বৈদিক ও পৌরাণিক শাস্ত্রে বর্ণিত ‘৮৪ লক্ষ যোনি” হলো জীবাত্মার জন্ম-মৃত্যুর দীর্ঘ চক্র, যার মাধ্যমে আত্মা বিভিন্ন প্রজাতির শারীরিক রূপ বদল করে তার কর্মফল ভোগ ও ক্রমবিকাশ লাভ করে। সনাতন ধর্মে পদ্মপুরাণ বা বিষ্ণুপুরাণের মতো প্রাচীন গ্রন্থে এই ৮৪ লক্ষ (৮.৪ মিলিয়ন) প্রজাতির নিখুঁত শ্রেণিবিন্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু বামপন্থীরা বা মার্কসবাদীরা “৮৪ লক্ষ যোনি”র শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং পুনর্জন্মের ধারণাকে অলৌকিক, অবৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পরিপন্থী বলে বিবেচনা করে ।মার্ক্সবাদী বা বামপন্থী দর্শনের মূল ভিত্তি হলো দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism), যা ভূত বা আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করে না । বামপন্থীরা মনে করেন, আত্মা, পুনর্জন্ম বা ৮৪ লক্ষ যোনির ধারণাগুলোর কোনো পরীক্ষালব্ধ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কল্পনা ও প্রাচীন সমাজের বিশ্বাসপ্রসূত। যদিও সুপ্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণিত মুনী ঋষিদের গবেষণা লব্ধ সিদ্ধান্তগুলি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করার পরিবর্তে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতেই বিশেষ আগ্রহী । কারন এতে সনাতন ধর্মের ছাপ আছে ! তবে কুয়ালালামপুর প্রবাসী বাংলাদেশি বংশভূত আসাদুজ্জমান আসাদ (Asaduzzaman Asaad) “৮৪ লক্ষ যোনি”র আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন । এই বিষয়ে তার একটি ফেসবুক পোস্ট (https:// www.facebook.com/share/199SqQmmtN/) নিচে তুলে ধরা হল :
“৮৪ লক্ষ যোনি”
সনাতন ধর্মে (হিন্দুধর্মে) ‘৮৪ লক্ষ যোনি’ বলতে সৃষ্টির জীবজগতের বৈচিত্র্য, বিবর্তন এবং আত্মার পুনঃপুনঃ জন্মচক্রের (পুনর্জন্ম) একটি ঐতিহ্যগত শ্রেণীবিন্যাসকে বোঝানো হয়। এখানে ‘যোনি’ শব্দের অর্থ হলো—জন্মগ্রহণের মাধ্যম, প্রজাতি বা জীবনের অস্তিত্বের রূপ।সনাতন শাস্ত্রানুসারে, একটি আত্মা তার অতীত কর্মফল অনুযায়ী বিভিন্ন শরীরে বা প্রজাতিতে জন্মগ্রহণ করে। নিচে ৮৪ লক্ষ যোনির ধারণাটি বিস্তরভাবে আলোচনা করা হলো:
১. শাস্ত্রীয় উৎস ও শ্রেণীবিন্যাস
পদ্মানুপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ এবং গারুড় পুরাণে ৮৪ লক্ষ যোনি বা প্রজাতির একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক হিসাব ও শ্রেণীবিন্যাস দেওয়া হয়েছে:
জলজ নবলক্ষাণি স্থাবরা লক্ষবিংশতি।
কৃময়ো রুদ্রসংখ্যাকাঃ পক্ষিণাং দশলক্ষণম॥
ত্রিংশল্লক্ষাণি পশবশ্চতুর্লক্ষাণি মানবাঃ।
এই শ্লোক অনুযায়ী ৮৪ লক্ষ যোনির ভাগগুলো হলো:
জলচর (জলজ): পানির নিচে বসবাসকারী প্রাণী (যেমন: মাছ, তিমি ইত্যাদি) — ৯ লক্ষ
স্থাবর (উদ্ভিদ ও বৃক্ষ): গাছপালা, লতা-গুল্ম, জড় সদৃশ জীব — ২০ লক্ষ
কীট-পতঙ্গ ও কৃমি (কীট ও সরীসৃপ): পোকা-মাকড়, সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি — ১১ লক্ষ (এখানে ‘রুদ্র’ অর্থ ১১)
পক্ষী (খচর): আকাশে উড়ানো পাখি ও উড়ন্ত জীব — ১০ লক্ষ
পশু (স্থলচর): চারপায়ো পশু ও স্থলে বসবাসকারী প্রাণী — ৩০ লক্ষ
মানব (মনুষ্য): মানুষ এবং মানুষের সমকক্ষ বা শারীরিক কাঠামোর জীব — ৪ লক্ষ
মোট: ৯ + ২০ + ১১ + ১০ + ৩০ + ৪ = ৮৪ লক্ষ প্রজাতি।
২. আত্মিক বিবর্তন (Spiritual Evolution)
সনাতন দর্শন অনুযায়ী, এই ৮৪ লক্ষ যোনি কেবল প্রাণিবিজ্ঞানের রূপরেখা নয়, এটি আত্মার ক্রমবিবর্তনের যাত্রা (Journey of the Soul)।
অচেতন থেকে সচেতনতায় যাত্রা: আত্মা প্রথমে জড় ও স্থাবর রূপ (গাছপালা) থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে জলচর, কীট, পাখি ও পশুর শরীর ধারণ করে সচেতনতার উচ্চতর স্তরে উন্নত হয়।
কর্ম ও পুনর্জন্ম: নিম্নতর প্রজাতিতে (পশু-পাখি বা উদ্ভিদে) জীবের চেতনা বা বিবেক থাকে না, তাই তারা প্রবৃত্তি বা প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী চলে। তাদের জন্য কোনো ‘পাপ’ বা ‘পুণ্য’ প্রযোজ্য নয়। কিন্তু ৮৪ লক্ষ যোনির শেষ ধাপে যখন আত্মা মানব জন্ম লাভ করে, তখন তার মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) এবং ভালো-মন্দের বিচারবুদ্ধি আসে।
৩. ৮৪ লক্ষ সংখ্যাটির প্রতীকী ও আধুনিক অর্থ
অনেক শাস্ত্রবিদ ও চিন্তাবিদ ৮৪ লক্ষ সংখ্যাটিকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন:
আক্ষরিক ও গাণিতিক রূপ: প্রাচীন ঋষিগণ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে জীব বৈচিত্র্যের যে অগণিত রূপ দেখেছিলেন, তাকে শ্রেণীবদ্ধ করার জন্য এই হিসাব তৈরি করেছিলেন।
প্রতীকী রূপ (Infinite Diversity): ‘৮৪ লক্ষ’ শব্দটি দিয়ে মূলত পৃথিবীর অগণিত ও সীমাহীন জীবনরূপ বোঝানো হয়। এর মূল বার্তা হলো—মানুষ ছাড়াও এই সৃষ্টিতে কোটি কোটি প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে এবং প্রতিটি প্রাণই একই পরমাত্মার অংশ।
৪. মানব জন্মের বিশেষ গুরুত্ব
সনাতন ধর্মে ৮৪ লক্ষ যোনির ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো মানব জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরা। বলা হয়ে থাকে, ৮৪ লক্ষ যোনি অতিক্রম করার পর বা বহু জন্মের সুকৃৃতির ফলে আত্মা এক দুর্লভ মানব শরীর পায়।অন্যান্য প্রজাতিতে কেবল ভোগ (ভোগযোনি) হয়, কিন্তু কেবল মানব শরীরে নতুন কর্ম সম্পাদন করা সম্ভব (কর্মযোনি)। মানব জন্মেই আত্মা সাধনা, জ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে জন্ম-মৃত্যুর এই ৮৪ লক্ষ যোনির চক্র থেকে ‘মোক্ষ’ বা মুক্তি লাভ করতে পারে।।
