বিনা দোষে দীর্ঘ ২ বছর ধরে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি নিরীহ সন্নাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী । এদিকে মৃত্যুশজ্জায় ছেলের মুখটা একবার দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কাতর আবেদন জানিয়েছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বৃদ্ধা মা সন্ধ্যা রানি ধর । সন্নাসী ছেলেও জামিনের জন্য বারবার আদালতের দ্বারস্থ হন । কিন্তু মন গলেনি বাংলাদেশের ইসলামি চরমপন্থী সরকার ও আদালতের । অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোরে চিন্ময় প্রভুর মা সন্ধ্যা রানি ধর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে মাত্র ৫ ঘন্টার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় তাকে । মাতৃ শোকে বিধ্বস্ত সন্তান যখন চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নে নিজের শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে পৌঁছন, নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি তিনি ৷ ইহজন্মে জীবিত অবস্থায় মা’কে দেখতে না পেয়ে মৃতদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সর্বত্যাগী সন্নাসী চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী । রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের সামনে ফুল অর্পন করার সময় তাঁর মর্মস্পর্শী কান্নার দৃশ্যতে প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে । বাংলাদেশের ইসলামি চরমপন্থী সরকারের চুড়ান্ত অমানবিকতায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন তারা ।
কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশের একই ভাষাভাষী রাজ্যের কিছু রাজনৈতিক দলের চিন্ময় প্রভুর মর্মস্পর্শী কান্না দেখার সময় নেই । তারা ব্যস্ত দুর্গাপূজায় মাংস খাওয়ার আলোচনায় । বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর ‘পাখণ্ডী’ মন্তব্যকে ইস্যু করে প্রকাশ্য রাস্তায় গেরুয়া বসনধারী ওই সন্তের ছবিতে জুতো-লাথি মেরে পুড়িয়ে কথিত প্রতিবাদ প্রদর্শন করছে কংগ্রেসের মহিলা ও পুরুষ সদস্যরা । সিপিএমের বিকাশ ভট্টাচার্য, শতরূপ ঘোষরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে বিষ উগরে দিচ্ছেন । পিছিয়ে নেই তৃণমূলও । তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হল যে,বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও বিধায়ক কৌস্তুভ বাগচিরা পর্যন্ত বিরোধীদের ‘পাল্লায় পড়ে’ ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর সমালোচনা করেছেন।
ঠিক কি বলেছিলেন ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী?
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এসে বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী দুর্গাপূজার প্যান্ডেলের পাশে আমিষ খাবার বিক্রি বন্ধ করার এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বয়কট করার আহ্বান জানান। হাওড়ার লিলুয়ায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন যে নবরাত্রির সময়ে প্রতিমা প্যান্ডেলের পাশে আমিষ বিক্রি বা তৈরি করা উচিত নয় এবং এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের তিনি ‘পাখণ্ডি’ বলে মন্তব্য করেন । তিনি বলেন,’এখানে নবরাত্রির সময়ে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের পিছনে আমিষ খাওয়া হয়। খারাপ খারাপ খাবার বানানো হয়। এটা আমার অপছন্দ। এই বারে নবরাত্রির সময়ে কলকাতার হিন্দুরা জেগে উঠে এই ধরনের লোকজনকে বহিষ্কার করুন!’ তিনি আরও বলেন,’পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কাছে প্রার্থনা, নবরাত্রিতে দেবীর প্রতিমা থাকুক বা না-থাকুক, কিন্তু প্রতিমার পাশে আমিষ বিক্রি চলবে না।’
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের আমিষ মন্তব্যের পর তাঁকে নিয়ে আলোচনার শেষ হচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গে । এই বিষয়ে কংগ্রেস-সিপিএম ও তৃণমূলের এক সূর । বাংলার অস্মিতা, হিন্দু সংস্কৃতিকে সামনে রেখে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে । বিশেষ করে একজন হিন্দিভাষী সন্ত বাংলা হিন্দু সংস্কৃতি সম্পর্কে কটাক্ষ করায় ফের কোনো না কোনো ভাবে ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ । এই বিষয়ে সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছে মমতা ব্যানার্জির বি-টিম বলে পরিচিত ‘বাংলাপক্ষ’-এর গর্গ চ্যাটার্জি । তিনিও ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন । তবে আশ্চর্যের বিষয় হল,ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী দুর্গাপূজার সময় মাংস খাওয়া নিয়ে মন্তব্য করলেও মুসলিমদের পরব নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি । তারপরেও সিপিএমের মহম্মদ সেলিম, বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সিপিএমের বহু ছোটবড় নেতা,এমনকি মুসলিম নেতৃত্ব বা সাধারণ নাগরিক প্রকাশ্যে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন ?
এখন প্রশ্ন যে, নিজেদের নাস্তিক বলা সিপিএম দুর্গাপূজার সময় মাংস খাওয়া নিয়ে কেন এত উতলা ? মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের কেন এত মাথাব্যথা ? অবশ্য সিপিএমকে মুসলিমদের পরবের সময় বিভিন্ন জায়গায় ইফতার পার্টির আয়োজন করতে দেখা গেলেও হিন্দু ধর্মের কোনো পূজোতেই অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি । তাহলে তারা কেন দুর্গাপূজার দিন মাংস খাওয়ার দাবির নাম করে একজন তরুন হিন্দু সন্ন্যাসীর কট্টর বিরোধিতায় নেমেছে ? মুসলিম ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট করতে নাকি হিন্দুদের একতায় ভাঙন ধরাতে এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্র চলছে ? এখন এই প্রশ্নও উঠছে৷
ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল ও দদক্ষিণপন্থী লেখক তথাগত রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘সবাই বাঙালি-বাঙালি করছেন, যেন তাবৎ বাঙালি কি খাবে কি খাবে না তাই নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। আসলে বিতর্ক তো বাঙালির মাত্র ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ বাঙালি-হিন্দুকে নিয়ে ! উত্তর ভারতের কোন এক ধর্মগুরুর কি অধিকার আছে বাঙালি-হিন্দু কি খাবে তা নিয়ে উপদেশ (নির্দেশ নয়) দেবার – এই নিয়ে বিতর্ক ! বাকি ৭০ শতাংশ বাঙালি – অর্থাৎ বাঙালি মুসলমান – কি খাবে তা নিয়ে কিন্তু কোন বিতর্ক নেই। কারণ সেই নির্দেশ (উপদেশ নয়) দিয়েছে উত্তর ভারত থেকে বহু দূরে ধু-ধু মরুপ্রান্তরের এক ধর্মগুরু। সেই নির্দেশ অনুযায়ী রমজান মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিজের থুতু গেলাও বারণ । সে ব্যাপারে সবাই উচ্ছ্বসিত – দ্যাখো, কি ধর্মপ্রাণ, কেমন কৃচ্ছ্রসাধন !এবারে বলুন তো, ভণ্ড কে?’
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বিরোধিতার আসল উদ্দেশ্য কি বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরানো ?
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি ১৩ লক্ষ, যার মধ্যে প্রধান ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার পরিসংখ্যান হল : হিন্দুধর্ম: ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ (৭০.৫৪%) এবং ইসলাম (মুসলিম): ২ কোটি ৪৬ লক্ষের বেশি (২৭.০১%)। বর্তমানে হিন্দু জনসংখ্যা ৭০ শতাংশের নিচে এবং মুসলিম জনসংখ্যা অন্তত ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে প্রায়ই দাবি করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । ২০২৬ এর জনগননার কাজ চলছে । আগামী বছর ফেব্রুয়ারী নাগাদ রিপোর্ট সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে ।
মুসলিম দ্বিতীয় জনগোষ্ঠী হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এতদিন একটা সাধারণ প্রবনতা লক্ষ্য করা যেত । সেটা হল মুসলিম তোষণ ! বৃহত্তর হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোটব্যাঙ্ক ছিল দ্বিধাবিভক্ত । তাই মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক যেদিকে ঝুঁকত, তাদের জয় এক প্রকার নিশ্চিত । ভোট কাটাকাটির এই সমীকরণকে সিপিএম তার শাসনকালের ৩৪ বছর এবং তৃণমূল ১৫ বছর সুনিপুণ ভাবে ব্যবহার করে এসেছে । কিন্তু ২০২৬ সালে প্রথম তাদের ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দিয়েছে বিজেপি ।
বিজেপির মধ্যে বিশেষ করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে নীতি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হয় । কারন গেরুয়া শিবিরের একাংশের নেতৃত্ব যখন তৃণমূল আমলে সীমাহীন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে নির্বাচনের প্রচারে ইস্যু করতে চেয়েছিলেন, তখন একমাত্র শুভেন্দুর প্রচার ছিল মুসলিম অনুপ্রবেশ-জনবিন্যাসের পরিবর্তন ও বাংলাদেশের হিন্দু নরসংহারকে কেন্দ্র করে । যার ফল হাতেনাতে পেয়েছে বিজেপি ।
রাজ্যে হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশের সংহতি ও মেরুকরণ দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতে হিন্দু ভোটারদের এই ঘনত্ব ও সমর্থন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) লাভবান হয় । উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তৃণমূল । সামগ্রিক রাজ্য রাজনীতিতে হিন্দু ভোট ব্যাংক বিজেপির পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
অন্যদিকে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায় মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে । মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে (যেমন মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর বা অন্যান্য সংখ্যালঘু জেলা) মুসলিম ভোটের স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ঐতিহ্যগত মুসলিম ভোট ব্যাংকে ভাগ বসায় অন্যান্য দল যেমন কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টও কিছু ভোট পায়। এই সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন শেষ পর্যন্ত শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু আসনেও বিরোধী দলের জয়ের পথ প্রশস্ত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগুরু হিন্দু ভোটারদের সমর্থন একত্রীকরণ এবং সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটের বিভক্তির যৌথ ফলাফল হিসেবে বিজেপি রাজ্যজুড়ে ভালো ফল করে। নির্বাচনে সার্বিক ভোট শেয়ারে বিজেপি প্রায় ৪৫.৮ শতাংশ এবং তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ৪০.৮ শতাংশ ভোট পায়। এখন এই নতুন প্রবনতাই তৃণমূল কংগ্রেস,সিপিএম ও কংগ্রেসের মাথাব্যথার কারন হয়ে গেছে । যেকারণে তারা বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে । আর এরই মাঝে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য, কৌস্তুভ বাগচি,দিলীপ ঘোষের মত বিজেপির একাংশের নেতারা বিরোধীদের তালে তাল মিলিয়ে মন্তব্য করতে যান,তাতে তাদের আখেরে ক্ষতিই হবে বলে মনে করা হচ্ছে ।
অন্যদিকে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য না করেও গতকাল কৌশিকি অমাবস্যার দিন কালীঘাটের মন্দিরে গিয়ে সুকৌশলে সব বিতর্কে জল ঢেলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । তিনি প্রথমে দেবীকে ভক্তিভরে পূজো দেন । তারপরে মন্দির চত্বরে বসে দেবীর আমিষ ভোগ গ্রহণ করেন।।

