নারায়ণীয়ং (Narayaneeyam) হলো মেল্পথুর নারায়ণ ভট্টতিরি রচিত একটি বিখ্যাত সংস্কৃত স্তোত্রকাব্য, যা শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের একটি সংক্ষিপ্ত ও ভক্তিপূর্ণ রূপ। এর ২০তম দশকে (দশকম ২০) পরমযোগী শ্রীঋষভদেব এবং তাঁর পুত্রদের (নবযোগীশ্বর) পবিত্র চরিত্র ও আধ্যাত্মিক উপদেশ বর্ণিত হয়েছে।
এই দশকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার ঋষভদেবের জীবন, তাঁর ১০০ পুত্রের জন্ম, জ্যেষ্ঠ পুত্র ভরতের নামে এই ভূমির ‘ভারতবর্ষ’ নামকরণ এবং ঋষভদেবের পরম হংসাবস্থা (অবধূত অবস্থা) বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রিয়ব্রতস্য প্রিযপুত্রভূতা-
দাগ্নীধ্ররাজাদুদিতো হি নাভিঃ ।
ত্বাং দৃষ্টবানিষ্টদমিষ্টিমধ্যে
তবৈব তুষ্ট্যৈ কৃতযজ্ঞকর্মা ॥১॥
অভিষ্টুতস্তত্র মুনীশ্বরৈস্ত্বং
রাজ্ঞঃ স্বতুল্যং সুতমর্থ্যমানঃ ।
স্বয়ং জনিষ্যেঽহমিতি ব্রুবাণ-
স্তিরোদধা বর্হিষি বিশ্বমূর্তে ॥২॥
নাভিপ্রিয়ায়ামথ মেরুদেব্যাং
ত্বমংশতোঽভূঃ ৠষভাভিধানঃ ।
অলোকসামান্যগুণপ্রভাব-
প্রভাবিতাশেষজনপ্রমোদঃ ॥৩॥
ত্বয়ি ত্রিলোকীভৃতি রাজ্যভারং
নিধায় নাভিঃ সহ মেরুদেব্যা ।
তপোবনং প্রাপ্য ভবন্নিষেবী
গতঃ কিলানংদপদং পদং তে ॥৪॥
ইংদ্রস্ত্বদুত্কর্ষকৃতাদমর্ষা-
দ্ববর্ষ নাস্মিন্নজনাভবর্ষে ।
যদা তদা ত্বং নিজয়োগশক্ত্যা
স্ববর্ষমেনদ্ব্যদধাঃ সুবর্ষম্ ॥৫॥
জিতেংদ্রদত্তাং কমনীং জয়ংতী-
মথোদ্বহন্নাত্মরতাশয়োঽপি ।
অজীজনস্তত্র শতং তনূজা-
নেষাং ক্ষিতীশো ভরতোঽগ্রজন্মা ॥৬॥
নবাভবন্ যোগিবরা নবান্যে
ত্বপালযন্ ভারতবর্ষখংডান্ ।
সৈকা ত্বশীতিস্তব শেষপুত্র-
স্তপোবলাত্ ভূসুরভূযমীয়ুঃ ॥৭॥
উক্ত্বা সুতেভ্য়োঽথ মুনীংদ্রমধ্যে
বিরক্তিভক্ত্যন্বিতমুক্তিমার্গম্ ।
স্বয়ং গতঃ পারমহংস্যবৃত্তি-
মধা জডোন্মত্তপিশাচচর্য়াম্ ॥৮॥
পরাত্মভূতোঽপি পরোপদেশং
কুর্বন্ ভবান্ সর্বনিরস্যমানঃ ।
বিকারহীনো বিচচার কৃত্স্নাং
মহীমহীনাত্মরসাভিলীনঃ ॥৯॥
শয়ুব্রতং গোমৃগকাকচর্য়াং
চিরং চরন্নাপ্য পরং স্বরূপম্ ।
দবাহৃতাংগঃ কুটকাচলে ত্বং
তাপান্ মমাপাকুরু বাতনাথ ॥১০॥
শ্লোক ও ভাবার্থের সারসংক্ষেপ:
ঋষভ অবতারের আগমন: নাভিরাজ এবং মরুদেবীর কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান নিজেই তাঁদের পুত্র রূপে অবতীর্ণ হন। তাঁর নাম রাখা হয় ঋষভ। তিনি ছিলেন সর্বগুণসম্পন্ন এবং পরম কান্তিমান।
আদর্শ গৃহস্থ ও ১০০ পুত্রের জন্ম: ইন্দ্রের কন্যা জয়ন্তীর সাথে ঋষভদেবের বিবাহ হয়। তাঁদের ১০০ জন পরম গুণবান পুত্রের জন্ম হয়। ঋষভদেব নিজে ভগবান হয়েও সাধারণ মানুষকে আদর্শ গার্হস্থ্য ধর্ম শেখানোর জন্য শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী জীবনযাপন করেন।
ভরত ও নবযোগীশ্বর:
ঋষভদেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন ভরত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও মহৎ। তাঁর নাম অনুসারেই এই দেশের নাম হয় ভারতবর্ষ। বাকি পুত্রদের মধ্যে ৯ জন পুত্র (কবি, হরি, অন্তরিক্ষ, প্রবুদ্ধ, পিপ্পলায়ন, আবির্হোত্র, দ্রুমিল, চমস এবং করভাজন) পরম ভাগবত ও যোগীশ্বর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, যাঁরা ‘নবযোগীশ্বর’ নামে পরিচিত।
অন্যান্য পুত্রদের ব্রাহ্মণত্ব লাভ: বাকি ৮১ জন পুত্রও ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, বেদজ্ঞ এবং যজ্ঞপরায়ণ। তাঁরা সকলেই ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করে পবিত্র ব্রাহ্মণে পরিণত হন।
ঋষভদেবের আধ্যাত্মিক উপদেশ:একদা ঋষভদেব তাঁর পুত্রদের এবং প্রজাদের সমবেত করে জীবনের চরম লক্ষ্য সম্পর্কে উপদেশ দেন। তিনি বলেন— এই মানবদেহ কেবল ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য নয়, যা পশু-পাখিরাও পায়। এই দেহের মূল উদ্দেশ্য হলো তপস্যা এবং আত্মশুদ্ধি, যার মাধ্যমে পরম আনন্দ (মোক্ষ) লাভ করা যায়।
মহৎসঙ্গ ও ভক্তির মহিমা:তিনি উপদেশ দেন যে, মহাপুরুষদের সেবা করলে মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়, আর কামাসক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গ নরকের পথ প্রশস্ত করে। সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরকে দর্শন করাই হলো প্রকৃত জ্ঞান।
অবধূত রূপ ধারণ:পুত্রদের উপদেশ দেওয়ার পর এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র ভরতের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে ঋষভদেব সম্পূর্ণ উদাসীন ও মুক্ত হয়ে যান। তিনি বস্ত্র ত্যাগ করে ‘অবধূত’ (দিগম্বর) রূপ ধারণ করেন এবং মৌনব্রত অবলম্বন করে পরিভ্রমণ করতে থাকেন।
জড় ও উন্মত্তের মতো আচরণ: তিনি এমন এক উচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছেছিলেন যেখানে লোকচক্ষুতে তাঁকে জড়, অন্ধ বা উন্মত্তের মতো মনে হতো। কেউ তাঁকে অপমান করলেও বা ঢিল মারলেও তিনি ছিলেন নির্বিকার, কারণ তিনি নিজের দেহকে আত্মাস্বরূপ মনে করতেন না।
যোগৈশ্বর্য ত্যাগ ও দেহাবসান:ভ্রমণ করতে করতে তিনি কুঙ্ক (কূটক) দেশে পৌঁছান। সেখানে তাঁর অলৌকিক যোগৈশ্বর্য (সিদ্ধি) প্রকাশ পেতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি, কারণ সিদ্ধি আধ্যাত্মিক পথের অন্তরায় হতে পারে। অবশেষে দাবানলে (বনের আগুনে) তাঁর নশ্বর দেহটি ভস্মীভূত হয় এবং তিনি পরমাত্মায় লীন হন।
ভট্টতিরির প্রার্থনা:দশকের শেষে কবি নারায়ণ ভট্টতিরি বলেন— হে গুরুবায়ুপুরের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণ! পরম হংসরূপী ঋষভদেবও আপনারই অবতার। হে প্রভু, আপনি আমার সমস্ত রোগ ব্যাধি দূর করে আমাকে আপনার চরণে ভক্তি দান করুন।
আধ্যাত্মিক শিক্ষা:এই দশকমের মূল শিক্ষা হলো— মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য জাগতিক সুখ ভোগ নয়, বরং ঈশ্বভক্তি ও আত্মোপলব্ধি। ঋষভদেবের উপদেশ অহংকার ত্যাগ ও বৈরাগ্য অর্জনের এক চিরন্তন নিদর্শন ।

