অষ্টবক্র গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়টি রাজা জনকের স্বানুভূতির প্রকাশ, যেখানে তিনি দেহ ও মনের ঊর্ধ্বে আত্মজ্ঞানের পর পরম শান্তি ও সমতার বর্ণনা দিয়েছেন। এই অধ্যায়ে ৭টি শ্লোক রয়েছে । মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি হল :
দেহ ও মনের অতীত: জ্ঞানী ব্যক্তি দেহ বা মনের কোনো কষ্ট দ্বারা প্রভাবিত হন না ।
সহজ অবস্থা: “আমি কিছুই করি না” – এই বোধে স্থিত হয়ে, যা কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা ।
বন্ধন ও মুক্তি: কর্ম বা অকর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে, চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থাকা
অদ্বৈত উপলব্ধি: আমি সবার মধ্যে এবং সবাই আমার মধ্যে – এই উপলব্ধিতে থাকা
অষ্টবক্র গীতা ত্রয়োদশোঽধ্যায়ঃ :
জনক উবাচ ॥
অকিঞ্চনভবং স্বাস্থ্যং কৌপীনত্বেঽপি দুর্লভম্ ।
ত্যাগাদানে বিহায়াস্মাদহমাসে যথাসুখম্ ॥১৩-১॥
কুত্রাপি খেদঃ কায়স্য জিহ্বা কুত্রাপি খিদ্যতে ।
মনঃ কুত্রাপি তত্ত্যক্ত্বা পুরুষার্থে স্থিতঃ সুখম্ ॥১৩-২॥
কৃতং কিমপি নৈব স্যাদ্ ইতি সংচিন্ত্য তত্ত্বতঃ ।
যদা যত্কর্তুমায়াতি তত্ কৃত্বাসে যথাসুখম্ ॥১৩-৩॥
কর্মনৈষ্কর্ম্যনির্বংধভাবা দেহস্থয়োগিনঃ ।
সংয়োগায়োগবিরহাদহমাসে যথাসুখম্ ॥১৩-৪॥
অর্থানর্থৌ ন মে স্থিত্যা গত্যা ন শয়নেন বা ।
তিষ্ঠন্ গচ্ছন্ স্বপন্ তস্মাদহমাসে যথাসুখম্ ॥১৩-৫॥
স্বপতো নাস্তি মে হানিঃ সিদ্ধির্যত্নবতো ন বা ।
নাশোল্লাসৌ বিহায়াস্মাদহমাসে যথাসুখম্ ॥১৩-৬॥
সুখাদিরূপা নিয়মং ভাবেষ্বালোক্য ভূরিশঃ ।
শুভাশুভে বিহায়াস্মাদহমাসে যথাসুখম্ ॥১৩-৭॥
শ্লোকের ভাবার্থ :
১): পরিগ্রহ (জড়বস্তু) বর্জনের যে আনন্দ, তা কৌপীন পরলেও (সর্বস্ব ত্যাগ করলেও) দুর্লভ। আমি ত্যাগ এবং গ্রহণ—উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে সুখে আছি ।
২) : শরীর ক্লান্ত হতে পারে, জিহ্বা বা মন ক্লান্ত হতে পারে। কিন্তু আমি এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে পুরুষার্থে (আত্মজ্ঞানে) সুখে আছি ।
৩) : “আমি আসলেই কিছুই করি না”—এই তত্ত্বটি বুঝে, যা কিছু সামনে আসে, তা-ই করে আমি যথাসুখে আছি ।
৪): যোগীরা দেহ নিয়ে কর্ম বা অকর্মে প্রবৃত্ত থাকেন, কিন্তু আমি মিলন ও বিরহ থেকে মুক্ত হয়ে সুখে আছি
৫): দাঁড়িয়ে, চলে বা শুয়ে—কোনো কিছুতেই আমার লাভ বা ক্ষতি নেই, তাই আমি সুখে আছি ।
৬): আমি ঘুমিয়ে পড়লেও আমার কোনো ক্ষতি হয় না, আর খুব চেষ্টা করলেও কোনো বিশেষ সিদ্ধি হয় না। ক্ষতি বা লাভের আশা ত্যাগ করে আমি সুখে আছি ।
৭): আমি ভালো-মন্দের বা সুখ-দুঃখের রূপ বারবার দেখে, সব কামনা থেকে মুক্ত হয়ে আমি সুখে আছি । সংক্ষেপে, অষ্টবক্র গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায় হলো ‘অকিঞ্চনভাব’ বা ‘কিছুই না থাকার’ পরম আনন্দ এবং নিষ্ক্রিয় সাক্ষী হিসেবে জীবনযাপনের নির্দেশিকা।।
