প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,৩১ মে : ২০২৬ শের বিধানসভা ভোটে ভরাডুবি ঘটেছে তৃণমূলের। বিজেপি বাংলায় সরকার গঠনের পর থেকেই তৃণমূলের নেতা নেত্রীদের দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করা শুরু হয়েছে। এমন আবহে পূর্ব বর্ধমান জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা কাটোয়ার প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর ছায়া সঙ্গী দীগন্ত পাল সহ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে বেনজীর দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন করুই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দারা।বতাঁদের অভিযোগ,তাঁদের অজান্তে তাঁদের নামে খোলা হয়েছিল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট।সেই অ্যাকাউন্ট কাজে লাগিয়ে ২০১৬ সাল থেকে ১০০ দিনের কাজের টাকা আত্মসাৎ করে চলে এইসব নেতারা। এমনকি তারা ব্রাহ্মণী নদী সংস্কার কাজের টাকার সিংহভাগ তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়।প্রতারিতরা দুদিন আগে কাটোয়া থানায় এনিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতেই নড়ে চড়ে বসে পুলিশ। মামলা রুজু করে তদন্তে নেমে পুলিশ দুই দাপুটে তৃণমূল নেতা দীগন্ত পাল ও বিশ্বনাথ সাহাকে গ্রেপ্তার করেছে।দুই ধৃতকে আজ রবিবার কাটোয়া মহকুমা আদালতে পেশ করার সময় আদালত চত্বরে ওঠে “চোর চোর” শ্লোগান । তারই মাঝে দিগন্ত পালের কয়েকজন অনুগামীকে দেখতে পেয়ে ক্ষিপ্ত জনতা তাদের ধরে বেদম পিটিয়ে দেয় । যদিও সেই সময় আদালত চত্বরে উপস্থিত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ছুটে এসে তাদের বাঁচায় । এদিকে বিচারক ধৃত ২ তৃণমূল নেতাকে ৪ দিন পুলিশ হেপাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।এই ঘটনা কাটোয়ার রাজনৈতিক মহলে তুমুল শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
করুই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাটি কাটোয়া ১ ব্লকের অন্তর্গত । এলাকার বাসিন্দা কুতুব উদ্দিন শেখ,স্বপন দত্ত,আতর আলী শেখ,অমর আলী শেখ ও মাসুদ শেখরা অভিযোগে বলেন,২০১৬ সাল থেকে এলাকায় বহু মানুষের নামে ১০০ দিনের কাজের ভূয়ো জব কার্ড তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ওইসব মানুষজনের অজ্ঞাতে স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাঙ্কে তাঁদের নামে অ্যাকাউন্টও খোলা হয়। সেখানে ১০০ দিনের কাজের টাকা ঢোকানো হত।পরে সেই টাকা তুলেও নেওয়া হত বলে অভিযোগ। সব থেকে আশ্চর্য্যের বিষয়, যাঁদের নামে জব কার্ড ও অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই নাকি এই বিষয় বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, করুই এলাকার উপর দিয়ে বয়ে চলা ব্রাহ্মণী নদীর সংস্কারের নামে প্রায় ৪০০-এর বেশি জব কার্ড হোল্ডারের অ্যাকাউন্টে ১৮ হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকার মধ্যে ১৫ হাজার টাকা করে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয় জব কার্ড হোল্ডারদের।টাকা দিতে অস্বীকার করলেই বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অত্যাচার এমনকি খুনের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হত বলে দাবি গ্রামবাসীদের। বাড়ির মহিলাদের শারীরিক হেনস্থার অভিযোগও সামনে এনেছেন প্রতারিত গ্রামবাসীরা।
কুতুব উদ্দিন শেখ ও অমর অলীরা বলেন,এতবড় অন্যায় কাজ নিয়ে গ্রামের বাসিন্দারা এতদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। ফলে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারেননি। এমনকি পঞ্চায়েতে অভিযোগ জানাতেও সাহস পাননি গ্রামের সাধারণ মানুষ। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, তৎকালীন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা তথা এলাকার বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অঙ্গুলি হেলনেই এই সমস্ত দুর্নীতি চলত। রাজ্য রাজনীতিতে পালা বদলের পর প্রতারিত বহু গ্রামবাসী একজোট হয়ে এই দুর্নীতি নিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। পরে ২৯ মে তারা কাটোয়া তারা কাটোয়া থানাতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন প্রতারিত গ্রামবাসীরা।
সব শুনে করুই গ্রাম পঞ্চায়েতের সেক্রেটারি গৌর দাস মুখোপাধ্যায় জানান,আগে আইনের শাসন ছিল না। ছিল শাসকের আইন । এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তাই গ্রামবাসীরা যে অভিযোগ জানিয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে৷ আর
কাটোয়ার বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণ ঘোষ বলেন,’করুই পঞ্চায়েত এলাকার মানুষজন বেনজীর দুর্নীতি কাণ্ডের পর্দা ফাঁস করেছেন। এই দুর্নীতি কাণ্ডে জড়িত কেউ পার পাবে না। দুর্নীতিতে জড়িত সকলের ঠাঁই হবে গারদে ।’ যদিও কাটোয়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন যে, সরকার পরিবর্তন হতেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পরিকল্পিত ভাবে তাঁদের ফাঁসানো হয়েছে।
এদিকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূলের দুই সাধারণ সম্পাদক দীগন্ত পাল ও বিশ্বনাথ সাহাকে নিয়ে পুলিশ এদিন কাটোয়া আদালতে পৌছাতেই “চোর চোর” শ্লোগান ওঠে। ধৃতদের অনুগামীদের এদিন আদালত চত্ত্বরে দেখতে পেয়েই অনেকে তাদের লক্ষ করে ডিম ছোড়েন। তা নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ক্ষুব্ধ মানুষজন ধৃতদের অনুগামীদের ধাওয়া করে কয়েকজনকে ধরে ফেলে গণধোলাই দেওয়া শুরু করে। এসব নিয়ে আদালত চত্ত্বর উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ কড়া পদক্ষেপ নিয়ে উত্তেজনা সামাল দেয় ।।
