ সব কথা তাঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল, ‘কাকে আপনি নির্বোধ বলে সম্বোধন করছেন? এই দেহটাকে? কিন্তু আমি তো দেহ নই। আমি সেই আত্মা যিনি আপনার মধ্যেও রয়েছেন। সুতরাং আপনার “নির্বোধ” সম্বোধন কার উদ্দেশে? আপনি আর আমি যে অভিন্ন।’
এখানে উপনিষদ সেই মূল ঐক্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। আমরা ‘বহু’ দেখি কিন্তু উপনিষদ বলেন, ‘না, বহু নেই, এক। এক ব্রহ্ম তথা পরমাত্মাই বহুরূপে প্রতিভাত। এই এককে দেখার চেষ্টা কর।’ জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক এবং অভিন্ন, বৈচিত্র শুধুমাত্র নাম এবং রূপে। এই নাম-রূপ পরমাত্মার উপর আরোপিত। প্রকৃত সত্য এই বৈচিত্রের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। সত্য এক। মানুষ, পশু, উদ্ভিদ, আকাশ সব কিছুর মধ্য দিয়ে এক ব্ৰহ্ম নিজেকে প্রকাশ করেছেন। সেই একত্ব দর্শন হলে মানুষ মুক্ত হয়ে যায়।
।। মুণ্ডক উপনিষদের দ্বিতীয় মুণ্ডকের প্রথম অধ্যায় এইখানে সমাপ্ত।।
