প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১৩ জুন : রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসা মেরেকেটে এক মাস হয়েছে । তার মধ্যেই পূর্ব বর্ধমান জেলার জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গেরুয়া শিবিরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খবর আসতে শুরু করেছে । দিন দুয়েক আগেই সরকারি প্রকল্পে রাস্তা নির্মানের কাজের কর্তৃত্ব দখল নিয়ে বিবাদের জেরে পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামে নিজেদেরই দলীয় কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছিল বিজেপির এক মণ্ডল সভাপতি ও তার দলবলের বিরুদ্ধে । এনিয়ে থানায় অভিযোগও দায়ের হয়েছে৷ এবারে একই জেলার জামালপুরে দুই বিজেপি কর্মীকে মারধর ও খুনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এক মণ্ডলের সভাপতির বিরুদ্ধে । ওই মণ্ডলের সভাপতিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ শনিবার দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে জামালপুর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখালো বহু পুরুষ ও মহিলা ৷ যদিও কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দেয় পুলিশ ।দলের এই প্রকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে চরম বিব্রত গেরুয়া শিবির । এ নিয়ে বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি স্মৃতিকনা বসুকে ফোন করা হলে তিনি বলেন,’কি ঘটনা ঘটেছে তার বিস্তারিত কিছু আমি এখনো জানিনা।আমাকে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে ।’
জানা গিয়েছে, জামালপুর-১ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি প্রধানচন্দ্র পালের সঙ্গে একই মণ্ডলের সহ-সভাপতি সুশান্ত মণ্ডলের দ্বন্দ্ব দল রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে । মূলত অতিরিক্ত দামে বালি খাদান থেকে বালি বিক্রী হওয়ার প্রতিবাদ করা নিয়ে সুশান্ত মণ্ডলের অনুগামীদের সঙ্গে প্রধানচন্দ্র পাল ও তাঁর সঙ্গীদের বিরোধ । সাম্প্রতিক সময়ে এনিয়ে দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারন করেছে । তারই জের ধরে সুশান্ত ঘনিষ্ট দুই বিজেপি কর্মীকে মারধর ও খুনের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে । তারপর থেকেই সেই দ্বন্দ্বে ঘৃতাহুতি পড়েছে ।
এদিন প্রধানচন্দ্র পালকে গ্রেপ্তারের দাবিতে জামালপুর থানার সামনে তুমুল বিক্ষোভ দেখায় অন্য গোষ্ঠীর লোকজন । জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার বলেন,’এদিন যাঁরা জামালপুর থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে তারা বিজেপির কেউ নয় বলেই আমি মনে করি। প্রকৃত বিজেপির কেউ এমন কাজ করতে পারে না। আমি মনে করি যাঁরা এদিন থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন তাঁরা আসলে বিজেপির ছদ্মবেশধারী তৃণমূলের লোক ।’
তবে বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার যাই বলুন না কেন, সুশান্ত মণ্ডলের অনুগামী বিজেপি কর্মী অসীম বিশ্বাস এদিন জামালপুর থানার সামনে দাড়িয়ে তাঁর দলেরই মণ্ডল সভাপতি প্রধানচন্দ্র পালের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। নিজেকে বিজেপি দলের শক্তিকেন্দ্র প্রমুখ বলে দাবি করে অসীম বিশ্বাস বলেন,’আলোচনা আছে বলে জানিয়ে শুক্রবার রাতে প্রাধান চন্দ্র পাল আমাকে খোকন ঢালির বাড়িতে ডাকে।আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে দেখি সেখানে আরো অনেকে আছে। অসীম জানান,জামালপুরের একটি বালি খাদান কর্তৃপক্ষ বেশী দামে বালি বিক্রী করায় কয়েকদিন আগে তিনি আন্দোলন করেন ওই বালি খাদান তিনি বন্ধ করে দেন। প্রধানচন্দ্র পাল যেহেতু ওই বালি খাদান থেকে কাটমানি তুলতেন তাই বালি খাদানটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানার পর থেকেই তাঁর উপর তিনি চটে ছিলেন। এর জন্য আলোচনা সভায় তাঁকে অনেক মারধর করা হয় ।তাঁর মাথার বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁকে প্রধানচন্দ্র পাল বলেন,’ কুন্তল মজুমদার,সুশান্ত মণ্ডল,,বিথিকা মজুমদার ও বসন্ত পাঁজার নামে আমাকে খুনের চেষ্টার ধারায় থানায় মামলা রুজু করতে হবে।শুধু তাই নয় ,এইরকম একটা বয়ান আমাকে দিয়ে জোর করিয়ে লিখিয়েও নেয়।এর পর তারা আমাকে বলে, চল থানায় অভিযোগ জানাতে যাবো। থানায় আমাকে দিয়ে জোরপূর্বক অভিযোগ দায়ের করিয়ে নিয়ে আমাকে মার্ডার করে পথের কোথাও ফেলে দিয়ে সুশান্ত সহ আরো কয়েক জনকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা প্রানচন্দ্র পাল ও তাঁর লোকজন করেছিল । এমন অবস্থায় কোন রকমে আমি নিজের প্রাণ বাঁচাই । গোটা ঘটনার কথা জানিয়ে থানাতে অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে অসীম বিশ্বাস জানিয়েছেন।
অপর বিজেপি কর্মী সুধীর মণ্ডল নিজেকে জামালপুরের বত্রিশ বিঘা গ্রামের ১৩৭ নম্বর বুথের বুথ সভাপতি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন আমি অসুস্থ । আমার বুকে ’পেসমেকার’ বসানো আছে ।সেই অবস্থার মধ্যেই আমি দলের দায়িত্ব সামলে যাচ্ছি । তিনি বলেন, কয়েকদিন আগের বৃষ্টিতে আমাদের বত্রিশ বিঘা গ্রামের এক দরিদ্র ব্যক্তির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ব্যক্তিকে যাতে একটি সরকারী ত্রিপল দেওয়া হয় তার জন্য আমি ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জামালপুর বিডিও অফিসে যাই। তখন বিডিও অফিসেই মণ্ডল সভাপতি প্রধানচন্দ্র পাল ও তার এক সাগরেদ মহেশ নামে এক যুবক ছিল। আমাকে দেখেই প্রধানচন্দ্র পাল ও মহেশ মিলে আমাকে ধরে মারধর শুরু করে। মারতে মারতে আমাকে প্রাধানচন্দ্র পালের কার্যালয়ে নিয়ে যায় । সেখানেও আমাকে একপ্রস্থ মারধোর করা হয় ।’ এখন চারিদিকে দলের এই গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব কিভাবে সামাল দেয় বিজেপির জেলা নেতৃত্ব । তবে স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে হতাশ ও আতঙ্কিত৷ তাদের কথায়,তৃণমূল রাজত্ত্বে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে উত্তপ্ত হওয়ার ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে জামালপুর । ভেবেছিলাম পালাবদলের পর এই পরম্পরা এবার হয়ত বন্ধ হবে । কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় বিজেপি যা শুরু করেছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন তারা ।।
