“লাভ জিহাদ” শব্দটির সঙ্গে ভারতের প্রায় প্রতিটি মানুষই অল্পবিস্তর পরিচিত । এই তত্ত্বে দাবি করা হয় যে, মুসলিম যুবকরা একটি সুপরিকল্পিত বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হিন্দু বা অমুসলিম নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে, প্রলোভন দেখিয়ে বা বিয়ে করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে। প্রবক্তারা মনে করেন, এর পেছনে মূল লক্ষ্য হলো জনসংখ্যাগত ভারসাম্য পরিবর্তন করা এবং অমুসলিমদের তুলনায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা। যদিও বামপন্থীদের মত কিছু ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলি এটাকে হিন্দুত্ববাদীদের অপপ্রচার বলে ব্যাখ্যা করে । কিন্তু “লাভ জিহাদ” এর বাস্তবতার ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে বামপন্থীদের দ্বারা শাসিত রাজ্য কেরালায়,এমনই দাবি করা হয় । এনিয়ে ইতিমধ্যেই বলিউডে একটা চলচিত্রও নির্মিত হয়েছে ।
কিন্তু সমস্ত আন্তঃধর্ম সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এই শব্দ প্রয়োগের একটা প্রবণতা সমাজে লক্ষ্য করা যাচ্ছে । অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে,যে আন্তঃধর্ম সম্পর্ক তিক্ত হলে বা প্রতারিত হয়ে হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থন জোটাতে তার প্রেমিক বা স্বামীকে “লাভ জিহাদি” বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নারী । যদিও অনেক ক্ষেত্রে প্রমান মিলছে যে প্রেমিকের ধর্ম পরিচয় সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন ওই মহিলা । এমনকি আন্তঃধর্ম সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওই নারীর পরিবারের সম্মতিরও ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে কোথাও কোথাও । তার মধ্যে একটি ঘটনা হল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের এবং অপরটি আসামের রাজধানী গুয়াহাটির ।
উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের এক মহিলা, যিনি জন্মসূত্রে হিন্দু পরিবারের, সম্প্রতি তার মুসলিম স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জোর করে গোমাংস খাওয়ানো এবং ধর্ম পরিবর্তন করার অভিযোগ তুলেছিলেন । মহিলার দাবি তার স্বামী প্রথমে নিজেকে “অভি” নামে পরিচয় দেয় এবং বিয়ের পর তার ধর্মভ্রষ্ট করেন । মহিলার আরও দাবি যে,তার মুসলিম প্রেমিক রাজ্য পুলিশের সাব-ইন্সেপেক্টরে কর্মরত থাকায় ভয় দেখিয়ে তার মুখ বন্ধ করে রেখেছিল ।
ঘটনাটি রাজ্যের প্রথম সারির কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি । স্থানীয় এক সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে ঘটনাটি সম্প্রচারিত হয় । বলা হচ্ছে যে মহিলার মুসলিম স্বামী ইসলামপুর থানায় সাব-ইন্সেপেক্টর হিসাবে অবসর নিয়েছেন কিছুদিন আগে৷ চ্যানেলটির বর্ষীয়ান সাংবাদিক পরে মহিলার স্বামীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন । যেখানে তিনি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পালটা চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বছর চারেক আগে যখন আমি ইসলামপুর থানায় কর্মরত ছিলাম তখন তার সঙ্গে মহিলার পরিচিয় হয়, তখন তারা দু’জনেই বিবাহিত । মহিলার এক সন্তান রয়েছে এবং আমার স্ত্রী সন্তান ছিল । সব জেনেও মহিলার বাবা-মায়ের সম্মতিতে আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করি । শিলিগুড়িতে ফ্লাট নিয়ে আমি আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ও তার সন্তানকে রাখি ।’ তার অভিযোগ,’বেশ কিছুদিন আগে আমার দ্বিতীয় স্ত্রী গহনা ও টাকাপয়সা নিয়ে তার বাপের বাড়ি চলে যান । সম্প্রতি ইসলামপুরে আমার বাড়িতে উনি হুজ্জতি করেন ।’
উল্লেখ্য,ওই অবসরপ্রাপ্ত এসআই-এর স্ত্রী বিষয়টি নিয়ে এক মহিলা আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ওই আইনজীবী মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে এসআই-কে “লাভ জিহাদি” বলে দেগে দিয়ে রীতিমতো হুমকি দেন । বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত এস আই । তিনি বলেছেন, ‘আমি নিজের পরিচয় গোপন করিনি । আমাদের বিয়েতে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা-মা ও ভাইয়ের সম্মত্তি ছিল । রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে আমি তাকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়েছি । তার পরেও আমাকে লাভ জিহাদি আখ্যা দেওয়া অত্যন্ত সম্মানহানিকর ।’ এক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আবেদন জানান ।
আসামের গুয়াহাটির ঘটনা
আর একটি বহুল চর্চিত ঘটনা হল মুসলিম প্রেমিকের সঙ্গে হোটেলে রাত্রিবাস করার সময় আসামের গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী নিমিশা থাকুরিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু । নিমিশার প্রেমিকের নাম আশিক আলি । আশিক একজন র্যাপিডো চালক । নিমিশার বাবা-মা তাদের মেয়ের প্রেমের কথা জানতেন ।
কারন ঘটনার দিন নাকি নিমিশা নাকি ফোন করে তার মাকে ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন৷ তরুনীর বাবা, ডিপ থাকুরিয়া, তার মেয়ের মৃত্যুর দিনে তার স্ত্রীক্ব ফোন করার কথা জানিয়ে বলেন, নিমিশা ভোর রাত ২:০০ টার দিকে ফোন করে বলেছিল যে তার বয়ফ্রেন্ড আশিক আলি তাকে মারছে । ‘মেয়ে আমার স্ত্রীকে ফোন করে বলেছিল,”মা,দয়া করে আমাকে বাঁচাও । সে আমাকে বুকে আঘাত করছে এবং আমার শ্বাস নেওয়ার সমস্যা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেছেন যে ফোন বন্ধ হওয়ার আগে, নিমিশা চিৎকার করে সাহায্য চাইছিল । যখন তিনি তার মেয়ের মৃতদেহ দেখেছিলেন, তখন তিনি তার ঠোঁটের দাগ এবং গলার ক্ষতির দাগ দেখেছিলেন।
আশিক ও নিমিশার সম্পর্ক এবং ঈদের সময় নিমিশার তাদের বাড়িতে আসার কথা উল্লেখ করেছেন আশিকের মা। আশিকের মায়ের ভাষ্যমতে, আশিক ও নিমিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা একে অপরকে ভালোবাসত । তিনি জানান, আশিকের ফোনে নিমিশার নম্বরটি ‘জান’ (Jaan) নামে সেভ করা ছিল এবং তাদের মধ্যে প্রায়ই ফোনে কথা হতো। তিনি আরও বলেন যে, নিমিশা তাদের বাড়িতে আসত এবং এলাকার মানুষজনও তাদের সম্পর্কের বিষয়টি জানত।
ঈদের সময়ের একটি সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে আশিকের মা জানান যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিমিশার সাথে তাদের সম্পর্ক এবং দুই পরিবারের ধর্মীয় পার্থক্যের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি নিমিশাকে বলেছিলেন যে, তারা দুজনেই শিক্ষিত হলেও তাদের পরিবারগুলোর ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক পটভূমি ভিন্ন। তাঁর ভাষ্যমতে, পরিবারটি আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আশিক দিনমজুর হিসেবে কাজ করে ।
তিনি আরও বলেছেন যে, নিমিশার মৃত্যু তাঁর কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল এবং তাঁর ছেলে দোষী সাব্যস্ত হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে, তিনি ঘটনার রাতে নিমিশার পরিবারের কাছে করা একটি ফোন কল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কলে নিমিশা বলেছিলেন, “ওরা আমাকে মারধর করছে।” আশিকের মা জানান, তিনি জানতে চান ওই কলে নিমিশা কাদের কথা বলছিলেন এবং সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল। এই বক্তব্যগুলো আশিকের মায়ের এবং মামলাটির তদন্ত চলাকালীন এগুলো তাঁর নিজস্ব দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জানা যায়,বছর ২২ এর নিমিষা ঠাকুরিয়াকে ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে গুয়াহাটি শহরের এক হোমস্টে থেকে উদ্ধার করা হয়। একই হোমস্টে থেকে তার প্রেমিক আসিফ আলিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সে জানায় নিমিশা নাকি আত্মঘাতী হয়েছে । শুক্রবার নিমিশা পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটাবেন। তবে বন্ধুর বাড়িতে না থেকে ২৬ বছর বয়সী প্রেমিক আসিফের সঙ্গে শহরের এক হোমস্টেতে চলে যান। রাত দুটো নাগাদ নিমিষা তাঁর মাকে ফোন করে বলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’। কিন্তু কথা শেষ করতে পারেননি। হোমস্টের কেয়ারটেকার বিপুল বাইলুং জানিয়েছেন, রাতে তিনি এক পুরুষের চিৎকার শুনতে পান। তাঁর কথায়,’কেউ একজন চিৎকার করে বলছিল, ‘দাদা ওঠো, ওঠো।’ আমরা বাইরে বেরিয়ে কাউকে দেখতে পাইনি। রাস্তায় টহলরত পুলিশ আমাদের বাইরে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে।’ বিপুল জানান, পুলিশ চলে যাওয়ার পর তিনি ফের কান্নার আওয়াজ পেয়ে একটি ঘরে গিয়ে দেখেন, ওই যুবক নিমিষার নিথর দেহ ধরে মেঝেতে বসে আছেন। জানা গিয়েছে, তাঁরা ১০ নম্বর ঘরটি ভাড়া নিয়ে ৯ নম্বর ঘরও ব্যবহার করছিলেন।
এদিকে নিমিশার বাবা ডিপ থাকুরিয়া এখন বিচারের দাবি করছেন । কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা এখন বলছেন, মেয়েকে যথার্থ সংস্কার ও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হত তাহলে ওই তরুনীর এই প্রকার করুন পরিনতি হত না । তবে ওই তরুনীকে তার বাবা-মা সতর্ক না করে দিলেও এক হিন্দু সংগঠন তাকে সতর্ক করে দেয় । নিমিশার সঙ্গে ওই সংগঠনের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে । ইংরাজি অক্ষরে লেখা তাদের হিন্দি ভাষায় কথপোকথনটি নিচে তুলে ধরা হল :
হিন্দু সংগঠন : Hello
নিমিশা : Kon
হিন্দু সংগঠন : Nimisha ji main aditya mishra Bajirao maine dekha ki ap mushlim Idka jiska nam ashik ali Ke sath relationship me ho
নিমিশা : To kon si badi bat ho gai meri life
হিন্দু সংগঠন : Ham wahi kam kr rhe hai ab tak 300 se jyada Idkiyo ko bacha chuke hain aap samjhiye hmari bat us ladke se door ho jaiye please ham log nahi chahte hain ki hmari ek aur bahan love jihad ka shikar ho pls sister
নিমিশা : Abe chal nikal apna kaam kr gyan na de wrna sab pr police complaint krungi main ab msg glti se mt kr dena wrna block kr dungi.tum sab andhnhakto ke pass koi kam toh rahta hai nahi kuch job kro paise kamao pr nahi hindu mushlim Krna hai..
হিন্দু সংগঠন : Aaj nhi nimisha par ek din pachhtaogi ki hame logo ne aakar samjhaya tha main nahi samjhi pr ek din syd tumhare pass samjhne ke liye time hi nhi bache.aur han tweet delete nhi hoga jo Krna hai kar lo
নিমিশা : Ab nikal idhar se
গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী নিমিশা থাকুরিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মাও মুখ খুলেছেন । তিনি অপরাধীর কঠোর সাজার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে নিজ রাজ্যের মেয়েদের সম্পর্ক তৈরি করার আগে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন ।।
