শঙ্খ বারিক,১৯ আগস্ট : হল্যান্ড-বেলজিয়ামে যখন ভারতীয় পুরুষ হকি দল ২০২৬-এর বিশ্বকাপ খেলছে, তখন ৫০ বছর আগের ১৫ই মার্চ, ১৯৭৫ বারবার মনে পড়ছে। কুয়ালামপুরের মেরদেকা স্টেডিয়াম। ৫০ হাজার দর্শক। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। বিশ্বকাপ হকির ফাইনাল ম্যাচ– ফল: ভারত–২ আর পাকিস্তান–১। এখনও পর্যন্ত সেটাই ভারতের একমাত্র হকি বিশ্বকাপ জয়। আর আজ ১৯শে আগস্ট, ২০২৬। ৫০ বছর পর আবার সামনে পাকিস্তান। এবার নকআউটের টিকিটের লড়াই।
পিছিয়ে পড়ে জয়: ১৯৭৫-এর সেই ৭০ মিনিট:
এশিয়া মহাদেশে প্রথমবার হকি বিশ্বকাপ; আর ভারতীয় হকির সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনাল। ১৮ মিনিটে পাকিস্তানের মহম্মদ সইদের গোলে পিছিয়ে যায় ভারত। তারপর টিম ম্যানেজার বালবীর সিং-এর ভাষায় “ভারতীয় হকির অন্যতম সেরা প্রদর্শনী”। ৪৪ মিনিটে সুরজিৎ সিং পেনাল্টি কর্নার থেকে সমতা ফেরান। তারপর হরচরণ সিং-এর স্টিক থেকে বল ভি জে ফিলিপসের স্টিক ঘুরে অশোক কুমার-এর স্টিকে বল পৌঁছাতেই জোরালো দূরপাল্লার শটে গোল…. ২-১ ।
কে এই অশোক কুমার? মেজর ধ্যানচাঁদের পুত্র) পাকিস্তান গোল নিয়ে প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিবাদ খাটেনি। কী ঘটেছিল? পাকিস্তান দলের দাবি ছিল, অশোক কুমারের শটটি গোলপোস্টে লেগে মাঠে ফিরে এসেছিল, অর্থাৎ বলটি সম্পূর্ণভাবে গোললাইন পার করেনি। কিন্তু সেই ম্যাচের মালয়েশিয়ান আম্পায়ার জি বিজিয়ানাথন গোলটি বৈধ বলে ঘোষণা করেন। সে যুগে আজকের মতো আধুনিক টিভি রিপ্লে বা ভিডিও সহায়তাকারী প্রযুক্তির প্রচলন না থাকায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত, এবং পাকিস্তান দলের আপত্তি খারিজ হয়ে যায়।
এই জয়ের আগে ভারতীয় হকি দল খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৬৮তে মেক্সিকো অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ– তারপর আর কোনো বড় ট্রফি ঘরে আসেনি। ১৯৭১-এ বিশ্বকাপ জেতে পাকিস্তান। পরের বছর অলিম্পিকে হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়। ১৯৭৩-এ বিশ্বকাপ ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে রানার্স হয়েই অসন্তুষ্টি নিয়ে আবার ঘরে ফেরা। ১৯৭৫-এ হল প্রতীক্ষার অবসান। আবার ভারতীয় হকি স্বমহিমায় বিশ্বের শীর্ষস্থানে ফিরে এল। তাই ভারতের জন্যও ১৯৭৫-এর জয়টা ছিল আত্মবিশ্বাস ফেরানো।
২০২৬: সন্ধিক্ষণের মুহূর্তে
৫০ বছর পর আবার ভারতীয় হকির সামনে ফ্ল্যাস-ব্যাক। ২০২১ টোকিও ও ২০২৪ প্যারিস পরপর ২টো অলিম্পিক ব্রোঞ্জ। কিন্তু বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এখনও কাঁটার উপর। পুল ‘ডি’-র বর্তমান অবস্থা: ইংল্যান্ড ২ ম্যাচ খেলে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ শীর্ষে। ভারতও ২ ম্যাচ খেলে ৩ পয়েন্ট, আর পাকিস্তান সম সংখ্যক ম্যাচ খেলে ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের একেবারে নীচে।
আজকের হিসাব সোজা
আজ বুধবার (১৯শে আগস্ট) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ড্র করলেই নকআউট। জিতলে আরও ভালো। কিন্তু হারলেই বিদায়। কোচ বলছেন দলের fitness, skill ও depth নিয়ে আশাবাদী।
ইতিহাস ডাকছে
১৯৭৫-এ আমরা প্রমাণ করেছিলাম পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফেরা যায়, পাকিস্তানকে হারানো যায়। প্রমাণ করেছিলাম এশিয়ার মাটিতে বিশ্বসেরা হওয়া যায়।
২০২৬-এ প্রশ্ন একটাই– অলিম্পিক ব্রোঞ্জের পর বিশ্বকাপের ৫০ বছরের খরা কাটানোর দিকে ভারত কী এগিয়ে যেতে পারবে? ১৬ কোটি মানুষ অপেক্ষায় থাকবে টিভির সামনে। তারা আরেকটা ১৯৭৫-এর মুহূর্ত চায়। একটা ট্রফি নিয়ে ৫০ বছর বাঁচা যায় না। আজ সময় এসেছে দ্বিতীয়টার পথে প্রথম পা ফেলার।।
