মুণ্ডক উপনিষদের তৃতীয় মুণ্ডকের প্রথম অধ্যায়ে দুটি পাখির রূপকের মাধ্যমে জীবাত্মা (ব্যক্তিগত সত্তা) এবং পরমাত্মার (পরম সত্য) সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে । এটি বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ছেড়ে আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে পরম ব্রহ্মে লীন হওয়ার আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান দেয় ।
তৃতীয় মুণ্ডক প্রথম অধ্যায়
দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া
সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্ত্য-
নশ্নন্নন্যো অভিচাকশীতি॥১।।
অন্বয়: সযুজা (সর্বদা একসাথে); সখায়া (একরকম); দ্বা সুপর্ণা (সুন্দর পালক যুক্ত দুটি পাখি); সমানং বৃক্ষম্ (একই বৃক্ষে); পরিষস্বজাতে (পরস্পর আলিঙ্গন করে আছে); তয়োঃ (তাদের মধ্যে); অন্যঃ (একটি); স্বাদু পিপ্পলম্ (মিষ্টি ফল); অত্তি (খায়); অন্যঃ (অন্যটি); অনশ্নন্ অভিচাকশীতি ([ফল] খাওয়ার বদলে কেবল দেখে)।
সরলার্থ: সুন্দর পালকযুক্ত একই রকম দেখতে দুটি পাখি সবসময় একই গাছে থাকে। তাদের মধ্যে একটি পাখি সুমিষ্ট ফল খাচ্ছে এবং অন্যটি কিছু না খেয়ে কেবল দেখছে।
ব্যাখ্যা: উপনিষদ আমাদের বোঝাতে চাইছেন কিভাবে জীবাত্মা ও পরমাত্মা একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এখানে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। জীবাত্মা ও পরমাত্মাকে একই গাছের দুটি পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ‘দ্বা সুপণা’—দুটি পাখি। ‘সুপর্ণা’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘সুন্দর পালক’। এই পাখি দুটি ‘সযুজা’—পরস্পর অন্তরঙ্গ, এবং ‘সখায়া’—পরস্পর সদৃশ। তারা দেখতে একইরকম এবং পরস্পর অন্তরঙ্গ। ‘সমানং বৃক্ষম্’—একই বৃক্ষে তারা বসে আছে। তাদের মধ্যে একটি পাখি (অর্থাৎ জীবাত্মা) টক মিষ্টি ইত্যাদি নানা স্বাদের ফল খাচ্ছে। অন্য পাখিটি কিছুই খাচ্ছে না, চুপচাপ বসে আছে। সে শান্ত এবং অচঞ্চল। ‘অভিচাকশীতি’—সে শুধু দেখছে। যে পাখিটি ফল খেতে মত্ত সে কখনও সুখী, কখনও অসুখী। কিন্তু অন্য পাখিটি নির্লিপ্ত, সাক্ষী, দ্রষ্টা।
অনুরূপভাবে পরমাত্মা সবসময়ই শান্ত, আত্মস্থ। তিনি সাক্ষী-মাত্র। অপরদিকে জীবাত্মা চঞ্চল, অস্থির। সে বাসনা দ্বারা তাড়িত এবং নিজ অভিজ্ঞতা অনুসারে কখনও সুখী, কখনও দুঃখী। জীবাত্মা নানা পরিস্থিতির অধীন; আর এই জন্যই সে সবসময় সুখদুঃখের দোলায় দুলছে। এইভাবে জীবাত্মার পরিবর্তন হয়ে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে পাখি দুটিকে আলাদা বলে মনে হলেও এরা কিন্তু ভিন্ন নয়। তাদের আচরণের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আসলে তারা এক ও অভিন্ন।
সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্লোঽ-
নীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ।
জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশমস্য
মহিমানমিতি বীতশোকঃ॥২।।
অন্বয়: পুরুষঃ (জীবাত্মা [জীব]); সমানে (একই); বৃক্ষে (বৃক্ষে অর্থাৎ দেহে); নিমগ্নঃ (অবস্থিত হয়ে); অনীশয়া (নিজের দেবত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়); মুহ্যমানঃ (অজ্ঞানতার মোহে আচ্ছন্ন); শোচতি (শোক করে); যদা (যখন); জুষ্টম্ ([যোগিগণের দ্বারা] সেবিত হয়ে); অন্যম্ ঈশম্ (দেহ ব্যতীত পরমাত্মাকে [ঈশ্বরকে]); পশ্যতি (দেখে); অস্য (তাঁর [পরমাত্মার]); ইতি (এই); মহিমানম্ (মহিমাকে); [তদা (তখন)]; বীতশোকঃ ([এই জগতের] শোকদুঃখ থেকে মুক্ত)।
সরলার্থ: জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে একই গাছে (অর্থাৎ একই দেহে) থাকলেও জীবাত্মা তার নিজ স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ। এই কারণে তাকে নানা দুঃখ ভোগ করতে হয়। কিন্তু যখন তার স্বরূপজ্ঞান হয় তখন সে সুখদুঃখের পারে চলে যায় এবং নিজ মহিমা উপলব্ধি করে।
ব্যাখ্যা: ‘পুরুষ’ শব্দটির নানা অর্থ আছে। কোন্ প্রসঙ্গে শব্দটির উল্লেখ করা হয়েছে তার ওপরই এর অর্থ নির্ভর করছে। এখানে শব্দটির অর্থ জীবাত্মা। জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে একই গাছে রয়েছে। এই প্রসঙ্গে আচার্য শঙ্কর একটি চমৎকার উদাহরণ দিচ্ছেন: জীবাত্মা যেন একটি অলাবু অর্থাৎ লাউ। সেটি সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে এবং তরঙ্গের আঘাতে দুলছে। সেটি পুরোপুরি তরঙ্গের অধীন। স্রোতের তাড়নায় সেটি ‘নিমগ্ন’ অর্থাৎ কখনও লাউটি জলের গভীরে যাচ্ছে, আবার কখনও জলের ওপরে ভাসছে, কখনও এদিকে কখনও বা অন্যদিকে যাচ্ছে। অনুরূপভাবে জীবাত্মা যেন জীবন সমুদ্রে ডুবে আছে। আমাদের কখনও কখনও এ জীবনকে সুখপ্রদ বলে মনে হয়। যখন আমরা নিজেদের সুখী বলে মনে করি তখন অসুখী মানুষেরা আমাদের করুণার পাত্র। কিন্তু আবার এমনও হতে পারে মুহূর্তের মধ্যে কোন বিপর্যয়ের ফলে আমাদের জীবনটা বদলে গেল। আমাদের মুখের হাসি, সকল আশা-ভরসা তখন মিলিয়ে যায়। থাকে শুধুই চোখের জল। মানুষের জীবনটা এমনই, তাই শঙ্কর এখানে এরকম উপমা দিয়েছেন। ‘অলাবু’কে যদি ফল বলে মানতেই হয় তবে এটি একটি নিকৃষ্ট ফল মাত্র।
‘অনীশয়া’—জীবাত্মা নিজেকে ঈশ্বর বলে মনে করে না। সে যে স্বরূপত দেবতা—একথা সে জানে না। আমাদের সকলের অবস্থাই এই রকম। আমরা ভাবি, ‘হায়! আমি অক্ষম, অপদার্থ, নির্বোধ।’ শঙ্কর একেই ‘দীনভাব’ বলেছেন। এ যেন নিজেকে অসহায় বলে মনে করা। এরূপ মনোভাব আত্মহত্যার সমান। এই সব ব্যক্তি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে (শোচতি মুহ্যমানঃ)। এই ‘অনীশয়া’ তার অশেষ দুঃখকষ্টের কারণ হয়। কিন্তু এই ব্যক্তিই আবার অন্য মানুষে পরিণত হতে পারে। তা কি করে সম্ভব হয়? সত্যনিষ্ঠা, পবিত্রতা ও আত্মসংযমের মতো আধ্যাত্মিক অনুশীলনের দ্বারা এই পরিবর্তন লাভ করা যায়। ‘যদা’ শব্দটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এ যেন মোড় ফিরে যাওয়ার ক্ষণ। নিরন্তর আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকলে মানুষের চিত্তশুদ্ধি ও আত্মসংযম লাভ হয়। তখন সে আত্মজ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। তার জীবনে তখন কি ঘটে? ‘পশ্যতি’—সে দেখে। কি দেখে? ‘অন্যম্ ঈশম্’—সে নিজহৃদয়ে ঈশ্বরকে দেখে। সে নিজ আত্মাকেই ঈশ্বর বলে মনে করে। ‘অন্যম্’—এ তার সত্তার আর একটি দিক। ‘জুষ্টম্—কে ‘জুষ্টম্’? শঙ্করের মতে, যিনি যোগিগণের আরাধ্য তিনিই ‘জুষ্টম্’। তিনি কে? তিনিই ঈশ্বর—‘ঈশম্’। ‘জুষ্টম্’ কথাটির অপর অর্থ হল ‘কোন কিছুর খোঁজে বের হওয়া’ অথবা ‘বহুজন পূজিত’।
জীবাত্মা এখন তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানেন। এর আগে তিনি নিজেকে অক্ষম, অপদার্থ বলে মনে করতেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার ফলে তিনি এখন তাঁর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি জানেন যে, তিনি ও পরমাত্মা এক এবং অভিন্ন। চিত্তশুদ্ধি হলে এই জ্ঞান আপনা আপনিই ফুটে ওঠে। এমন নয় যে, মানুষটির সত্যিই পরিবর্তন হয়েছে। তিনি আগে অপদার্থ ছিলেন এখন দেবতা হয়েছেন, একথা ঠিক নয়। তিনি সবসময়ই দেবতা ছিলেন, শুধু একথা তিনি জানতেন না। উপনিষদের বাণী থেকে আমরা এই সত্যই লাভ করে থাকি।
যখন কোন ব্যক্তি ‘অন্যম্ ঈশম্’—ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন, তখন তিনি ‘অস্য মহিমানম্’—এই বিশ্বের মহিমাকে নিজের মহিমা বলে উপলব্ধি করেন। কারণ তিনি তখন ঈশ্বর। এই জগৎ অর্থাৎ সব কিছুর সাথে তিনি একাত্ম বোধ করেন। ‘বীতশোকঃ’—তিনি তখন সুখদুঃখের পারে চলে যান। তিনি কেবল দুঃখকেই জয় করেন না, সুখকেও জয় করেন। এই হল প্রকৃত মুক্তি।
যদা পশ্যঃ পশ্যতে রুক্মবর্ণং
কর্তারমীশং পুরুষং ব্রহ্মযোনিম্।
তদা বিদ্বান্পুণ্যপাপে বিধূয়
নিরঞ্জনঃ পরমং সাম্যমুপৈতি॥৩।।
অন্বয়: যদা (যখন); পশ্যঃ (তাঁর নিজ স্বরূপকে সাধক উপলব্ধি করেন); রুক্মবর্ণম্ (উজ্জ্বল); কর্তারম্ (স্রষ্টা); ব্রহ্মযোনিম্ (ব্রহ্মার কারণ [হিরণ্যগর্ভ ]); ঈশম্ (প্রভু); পুরুষ (পরমপুরুষ); পশ্যতে (দেখেন [উপলব্ধি করেন]); তদা (তখন); বিদ্বান্ (সেই সাধক যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন); পুণ্যপাপে বিধূয় (পুণ্য ও পাপ ত্যাগ করে); নিরঞ্জনঃ (পবিত্র); পরমম্ (পরম); সাম্যম্ (একত্ব বোধ); উপৈতি (প্রাপ্ত হন)।
সরলার্থ: সাধক যখন এই জ্যোতির্ময় স্রষ্টা, ব্রহ্মার কারণ (হিরণ্যগর্ভ), সেই পরমপুরুষ ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন, তখন তিনি পাপপুণ্যের ঊর্ধ্বে চলে যান এবং নির্লিপ্ত ও পবিত্র হয়ে পরম সাম্য লাভ করেন। অর্থাৎ সাধক তখন সব কিছুর সাথে একাত্মতা অনুভব করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মজ্ঞান লাভ করলে কিরকম অবস্থা হয় উপনিষদ এখানে আমাদের সেকথা বলছেন। ‘যদা পশ্যঃ পশ্যতে’—যখন সাধক দেখেন। ‘পশ্য’ কথাটির অর্থ দ্রষ্টা, ‘পশ্যতে’ কথাটির অর্থ ‘দেখে’। এ দেখা কিন্তু সাধারণ দেখা নয়। এ ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা নয়, এক অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা। সাধক তখন দেখেন অর্থাৎ উপলব্ধি করেন। কি দেখেন? ‘রুক্মবর্ণম্’—হৃদয়স্থিত স্বয়ং প্রকাশিত, স্বয়ং জ্যোতিস্বরূপ আত্মাকে। এই কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘সোনার বরণ’। কিন্তু এখানে পরমাত্মা সোনালী রঙের এক উজ্জ্বল সত্তা এমন কথা বলা হচ্ছে না। পরমাত্মা, জ্যোতিস্বরূপ একথা বোঝাতেই কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে।
‘কর্তারম্’—তিনি কর্তা, প্রকৃত প্রভু এবং পরিচালক। তিনিই একমাত্র শাসক। তিনি কারণ, আর সব কিছুই কার্য। তিনিই পুরুষ। তিনি সকলের মধ্যে আছেন। সব রূপই তাঁর রূপ। ‘ব্রহ্মযোনিম্’—তাঁর মধ্যেই সব কিছু রয়েছে। ব্রহ্ম থেকে তৃণ পর্যন্ত সবকিছু ব্রহ্মের কাছ থেকে এসেছে এবং তিনিই সবকিছুকে ধারণ করে আছেন। যিনি এই ব্রহ্মকে অর্থাৎ আত্মাকে জানেন তিনি পাপ-পুণ্য, ভাল-মন্দের ঊর্ধ্বে চলে যান। শুধুমাত্র পাপই যে বন্ধন তা নয়, পুণ্যও এক রকমের বন্ধন। একথা আমরা সকলেই জানি যে, পাপ করলে তার যন্ত্রণা ভোগ করতেই হবে। কিন্তু পুণ্যও বন্ধন—এ কেমন করে হয়? কারণ পুণ্য কাজ করলে আমাদের পুনর্জন্ম হবে না—এমন কথা কিন্তু শাস্ত্রে নেই। সোনার শিকলও শিকল, অর্থাৎ লোহার শিকলের মতো সোনার শিকলও আমাদের বদ্ধ করে। আমরা মুক্ত হতে চাই এবং একমাত্র আত্মজ্ঞান লাভের দ্বারাই তা সম্ভব। যখন আমি নিজেকে জানি অর্থাৎ যখন আমার স্বরূপজ্ঞান হয় তখন আর পাপ-পুণ্য বোধ থাকে না। সব কর্মফল তখন ক্ষয় হয়। কর্মফল পুরোপুরি ক্ষয় হলে নির্বাণ লাভ হয়।
মানুষ যখন এই অবস্থা লাভ করেন তখন আর কোন মলিনতা, কালিমা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। অর্থাৎ তিনি তখন শুদ্ধ নিরঞ্জন পুরুষে পরিণত হন। ‘সাম্যম্ উপৈতি’—এমন একটি সাম্য অবস্থায় তিনি পৌঁছান যখন এ জগতের সব কিছুর সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন। আমরা ভালবাসার কথা বলি, কিন্তু প্রকৃত ভালবাসা কিরকম? এক জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত প্রেম সম্ভব নয়। অর্থাৎ যখন আমরা সকলের মধ্যে সেই এক আত্মা বা এক ঈশ্বরকে দেখি, যখন ‘আমি-তুমি’ বোধ চিরতরে ঘুচে যায়। তখনই আমরা যথার্থ ভালবাসতে পারি। এই একত্বের বোধ থেকেই আসে সমদর্শিতা অর্থাৎ সকলকে সমানভাবে দেখা।
আমাদের সব দুঃখকষ্টের মূলে রয়েছে এই ‘দুই’-বোধ। আমরা জীবাত্মা ও পরমাত্মাকে পৃথক বলে মনে করি। আমরা মনে করি, আমরা অতি ক্ষুদ্র ব্যক্তিমানুষ অর্থাৎ জীবাত্মা, আর পরমাত্মা হলেন অন্য কিছু। দেহ, নাম, বংশ-মর্যাদা প্রভৃতির সঙ্গে আমরা নিজেদের এক করে ফেলি। কিন্তু এ সবই আমাদের উপাধিমাত্র। অজ্ঞানতা বা অবিদ্যার জন্যই এই সব উপাধিকে আমরা ‘আমি’ বলে মনে করি। এই অজ্ঞানতার জন্যই আমরা নিজেদের পরমাত্মার থেকে পৃথক বলে মনে করি। এর ফলে আমরা নানা দুঃখকষ্ট ভোগ করে থাকি। আমাদের অবস্থা হল এই টক-মিষ্টি ফল ভোগকারী পাখিটির মতো। কিন্তু স্বরূপত আমরা সকলেই নির্গুণ। কিন্তু আমরা তা বুঝব কেমন করে? আত্মসংযম অভ্যাসের দ্বারা। জড়জগৎ যখন আর আমাকে আকৃষ্ট করতে পারে না, যখন আমি উপলব্ধি করি সব কিছু আমার ভেতরেই রয়েছে, তখনই আমি নিজেকে আবিষ্কার করি—আমি নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত আত্মা। তখন আমি জানি গাছের অন্য পাখিটির মতো আমি সব সময় এক। জগতের কোন পরিবর্তন আমাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। আমি দ্রষ্টা, সাক্ষী, সকল শুভাশুভের ঊর্ধ্বে। শুভ-অশুভ, পাপ-পুণ্য, জীবন-মৃত্যু—এ সবই আপেক্ষিক। পরব্রহ্মে কোন দুই-বোধ নেই। সব কিছুর মধ্যে সেই একই ব্ৰহ্ম রয়েছেন। তিনিই আত্মা। একমাত্র আত্মজ্ঞান লাভেই আমরা উপলব্ধি করি যে, আমরা সকলে এক ও অভিন্ন। আত্মজ্ঞান লাভই জীবনের উদ্দেশ্য—একথাই উপনিষদ আমাদের নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।
প্রাণো হ্যেষ যঃ সর্বভূতৈর্বিভাতি
বিজানন্ বিদ্বান্ ভবতে নাতিবাদী।
আত্মক্রীড় আত্মরতিঃ ক্রিয়াবান্
এষ ব্রহ্মবিদাং বরিষ্ঠঃ॥৪।।
অন্বয়: যঃ (যিনি [ঈশ্বর]); সর্বভূতৈঃ (সকল ভূতে); বিভাতি (প্রকাশ পান); এষঃ হি প্রাণঃ (তিনিই প্রাণস্বরূপ); বিদ্বান্ (জ্ঞানী ব্যক্তি); বিজানন্ ([তাঁকে] জেনে); অতিবাদী ন ভবতে ([আত্মা ছাড়া] অন্য কোন কথা বলেন না); আত্মক্রীড়ঃ (নিজের সাথে খেলা করেন); আত্মরতিঃ (আত্মাই তাঁর আনন্দের উৎস); ক্রিয়াবান্ (ক্রিয়াশীল [ধ্যান ধারণা, শাস্ত্রপাঠ ইত্যাদিতে মগ্ন]); এষঃ (তিনি); ব্রহ্মবিদাম্ (ব্রহ্মবিদ্গণের মধ্যে); বরিষ্ঠঃ (শ্রেষ্ঠ)।
সরলার্থ: ঈশ্বর সব বস্তুর মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন এবং সব প্রাণীর তিনিই প্রাণ-স্বরূপ। যখন কোন ব্যক্তি একথা জানেন, তখন তিনি কেবল ব্রহ্মেরই (অর্থাৎ ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ) আলোচনা করেন। তিনি নিজেই নিজের সাথে খেলা করেন। আনন্দস্বরূপ তিনি। ধ্যান ও অন্যান্য অধ্যাত্ম সাধনে তিনি মগ্ন। সকল ব্রহ্মজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ।
ব্যাখ্যা: এই পরমাত্মা অর্থাৎ ঈশ্বরই সর্ববস্তুর প্রাণস্বরূপ। প্রাণের উৎসও তিনি। ‘সর্বভূতৈর্বিভাতি’—তাঁর আলোতেই সব বস্তু আলোকিত। সব বস্তুর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকেই প্রকাশ করেন। ‘তপসা চীয়তে ব্রহ্ম’—শুধুমাত্র মনন বা চিন্তার দ্বারাই ব্ৰহ্ম নিজেকে প্রসারিত করেন। ব্রহ্ম যেন চিন্তা করলেন, ‘একঃ অহং বহুস্যাম্’—আমি এক, আমি বহু হব। এইভাবে ব্রহ্ম নিজেকে প্রকাশ করলেন। তাঁর চিন্তামাত্রই এই জগতের সৃষ্টি হল। ‘সর্বভূতানি’—এই জগৎ সংসারের সব কিছুর মধ্যে তিনিই রয়েছেন। ‘তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি’—তাঁর জ্যোতিতেই সব বস্তু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সকল আলোকের উৎসও তিনি। বেদান্ত-শাস্ত্রে স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা করা যায় না। তাঁরা উভয়েই ব্রহ্ম।
‘বিজানন্ বিদ্বান্ ভবতে’—প্রথমেই জানতে হবে, অর্থাৎ উপনিষদের চর্চা করে ও গুরুর কাছ থেকে ব্রহ্মের স্বরূপ শুনে, বুদ্ধি দিয়ে তা ধারণা করতে হবে। আচার্য বলবেন: ‘তত্ত্বমসি—তুমিই সেই।’ গুরুর এই উপদেশ প্রথমে বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে। অর্থাৎ বুদ্ধির দ্বারা প্রথমে শব্দার্থকে বুঝতে হবে। তারপর সেই শব্দার্থকে নিজ হৃদয়ে উপলব্ধি করতে হবে। যিনি এই পরমসত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম তিনিই জ্ঞানী ব্যক্তি। আমরা নানা রকমের পরিকল্পনা করতে পারি, কিন্তু সেগুলিকে যদি নিজের জীবনে প্রয়োগ না করি তবে তা বৃথা হয়ে যায়। তবলার ‘বোল’ লোকে বেশ মুখস্থ বলতে পারে কিন্তু হাতে আনা বড় শক্ত। সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে। ‘ন অতিবাদী’—যিনি এই সত্যকে উপলব্ধি করেছেন তিনি ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ ভিন্ন অন্য কোন কথা বলেন না। অজ্ঞানতা দূর হয়ে আমাদের যখন স্বরূপজ্ঞান হয় তখন আর আমাদের ভুল হয় না। যে জ্ঞান আমরা বুদ্ধির দ্বারা অর্জন করে থাকি ভবিষ্যতে তা হয়তো ভুলেও যেতে পারি। কিন্তু এই জ্ঞান কেবলমাত্র বুদ্ধির কচ্কচানি নয়, এ এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতি। যখন কোন ব্যক্তি জানেন ‘তিনিই স্বয়ং আত্মা’, তখন তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, যে কাজই করুন না কেন, নিজ স্বরূপ সম্পর্কে তিনি সবসময়ই সজাগ। এই বিশ্বাস তাঁর কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
তখন কি হয়? ‘আত্মক্রীড়ঃ’—সাধক তখন নিজেই নিজের সঙ্গে খেলা করেন। আমরা হয়তো বলব, এসব কি ব্যাপার! এও কি সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। আত্মা ছাড়া তিনি আর কিছুই জানেন না। সাধক তখন অনুভব করেন এক আত্মা বা এক ঈশ্বরই সবার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর কাছে এক বৈ দুই নেই। ‘আত্মরতিঃ’—সাধক তখন নিজ আত্মাতে লীন হন। তিনি নিজের আনন্দে নিজেই বিভোর। কারণ সমগ্র বিশ্বচরাচর যে তাঁর ভেতরেই রয়েছে, বাইরে নয়। সাধক যখন আত্মার সাথে মিলিত হন, তখন তিনিই বরিষ্ঠ, সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ। ‘এক’ জ্ঞানই জ্ঞান, আর ‘দুই’ জ্ঞান অজ্ঞান—এটা উপলব্ধি করাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য।
সত্যেন লভ্যস্তপসা হ্যেষ আত্মা
সম্যগ্জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্যেণ নিত্যম্।
অন্তঃশরীরে জ্যোতির্ময়ো হি শুভ্রো
যং পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ॥৫।।
অন্বয়: এষঃ জ্যোতির্ময়ঃ শুভ্রঃ হি আত্মা (এই জ্যোতির্ময় শুভ্র আত্মা); অন্তঃশরীরে (দেহের অভ্যন্তরে); নিত্যম্ (সর্বদা); সত্যেন (কথায় ও কাজে সত্যনিষ্ঠার দ্বারা); তপসা (আত্মসংযমের দ্বারা); ব্রহ্মচর্যেণ (ব্রহ্মচর্যের দ্বারা); সমগ্জ্ঞানেন (যথার্থ জ্ঞানের দ্বারা); লভ্যঃ (লাভ করা যায়); [ন অন্যথা (অন্য উপায়ের দ্বারা নয়)]; যম্ (আত্মাকে); ক্ষীণদোষাঃ (যাঁদের মন শুদ্ধ ও অনাসক্ত); যতয়ঃ (সাধকগণ); পশ্যন্তি (অনুভব করেন)।
সরলার্থ: দেহের মধ্যে হৃৎপদ্মে এই শুদ্ধ ও জ্যোতির্ময় পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে হবে। কায়মনোবাক্যে সত্যের অনুসরণ, স্বরূপ চিন্তা এবং আত্মসংযম ও ব্রহ্মচর্য অভ্যাসের দ্বারাই আত্মজ্ঞান লাভ করতে হবে। সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণ এই পরমাত্মাকে উপলব্ধি করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মোপলব্ধির জন্য সাধককে যেসব ধাপ অতিক্রম করতে হয়, এই শ্লোকে সেকথাই বলা হয়েছে। প্রথমত এবং প্রধানত সাধক কায়মনোবাক্যে (অর্থাৎ কথায়, কাজে এবং আচরণে) সত্যনিষ্ঠ হবেন। সত্যকে তিনি সবার ওপরে স্থান দেন। সত্য রক্ষার জন্য তিনি কোন কিছুর সাথে আপস করেন না। কারণ, সত্যই তাঁর ঈশ্বর। সাধককে কঠোর তপস্যা করতে হবে, এবং সব সময় আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকতে হবে। কৃচ্ছ্রতা বলতে কিন্তু আচার-অনুষ্ঠানকে বোঝায় না, এর অর্থ আত্মসংযম। দেহ এবং মন তখন সাধকের বশে থাকে। খুব সহজ কাজ নয়, কিন্তু একাজ খুবই জরুরী। সাধক বহু বছরের কঠোর সংগ্রামের ফলে এই আত্মসংযম লাভ করেন। এই সংগ্রামই হচ্ছে কৃচ্ছ্রতা। আত্মসংযমের আর একটি তাৎপর্য হল মনঃসংযোগ। সাধক লক্ষ্যে অবিচল থেকে তাঁতে মনকে একাগ্র করেন।
আত্মজ্ঞান লাভ করাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য; কিন্তু কোথায় আছেন এই আত্মা? এর প্রকৃতিই বা কেমন? সকলের হৃৎপদ্মে এই আত্মা বিরাজিত। আত্মা স্বয়ং প্রকাশিত ও শুদ্ধ। যেসব যোগিগণের মন রাগ-দ্বেষ, লোভ, স্বার্থপরতা ইত্যাদি মলিনতা থেকে মুক্ত তাঁরা নিজ হৃদয়ে আত্মাকে উপলব্ধি করেন। চিত্তশুদ্ধি হলে সাধক সত্যকে বুঝতে পারেন। ‘সত্য’ বলতে এখানে ‘পরম সত্য’কে বোঝানো হয়েছে। এই পরম সত্য যে কি তা কেউ জানে না। এই মুহূর্তে আমরা সত্য বলতে যা বুঝি সেই আপেক্ষিক সত্যকে ধরেই পরম সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এই সত্যনিষ্ঠাই ধর্মীয় জীবনের মূল কথা।
সত্যমেব জয়তে নানৃতং
সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ।
যেনাক্রমন্তষয়ো হ্যাপ্তকামা
যত্র তৎসত্যস্য পরমং নিধানম্॥৬।।
অন্বয়: সত্যমেব (সত্যেরই); জয়তে (জয় হয়); অনৃতং ন (মিথ্যার নয়); সত্যেন (সত্যের দ্বারা); বিততঃ (বিস্তৃত); দেবযানঃ পন্থাঃ (দেবযান নামক পথ); যেন হি (যার দ্বারাই); আপ্তকামাঃ (বিগতস্পৃহ); ঋষয়ঃ (ঋষিগণ); আক্রমন্তি (যান); যত্র (যেখানে); তৎ (সেই); সত্যস্য (সত্যের মধ্যে); পরমম্ (শ্রেষ্ঠ); নিধানম্ (ফল নিহিত)।
সরলার্থ: একমাত্র সত্যেরই জয় হয়, অসত্যের জয় হয় না। কারণ স্বর্গদ্বারে পৌঁছবার প্রশস্ত পথটি সত্যের দ্বারাই লাভ করা যায়। পূর্ণকাম ঋষিরা (যাঁদের কোন কামনা বাসনা নেই) সত্যের মাধ্যমেই তাঁদের পরম লক্ষ্যে পৌঁছান।
ব্যাখ্যা: আমরা সকলেই জানি, সত্যেরই জয় হয়, অসত্যের হয় না। কোন ধার্মিক ব্যক্তি অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রথমে হয়তো পরাস্ত হতে পারেন, কিন্তু পরিণামে সত্যেরই জয় হবে। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের মনে হয় ব্যক্তিটি তো বেশ সুখেই আছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তার পতন অনিবার্য। তার অপকর্ম বেশিদিন গোপন থাকে না। তখন সমাজ তাকে ত্যাগ করে। তার সমস্ত চালাকি শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
আধ্যাত্মিক জীবনের শুরুতেও সত্য, শেষেও সত্য। অধ্যাত্ম পথে সাধক সবসময় সত্যকে ধরে থাকেন। তিনি সত্যের জন্য সব কিছুকে ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করেন না। তাঁদের কাছে উপায়ও উদ্দেশ্যর মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই সত্যের পথই হচ্ছে স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা। কোন অবস্থাতেই সাধক এই সত্য থেকে সরে আসেন না। যে কোন মূল্যে তিনি এই পথকে ধরে থাকেন। আর শেষে তিনি সেই লক্ষ্যে পৌঁছান যা পূর্ণকাম, আপ্তকাম ঋষিরা লাভ করে থাকেন। এই লক্ষ্য হল—আত্মজ্ঞান বা মুক্তি। আত্মজ্ঞান লাভে সাধক অনন্ত শান্তি ও অপার আনন্দ লাভ করেন। সত্যই আধ্যাত্মিক জীবনের মূল চাবিকাঠি।
বৃহচ্চ তদ্ দিব্যমচিন্ত্যরূপং
সূক্ষ্মাচ্চ তৎ সূক্ষ্মতরং বিভাতি।
দূরাৎ সুদুরে তদিহান্তিকে চ
পশ্যৎস্বিহৈব নিহিতং গুহায়াম্॥৭।।
অন্বয়: তৎ (তিনি অর্থাৎ সেই ব্রহ্ম); বৃহৎ (সর্বব্যাপী); চ (এবং); দিব্যম্ (জ্যোতিস্বরূপ); অচিন্ত্যরূপম্ (চিন্তার অতীত); তৎ সূক্ষ্মাৎ চ সূক্ষ্মতরম্ (তিনি সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর); [রূপে] বিভাতি (বিবিধ রূপে প্রকাশ পান); তৎ (তিনি); দূরাৎ (দূর থেকে); সুদূরে (আরও দূরে); অন্তিকে চ ইহ (এই দেহে; অতি কাছে); পশ্যৎসু (দ্রষ্টাদের কাছে); ইহ এব গুহায়াম্ (এই গুহাতে অর্থাৎ হৃদয়ে); নিহিতম্ (নিহিত আছেন)।
সরলার্থ: ব্ৰহ্ম অনন্ত, ইন্দ্রিয়াতীত এবং কল্পনার অতীত। ইনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম (সূক্ষ্মতমের চেয়েও সূক্ষ্মতর), তিনি দূরতমের চেয়েও দূরে রয়েছেন আবার একই সাথে খুব কাছেও রয়েছেন। মানুষের হৃদয়-পদ্মেই তিনি বিরাজ করেন।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্ম বলতে আমরা কি বুঝি? ব্রহ্মের স্বরূপই বা কি? ব্রহ্ম কথাটির অর্থ ‘বৃহৎ’ বা ‘বৃহত্তম’। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে হলে কথায় ও কাজে সত্যকে ধরে থাকতে হবে। ব্রহ্ম বাক্যমনাতীত। ব্রহ্মকে কল্পনা করা যায় না। ইনি স্বয়ংপ্রকাশ এবং আকাশের চেয়ে সূক্ষ্ম। প্রকৃতপক্ষে তিনি আছেন বলেই এই জগতের সব কিছুর অস্তিত্ব আছে। সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য উজ্জ্বল বস্তুর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকেই প্রকাশ করেন। ব্রহ্মই এসব বস্তুর কারণ। সকল প্রাণীর হৃদয়ে ব্রহ্ম বিরাজ করেন। কিন্তু তিনি আমাদের হৃদয়ে থাকলেও অবিদ্যার জন্য আমরা তা বুঝতে পারি না। যোগিগণ নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। তাঁরা নিজ হৃদয়ে ব্রহ্মের উপস্থিতি অনুভব করে ব্রহ্মের সাথে এক হয়ে যান।
ন চক্ষুষা গৃহ্যতে নাপি বাচা
নান্যৈর্দেবৈস্তপসা কর্মণা বা।
জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্ব-
স্ততস্তু তং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মানঃ॥৮।।
অন্বয়: [তৎ] চক্ষুষা ন গৃহ্যতে (সেই ব্রহ্মকে চোখের দ্বারা দেখা যায় না); বাচা অপি ন (বাক্যের দ্বারাও নয়); অন্যৈঃ দেবৈঃ ন (অন্য কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারাও নয়); তপসা কর্মণা বা [ন] (তপস্যা বা কর্মের দ্বারাও নয়); জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্বঃ (নির্মলজ্ঞানের দ্বারা যাঁর মন শুদ্ধ হয়েছে); ততঃ (তারপর); [সাধকঃ] ধ্যায়মানঃ (সেই সাধক ধ্যান করতে করতে); তং নিষ্কলম্ (সেই নির্গুণ ব্রহ্মকে); পশ্যতে (দর্শন করেন)।
সরলার্থ: আত্মা নিরাকার তাই তাঁকে দেখা যায় না। ভাষা দিয়েও তাঁকে প্রকাশ করা যায় না। আত্মা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নন। তপস্যা বা যাগযজ্ঞের দ্বারাও তাঁকে পাওয়া যায় না। সাধক যখন ইন্দ্রিয়সুখে সম্পূর্ণ অনাসক্ত হন তখন তাঁর চিত্তশুদ্ধি হয়। তখন তিনি নিরাকার ব্রহ্মের অর্থাৎ আত্মার দর্শন লাভ করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মা অনন্য, তাঁকে উপলব্ধি করবার উপায়ও অনন্য। আত্মার কোন রূপ নেই, তাই তাঁকে দেখা যায় না। আত্মা অনির্বচনীয়। অর্থাৎ ভাষা দ্বারাও তাঁকে প্রকাশ করা যায় না। সংক্ষেপে বলা যায় আত্মা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নন। আত্মা অসীম কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি সসীম। এমনকি আমাদের মনও সসীম। সসীম কি কখনও অসীমকে ধরতে পারে? এমনকি তপস্যা ও যাগযজ্ঞ দ্বারাও আত্মাকে লাভ করা যায় না।
এখন প্রশ্ন হল, আত্মোপলব্ধির সেই অনন্য উপায়টি কি? চিত্তশুদ্ধি। আত্মা আমাদের ভেতরেই রয়েছেন। আমাদের হৃদয়ই আত্মার আবাস—এ কথা উপনিষদ বারবার বলছেন। যে-মন স্বভাবতই চঞ্চল ও ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত সেই মন শুদ্ধ নয়। মন যেন একটি তরঙ্গায়িত হ্রদ। তরঙ্গের জন্যই হ্রদের গভীরে কি আছে তা আমরা দেখতে পাই না। একইভাবে, অশান্ত মনে পরমাত্মা নিজেকে ধরা দেন না। আমাদের মনে যখন কামনা বাসনার লেশমাত্র থাকে না তখন মন শান্ত হয়। আর সেই শান্ত মনেই পরমাত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন। এখানে আরো একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। আয়নার উপরে ধুলো জমা থাকলে সেই আয়নাতে নিজেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। নিজেকে ভালভাবে দেখতে হলে ধুলো সরিয়ে আয়নাকে পরিষ্কার করতে হয়। শান্ত, স্থির ও বাসনামুক্ত মনেই আত্মার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে।
সুতরাং আত্মজ্ঞান লাভের অনন্য উপায়টি হল —মনঃসংযম।
এষোঽণুরাত্মা চেতসা বেদিতব্যো
যস্মিন্ প্রাণঃ পঞ্চধা সংবিবেশ।
প্রাণৈশ্চিত্তং সর্বমোতং প্রজানাং
যস্মিন্ বিশুদ্ধে বিভবত্যেষ আত্মা॥৯।।
অন্বয়: এষঃ অণুঃ আত্মা (এই সূক্ষ্ম আত্মা); চেতসা (শুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা); বেদিতব্যঃ (জ্ঞাতব্য); যস্মিন্ (যে শরীরে); প্রাণঃ (প্রাণ বায়ু); পঞ্চধা (পাঁচ প্রকারে); সংবিবেশ (প্রবেশ করেছে); প্রাণৈঃ (প্রাণের দ্বারা); প্রজানাম্ (প্রাণিগণের); সর্বং চিত্তম্ ([প্রাণীদের] সমগ্র হৃদয়); ওতম্ (ব্যাপ্ত); যস্মিন্ বিশুদ্ধে (যে চিত্ত শুদ্ধ হলে); এষঃ আত্মা (উক্ত আত্মা); বিভবতি (নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন)।
সরলার্থ: প্রাণবায়ু পাঁচভাগে ভাগ হয়ে দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। একই দেহে সূক্ষ্ম আত্মাও রয়েছেন যা শুদ্ধ বুদ্ধির গোচর। এ কথা সত্য যে, সকল বস্তু ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যেও শুদ্ধ চৈতন্য (আত্মা) বিরাজ করেন। চিত্তশুদ্ধি হলে আত্মা তখন নিজেকে প্রকাশ করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মা স্বভাবতই সূক্ষ্ম। শুদ্ধ মনে তিনি নিজেকে ধরা দেন। কিন্তু আত্মার অবস্থান কোথায়? দেহ মধ্যস্থ হৃৎপদ্মে তিনি বিরাজ করেন। আবার একই দেহের ভিতর পঞ্চবায়ুও (প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান) রয়েছে। সাধক কিভাবে এই আত্মাকে আবিষ্কার করেন? চিত্তশুদ্ধির দ্বারা। চিত্তশুদ্ধি হয় কি ভাবে? ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, নিত্য-অনিত্য এই বিচারের দ্বারা। এর ফলে নিত্য-অনিত্যের মধ্য থেকে সাধক নিত্য. বস্তুকেই গ্রহণ করেন। মাখন দুধের সব অংশ জুড়ে থাকলেও দুধ থেকে তাকে পৃথক করা যায়। সেই রকম ভাবে জ্বালানির সর্বত্র আগুন থাকলেও আগুনকে জ্বালানি থেকে পৃথক করা যায়। শরীরের সর্বত্র আত্মা রয়েছেন। প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের সঙ্গেও আত্মা যুক্ত। মুঞ্জা ঘাস থেকে যেমন মাঝের ডগাটিকে (ইষিকা) আলাদা করা যায় তেমনি বিচার বুদ্ধির দ্বারা আত্মাকেও শরীর থেকে পৃথক করা যায়। নিজেকে স্পষ্টভাবে দেখতে হলে যেমন পরিষ্কার আয়না লাগে ঠিক তেমনি শুদ্ধ মনে আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন। চিত্তশুদ্ধি না হলে আত্মজ্ঞান লাভ করা যায় না।
যং যং লোকং মনসা সংবিভাতি
বিশুদ্ধসত্ত্বঃ কাময়তে যাংশ্চ কামান্।
তং তং লোকং জয়তে তাংশ্চ কামাং-
স্তস্মাদাত্মজ্ঞং হ্যর্চয়েদ্ ভূতিকামঃ॥১০।।
অন্বয়: বিশুদ্ধসত্ত্বঃ (যে ব্যক্তির মন শুদ্ধ [এবং সেহেতু আত্মাকে জানেন]); মনসা (মনের দ্বারা); যং যং লোকং সংবিভাতি (যে যে লোক পেতে ইচ্ছা করেন [নিজের জন্য বা অপরের জন্য]); যান্ কামান্ চ (যে সকল কাম্য বস্তুও); কাময়তে (কামনা করেন); তং তং লোকং জয়তে ( সেই সেই লোক জয় করেন) তান্ চ কামান্ (সেই সকল কাম্য বস্তুও); [লভতে—প্রাপ্ত হন]; তস্মাৎ (সেই হেতু); ভূতিকামঃ (কল্যাণেচ্ছু ব্যক্তিরা); আত্মজ্ঞং হি (আত্মজ্ঞ পুরুষকেই); অৰ্চয়েৎ (অর্চনা করবেন)।
সরলার্থ: যিনি শুদ্ধ মনের অধিকারী তিনি যে যে লোক বা যে সকল বস্তু পেতে ইচ্ছা করেন, সেই সকল লোক ও কাম্য বস্তু তিনি লাভ করে থাকেন। এই কারণে কল্যাণকামী বা ঐশ্বর্যপ্রার্থী ব্যক্তি এরকম পুরুষের পূজা করবেন।
ব্যাখ্যা: যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তিনি সকলের মধ্যে নিজ আত্মাকে দেখেন। অর্থাৎ এ নিখিল জগতের সাথে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন। তাঁর মনে কোন ইচ্ছা জাগা মাত্রই তাঁর সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়। তাঁর এই ইচ্ছা নিজের জন্যও হতে পারে আবার অন্যের জন্যও হয়ে থাকে। কারণ সকলের মধ্যে তিনি তখন নিজেকেই দেখেন। অন্যের সুখে তিনি সুখী, অন্যের দুঃখে তিনি দুঃখী। তিনি অন্যের থেকে স্বতন্ত্র নন, অন্যেরাও তাঁর থেকে পৃথক নয়।
।। মুণ্ডক উপনিষদের তৃতীয় মুণ্ডকের প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।।
