এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০৩ আগস্ট : ইসলামি রাষ্ট্র মরক্কো থেকে অনুপ্রবেশকারীদের একটা ঢল সমুদ্র পেরিয়ে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান সংলগ্ন সিউটায় ঢুকে পড়েছে । সেদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬৫-৭০ হাজার অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বর্তমানে সিউটায় অবস্থান করছে । কিন্তু এই বিশাল অবৈধ অভিবাসীদের ঢল নামার জন্য পেদ্রো সানচেসের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী স্প্যানিশ সরকার ইসরায়েলের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিয়েছে । এদিকে অনুপ্রবেশকারীরা সিউটায় ঢুকে দেদার লুটপাট ও ভাঙচুর শুরু করেছে । পালটা প্রতিরোধ করায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে বেধে গেছে সিউটায় । সেই সংঘর্ষে সরকারি ভাবে এখনো পর্যন্ত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে । যদিও হতাহতের সংখ্যা এর কয়েক গুণ বলে দাবি স্থানীয় স্প্যানিশ নাগরিকদের ।
বর্তমানে স্পেনের শাসনক্ষমতায় বামপন্থী দলগুলো রয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেসের নেতৃত্বে সোশ্যালিস্ট পার্টি (PSOE) ও উগ্র বামপন্থী সুমার জোট (Sumar) সরকার পরিচালনা করছে। অনান্য ইউরোপীয় দেশগুলির মতই স্পেনের বামপন্থীরাও উদার অভিবাসনের পক্ষে । তবে মরক্কো থেকে সিউটায় মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ঢল নামায় গনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে স্পেনের বামপন্থী সরকারকে ।
মরক্কোর সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউটা—ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমান্ত। সাম্প্রতিক ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে, ছোট নৌকায় বা সীমান্তের বাধা পেরিয়ে সিউটায় প্রবেশ করে । মরক্কোর সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অনুপ্রবেশে মদত দেয় বলে অভিযোগ । যদিও স্পেন জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। বেশির ভাগ অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছে । মারা গেছেন অর্ধশতাধিক।
এদিকে হঠাৎ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সীমান্ত পার হওয়ার কারণ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। স্পেন সরকারের দাবি, মানবপাচারকারী চক্র আদালতের একটি রায়কে ভুলভাবে প্রচার করে অভিবাসীদের সীমান্তে জড়ো হতে উৎসাহিত করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, পশ্চিম সাহারা ইস্যু ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে স্পেনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এ ঘটনার মধ্যেই এবার ইসরায়েলের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিস্তার পেতে চাইছে বামপন্থী স্প্যানিশ সরকার । জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যাননের স্পেনবিরোধী মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে দেশটির পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে লেখেন, এখন বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার।এরপরই স্পেনের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষক দাবি করেন, গাজা যুদ্ধ ও ইরান ইস্যুতে স্পেনের অবস্থানের কারণে দেশটিকে চাপে ফেলতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে এই সংকটকে কাজে লাগাতে পারে।
এদিকে, সম্প্রতি মরক্কোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে মরক্কো।বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে অভিবাসীদের সীমান্ত পার হওয়া মরক্কোর সহযোগিতা ছাড়া কঠিন। যদিও মরক্কো সরকার এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যদিও মরক্কো ইসরায়েলের হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে ধারাবাহিক কিছু কাকতালীয় ঘটনা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাফোড়েন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে দাবি বামপন্থী স্প্যানিশ সরকারের ।
এদিকে অনুপ্রবেশকারীর ঢল নামায় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে । স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েন্সার ক্লদিয়া রদ্রিগেজ সেইসব ইনফ্লুয়েন্সারদের তীব্র সমালোচনা করেছেন যারা অবৈধ অভিবাসীদের দ্বারা সেউতা (Ceuta) দখলের চেষ্টার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন । তিনি একটি ভিডিও বার্তায় বলেছেন,”আমার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক মনে হতো যদি আমার একটি প্ল্যাটফর্ম থাকার পরেও আমি একটি শব্দ—এমনকি অর্ধেক শব্দও—উচ্চারণ করতে না পারতাম; আর তা কেবল এই ভয়ে যে মানুষ আমাকে ‘আনফলো’ করতে পারে বা আমি হয়তো কাজ হারাতে পারি।’
তিনি বলেছেন,’দেশ যখন ধ্বংসের মুখে, তখন ওইসব ফলোয়ার দিয়ে কী লাভ? এর মানেই বা কী? মানুষ কী বলবে সেই ভয়ে ভীত হয়ে, কোনো কিছুই ঘটছে না—এমন ভান করে নিজের স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়া এবং এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির মুখে নীরব থাকা—আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া বা টিকটক ভিডিও বানানোর প্রসঙ্গ এলে তো তাদের খুব তৎপর দেখা যায়। কিন্তু সংকটময় মুহূর্তে স্পেনের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্ন এলে? তখন তাদের আর খুঁজেও পাওয়া যায় না।’।

