শ্রীমদ্ নারায়ণীয়ম্-এর দ্বাবিংশ দশকে (দশক ২২) ‘অজামিল উপাখ্যান’ বর্ণিত হয়েছে । এই দশকে ভক্তিশাস্ত্রের একটি পরম সত্য তুলে ধরা হয়েছে—ভগবানের নামের মহিমা এতই অপরিসীম যে, অবহেলায় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কেবল তাঁর নাম উচ্চারণ করলেও পরম গতি লাভ করা যায়।
- কাহিনীর প্রেক্ষাপট
কান্যকুব্জ (কনৌজ) নগরে অজামিল নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তিনি প্রথম জীবনে অত্যন্ত সদাচারী, শান্ত ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন। কিন্তু একদিন বনের মধ্যে এক দাসীর প্রতি আসক্ত হয়ে তিনি নিজের ধর্মপথ থেকে বিচ্যুত হন। এরপর তিনি সেই নারীর সাথে জীবনযাপন শুরু করেন এবং চুরি, ডাকাতি ও নানা পাপকাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তার দশটি পুত্র সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ পুত্রের নাম তিনি রেখেছিলেন ‘নারায়ণ’। অজামিল তার এই ছোট ছেলেটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
নারায়ণীয়ং দশক ২২ – অজামিল উপাখ্যান
অজামিলো নাম মহীসুরঃ পুরা
চরন্ বিভো ধর্মপথান্ গৃহাশ্রমী ।
গুরোর্গিরা কাননমেত্য দৃষ্টবান্
সুধৃষ্টশীলাং কুলটাং মদাকুলাম্ ॥১॥
অর্থ: হে পরমেশ্বর! কান্যকুব্জে অজামিল নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন, যিনি পূর্বে সদাচারী হলেও পরে এক দাসীর সংসর্গে এসে সম্পূর্ণ কলুষিত হয়ে পড়েন। তিনি নিজের ধর্মকর্ম ত্যাগ করে কেবল পাপাচারে লিপ্ত ছিলেন।
স্বতঃ প্রশাংতোঽপি তদাহৃতাশয়ঃ
স্বধর্মমুত্সৃজ্য তয়া সমারমন্ ।
অধর্মকারী দশমী ভবন্ পুন-
র্দধৌ ভবন্নাময়ুতে সুতে রতিম্ ॥২॥
অর্থ: সময় বয়ে চলল এবং অজামিল বৃদ্ধ বয়সে পদার্পণ করলেন। মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে এলো, তখনো তিনি তার পরম প্রিয় সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ‘নারায়ণ’-এর প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন।
স মৃত্যুকালে যমরাজকিংকরান্
ভয়ংকরাংস্ত্রীনভিলক্ষযন্ ভিয়া ।
পুরা মনাক্ ত্বত্স্মৃতিবাসনাবলাত্
জুহাব নারায়ণনামকং সুতম্ ॥৩॥
অর্থ: যখন যমরাজের ভয়ঙ্কর দূতেরা পাশহস্তে অজামিলকে নিতে এলেন, তখন ভয়ে ব্যাকুল হয়ে অজামিল দূরবর্তী স্থানে খেলা করতে থাকা তার ছোট ছেলে ‘নারায়ণ’-কে উচ্চস্বরে ডাকলেন।
দুরাশযস্যাপি তদাত্বনির্গত-
ত্বদীয়নামাক্ষরমাত্রবৈভবাত্ ।
পুরোঽভিপেতুর্ভবদীয়পার্ষদাঃ
চতুর্ভুজাঃ পীতপটা মনোরমাঃ ॥৪॥
অর্থ: অজামিল যদিও তার পুত্রকে ডাকছিলেন, কিন্তু তার মুখে ‘নারায়ণ’ এই পরম পবিত্র নাম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই আপনার (বিষ্ণুর) পার্ষদেরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেখানে উপস্থিত হলেন।
অমুং চ সংপাশ্য বিকর্ষতো ভটান্
বিমুংচতেত্যারুরুধুর্বলাদমী ।
নিবারিতাস্তে চ ভবজ্জনৈস্তদা
তদীয়পাপং নিখিলং ন্যবেদয়ন্ ॥৫॥
অর্থ: আপনার দূতেরা এসে যমদূতদের হাত থেকে অজামিলের প্রাণকে রক্ষা করলেন এবং যমদূতদের বাধা দিলেন। তখন যমদূতেরা বিস্মিত হয়ে ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব নিয়ে বিষ্ণুদূতদের সাথে তর্কে লিপ্ত হলো।
ভবন্তু পাপানি কথং তু নিষ্কৃতে
কৃতেঽপি ভো দণ্ডনমস্তি পন্ডিতাঃ ।
ন নিষ্কৃতিঃ কিং বিদিতা ভবাদৃশা-
মিতি প্রভো ত্বত্পুরুষা বভাষিরে ॥৬॥
অর্থ: বিষ্ণুদূতেরা তখন যমদূতদের বোঝালেন যে, এই ব্যক্তি তার জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে ফেলেছেন। কারণ, মৃত্যুর অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে তিনি সর্বপাপহর্তা ভগবান ‘নারায়ণ’-এর নাম উচ্চারণ করেছেন।
শ্রুতিস্মৃতিভ্যাং বিহিতা ব্রতাদয়ঃ
পুনংতি পাপং ন লুনংতি বাসনাম্ ।
অনংতসেবা তু নিকৃংততি দ্বয়ী-
মিতি প্রভো ত্বত্পুরুষা বভাষিরে ॥৭॥
অর্থ: মানুষ না জেনেও যদি অগ্নির স্পর্শ করে, তবে যেমন তার হাত পুড়ে যায়, ঠিক তেমনি অবহেলায়, পরিহাসে বা অন্য কোনো ছলে ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করলেও তা মানুষের সমস্ত পাপকে ভস্মীভূত করে দেয়।
অনেন ভো জন্মসহস্রকোটিভিঃ
কৃতেষু পাপেষ্বপি নিষ্কৃতিঃ কৃতা ।
যদগ্রহীন্নাম ভয়াকুলো হরে-
রিতি প্রভো ত্বত্পুরুষা বভাষিরে ॥৮॥
অর্থ: যমদূতেরা বিষ্ণুদূতদের এই যুক্তি মেনে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল এবং যমরাজের কাছে গিয়ে এই অলৌকিক ঘটনার কথা জানাল। এদিকে অজামিল মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন।
নৃণামবুদ্ধ্য়াপি মুকুন্দকীর্তনং
দহত্যঘৌঘান্ মহিমাস্য তাদৃশঃ ।
যথাগ্নিরেধাংসি যথৌষধং গদা –
নিতি প্রভো ত্বত্পুরুষা বভাষিরে ॥৯॥
অর্থ: যমদূত ও বিষ্ণুদূতদের সেই কথোপকথন শুনে অজামিলের মনে তীব্র বৈরাগ্যের উদয় হলো। তিনি তাঁর বাকি জীবন গঙ্গাতীরে (হরিদ্বারে) আপনার ভক্তিতে উৎসর্গ করলেন এবং অবশেষে আপনার পরম ধাম লাভ করলেন।
ইতীরিতৈর্য়াম্যভটৈরপাসৃতে
ভবদ্ভটানাং চ গণে তিরোহিতে ।
ভবত্স্মৃতিং কংচন কালমাচরন্
ভবত্পদং প্রাপি ভবদ্ভটৈরসৌ ॥১০॥
অর্থ : যমের দূতগণ, যাঁদেরকে এইভাবে বলা হয়েছিল,চলে গেলেন এবং যখন আপনার অনুচররা অদৃশ্য হয়ে গেলেন, তখন আজমিলা আপনার ধ্যানে কিছু সময় কাটালেন এবং আপনার সৈন্যরা তাকে বৈকুণ্টায় নিয়ে গেল।
স্বকিংকরাবেদনশংকিতো যম-
স্ত্বদংঘ্রিভক্তেষু ন গম্যতামিতি ।
স্বকীয়ভৃত্যানশিশিক্ষদুচ্চকৈঃ
স দেব বাতালয়নাথ পাহি মাম্ ॥১১॥
অর্থ: যখন যমের দূতরা তাঁকে এই ঘটনাটি জানালেন, তখন তিনি ভীত হলেন এবং তাঁদেরকে বিষ্ণু ভক্তদের কাছে যেতে নিষেধ করলেন।আর এই বিষয়ে কঠোর আদেশ দিলেন,হে গুরুভায়ুরের প্রভু, আপনি যিনি এইরকম, দয়া করে আমাকে রক্ষা করুন।।

