প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২১ আগস্ট : বৃহস্পতিবার রাতে পূর্ব বর্ধমানের একাধিক সরকারি হাসপাতালে সারপ্রাইজ ভিজিট করলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় । কলকাতা থেকে শতাধিক কিলোমিটার পথ গাড়িতে চড়ে রাতে তিনি হঠাৎই ঢুকে পড়েন বর্ধমানের বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানে পরিদর্শন শেষে পৌঁছে যান বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল । এই দুই হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সহ নানা দিক তিনি খতিয়ে দেখেন। চিকিৎসক ও নার্স সঙ্গে কথা বলার পর রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করলেও পরিচ্ছন্নতা ও রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৃহস্পতিবার এদিন রাত প্রায় ৯ টা নাগাদ বর্ধমান-২ ব্লকের বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাজির হন স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডাক্তার শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। আচমকা মন্ত্রীর আগমনে হাসপাতাল চত্বরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।বড়শুল হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসা পরিষেবা থেকে শুরু করে রোগীদের বিভিন্ন সমস্যা খতিয়ে দেখেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী। চিকিৎসক, নার্স-সহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি মেডিসিন বিভাগে গিয়ে তিনি রোগীদের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেন এবং চিকিৎসা ও পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয়ে খোঁজ নেন।এখানে হাসপাতালের পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার হাল দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি স্বাস্থ্য মন্ত্রী । তিনি সাফাইকর্মীকে ডেকে নিয়মিত এবং আরও মন দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করার নির্দেশ দিয়ে যান।
বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাত ১০টা নাগাদ আচমকা বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে পৌঁছে যান। রাতের আচমকা পরিদর্শনে জরুরি বিভাগ-সহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড তিনি ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এখানেও তিনি কথা বলেন রোগী ও তাঁদের পরিজনদের সঙ্গে। চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে তাঁদের কোনও অভিযোগ রয়েছে কি না, তা তিনি জানতে চান । পাশাপাশি জুনিয়র ডাক্তার, নার্সিং স্টাফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলে তিনি পরিকাঠামো এবং তাঁদের সমস্যা,প্রয়োজন ও অসুবিধার কথা শোনেন। পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে রোগীদের কাছ থেকে নেতিবাচক কোনও অভিযোগ তিনি পাননি। বরং অধিকাংশ রোগীই পরিষেবা নিয়ে সন্তুষ্ট বলে দাবি তাঁর। তবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন তা তিনি জানিয়ে দেন।
বিশেষ করে জরুরি বিভাগে অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মহিলা চিকিৎসকদের রেস্ট রুমের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হাসপাতালের ইন-হাউস সিকিউরিটি ব্যবস্থার মান নিয়েও অসন্তোষ জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, গোটা জেলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের পক্ষে সবসময় হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই হাসপাতালের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
নার্সিং স্টাফের ঘাটতির কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে আরও বেশি নার্সিং পরিষেবার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের কাজের পরিবেশ নিয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তাঁদের বসার জায়গা, লেখালেখির প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং বিশ্রামের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন ।স্বাস্থ্যমন্ত্রী এও বলেন, চিকিৎসক ও নার্সরা ভালোভাবে কাজ করতে না পারলে রোগীদের পরিষেবা ব্যাহত হবে। তাই তাঁদের ‘অভাবের পাশাপাশি আবদারও’ শুনতে হবে বলে জানান তিনি।
পরিদর্শন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশেও বিশেষ বার্তা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগে থেকে না জানিয়েই বিভিন্ন হাসপাতালে আচমকা পরিদর্শনে যাবেন তিনি। তবে হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশ না করার অনুরোধ জানান। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিকতা নিয়ম মেনে এবং হাসপাতালের পরিষেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর রেখেই করা উচিত।
বর্ধমান মেডিকেল কলেজের সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়েও মুখ খোলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কয়েকজন ছাত্রের নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট একজনকে আপাতত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও পুরো তদন্ত এখনও শেষ হয়নি বলে জানান তিনি।’থ্রেট কালচার’ প্রসঙ্গেও সরব হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগের পরিস্থিতিতে ভয় কাজ করলেও এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, “ভয় আউট, ভরসা ইন।” অভীক দে-কে ঘিরে চলা বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, অনাময় হাসপাতালকে গ্রামীণ হাসপাতাল হিসেবে দেখিয়ে স্নাতকোত্তরে সুযোগ পাওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলছে। হাজিরা খাতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান তিনি।
অভীক দে-র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও চলছে। তদন্ত শেষ হলে নির্দিষ্ট সময়ে রিপোর্ট সামনে আসবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, যোগ্য পড়ুয়াদের বঞ্চিত করে কোনও অনিয়মের মাধ্যমে স্নাতকোত্তরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তৃণমূলের এক ব্লক সভাপতির ভাই পাকিস্তানের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কোনও ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের উপর চাপানো উচিত নয়। তাঁর দাবি, দেশের প্রতি অনুগত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষই দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন।একই সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়ে যান ,রাজ্যের সরকারী হাসপাতালের পরিষেবা খতিয়ে দেখতে তাঁর এই আকস্মিক পরিদর্শন জারি থাকবে।।
