প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১১ জুন : রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে গোটা রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক ও নেতাদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হচ্ছে বিপুল পরিমান সরকারি ত্রাণসামগ্রী । এই ধারাবাহিকতায় পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে তৃণমূলের ব্লক সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের নিজস্ব ‘খাঁন বস্ত্রালয়’- এ তল্লাশি চালাতে গিয়ে কার্যত চমকে যান পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকরা । কারন নামে ‘বস্ত্রালয়’ হলেও মেলেনি একটিও বস্ত্রের হদিশ । তার পরিবর্তে থাকে থাকে সাজানো ছিল সরকারী ত্রাণ সামগ্রী । শেষ পর্যন্ত মেহেমুদ খাঁনের ওই কাপড়ের দোকান থেকে সরকারী ত্রাণের হাজার দেড়েক ত্রিপল উদ্ধার হয় । পাশাপাশি একই দিনে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের পার্টি অফিস থেকেও প্রচুর পরিমানে সরকারী ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করেছে প্রশাসন ।
জামালপুর বিডিও অফিসের অদূরে পুলমাথা এলাকায় রয়েছে তৃণমূল নেতা মেহেমুদ খাঁনের দলীয় কার্যালয়। ওই কার্যালয়ের সামনেই রয়েছে খাঁন বস্ত্রালয়।বাম আমলে এই খাঁন বস্ত্রালয়টি ছিল মেহেমুদ খাঁনের রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর মেহেমুদ খাঁন তাঁর কাপড়ের দোকানে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন । সেই থেকে তাঁকে খাঁন বস্ত্রালয়ের ঝাঁপ খুলতে কেউ দেখেনি। যদিও এলাকার মানুষের দাবি,বস্ত্র ব্যবসা লাটে তুলে দিয়ে রাজনীতি করে মেহেমুদ খাঁন ’ধনকুবের’ হওয়ার লক্ষ্য পূরণ করে ফেলেছেন।তবে ২০২৬ বিধানসভা ভোটে রাজ্যের অন্যান অনেক বিধানসভার মতো জামালপুর বিধানসভা আসনেও তৃণমূল গোহারা হারে। তার পর থেকেই মেহেমুদ খাঁন গা ঢাকা দিয়েছে । তাঁর বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যে জামালপুর থানায় জমা পড়েছে। পুলিশ এখন হন্যে হয়ে তার খোঁজ চালাচ্ছে।
আজ কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিস ও খাঁন বস্ত্রালয়ের সামনে জড়ো হয়। এর খানিক পরেই জামালপুর ব্লকের বিডিও এবং এলাকার বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার সেখানে পৌছান । পুলিশ ও প্রশাসন যৌথ ভাবে মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিস এবং খাঁন বস্ত্রালয়ের তালা খুলিয়ে তল্লাশি চালায়। আর খাঁন বস্ত্রালয়ে ঢুকতেই চোখ কপাল ওঠে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের । তাঁরা দেখেন বস্ত্রালয়ে একটাও বস্ত্র নেই ।গোটা বস্ত্রালয়ে শুধু থরে থরে সাজানো রয়েছে সরকারী ত্রাণের অজশ্র ত্রিপল। সেগুলি সব উদ্ধার করার পর পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন মেহেমুদ খানের পার্টি অফিসে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেন । সেই তল্লাশিতে পার্টি অফিস থেকে একাধিক বাণ্ডিলে বাঁধা ত্রাণের কম্বল সহ বিছানার চাদর উদ্ধার হয় ।উদ্ধার হওয়া এই সব সামগ্রী রাজেয়াপ্ত করেছে প্রশাসন । প্রশাসনের এই তল্লাশি অভিযান দেখতে এদিন মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিসের সামনের রাস্তায় মানুষের ভিড় উপচে পড়েছিল।
এদিকে সরকারী ত্রাণ সামগ্রী এই ভাবে তৃণমূলের পার্টি অফিস ও তৃণমূল নেতার বস্ত্র প্রতিষ্ঠানে মজুত করে রাখা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার।তিনি বলেন,সরকারী ত্রাণ গরিব মানুষজনকে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় নি।গরিব মানুষকে বঞ্চিত করে সেগুলি তৃণমূল পার্টি অফিস ও তৃণমূল নেতার বস্ত্র প্রতিষ্ঠানে এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ধরা পড়লে পূর্বস্থলী উত্তরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিণতি যে হতে পারে সেটা বুঝতে পারেন জামালপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অলক মাঝি। তাই কয়েক দিন আগে তিনি জেলাশাসককে চিঠি লিখে ত্রাণ বিলি বন্টন করতে না পারার কথা জানান।সেইসব ত্রাণ সামগ্রী এদিন উদ্ধার করা হলো। তৃণমূল রাজত্বে হওয়া যাবতীয় অপকীর্তির মধ্যে এটাও একটা অপকীর্তি ।
খাঁন বস্ত্রালয়ে ত্রাণের ত্রিপল মজুত রাখা নিয়ে তৃণমূলের ব্লক সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের সঙ্গে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করা হলেও তিনি গা ঢাকা দিয়ে থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় নি।
তবে জামালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অলোক কুমার মাঝির সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলে তিনি বলেন, আমি আগেই জেলাশাসক,মহকুমাশাসক এবং বিডিও কে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম,বিলি বন্টন না হওয়া ত্রাণ সামগ্রি মজুত করে রাখা রয়েছে। সেই সামগ্রী প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার আবেদনও করেছিলাম। আজ প্রশাসন সেই বিষয়ে পদক্ষেপ করেছে।
জামালপুরের মতোই এদিন হেমাতপুরে থাকা পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভার প্রাক্তন বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের তৃণমূল পার্টি অফিস পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে তল্লাশি চলে । তল্লাশিতে পার্টি অফিস থেকেও বিপুল পরিমাণ সরকারী ত্রান সামগ্রী উদ্ধার হয়।জানা গিয়েছে,বিলি বন্টন করতে না পারা ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বপন দেবনাথও পূর্বস্থলী ১ নম্বর ব্লকের বিডিওর কাছে আবেদন জানিয়ে রেখেছিলেন। যদিও পূর্বস্থলী দক্ষিণের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক প্রাণ কৃষ্ণ তপাদার এদিন তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, প্রাক্তন মন্ত্রীকে বাঁচাতে আমাকে অন্ধকারে রেখে নাদনঘাট থানার আইসি ওই ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করেছে। এরজন্য তিনি আই সি-র গ্রেফতারির দাবি তুলেছেন।।
