প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২৭ আগস্ট : তৃণমূল রাজত্বের অবসান ঘটাতে স্বয়ং “ভগবানও” কি ২০২৬ বিধানসভা ভোটে বঙ্গ বিজেপির প্রার্থী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিলেন ? এমন প্রশ্ন যে কোন কাউকেই হতবাক করতে পারে। কিন্ত পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদারের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এমনকি তাঁর সেই মন্তব্য বঙ্গ রাজনীতিতেও তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সাফল্য নিয়ে বুধবার জামালপুরের ধুলুক গ্রামে বিজেপির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় বক্তব্য রাখার সময় বিধায়ক অরুন হালদার ২০২৬ বিধানসভা ভোটে তাঁর জয়ের নেপথ্য কাহিনী তুলে ধরেন। তিনি বলেন,’পশ্চিমবঙ্গের আসনে বিজেপি জিতলেও, জামালপুরে বিজেপি জিতবে কি না তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আমি বলতাম, এক ভোটে হলেও আমি জিতব। কারণ, স্বয়ং “ভগবান” আমাকে এখানে(জামালপুরে) পাঠিয়েছে । এঁদের (জামালপুরবাসীকে)উদ্ধার করার জন্যে।পৃথিবীর কোনও শক্তি, দানবীয় শক্তি আমাকে হারাতে পারবে না।” সভায় রাখা এই বক্তব্যের ভিডিও অরুণ হালদার তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য এবং কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতা সুনীল বানসালকে ট্যাগ করে পোস্টও করেছেন।
এদিকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সাফল্য-সভায় এমন বক্তব্য পেশ করে দলের অন্তরেই সমালোচনায় মুখে পড়েছেন অরুণ হালদার। বিরোধীরাও বিজেপি বিধায়কের এহেন মন্তব্য নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি । তারা অরুণ হালদারকে ‘অপরিপক্ক’ রাজনীতিক বলেও অভিহিত করেছেন। যদিও বিধায়কের দাবি, “আমার দলের লোকেরাও ২০২৬ বিধানসভা ভোটে জামালপুরে জয় নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। বালি মাফিয়া সহ দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে আমার লড়াই ছিল। স্বয়ং ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া জামালপুরে আমার জয় আসত না। সেই অনুভূতির কথাই আমি বলেছি ।”
অন্নপূর্ণা ভান্ডার নিয়ে আয়োজিত সভার মঞ্চে বিধায়ক অরুন হালদারের সাথেই উপস্থিত ছিলেন জামালপুর ১ মন্ডলের বিজেপি সভাপতি প্রধান চন্দ্র পাল।তাঁর বক্তব্য,’বিধায়ক অরুণ হালদারের বক্তব্যের মধ্যে তিনি কোন ভুল বা অপরিপক্কতার কিছু দেখছেন না। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রধানচন্দ্র পাল বলেন, ‘আমাদের কাছে এবং বিজেপি পরিবারের সবার কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হলেন ভগবান। প্রধানমন্ত্রীর কথাতেই আমাদের দল অরুন হালদারকে জামালপুর বিধানসভা আসনে ভোটে লড়ার জন্য প্রার্থী করে।’ বিধায়ক সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীকেই ভগবান বলে উল্লেখ করেছেন বলে প্রধানচন্দ্র পাল দাবি করেছেন।
তবে প্রধানচন্দ্র পাল যাই দাবি করুন না কেন, একই মণ্ডলের দলের সহ-সভাপতি সুশান্ত মণ্ডল সেই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সুশান্ত মন্ডল বলেন, ‘ভোট রাজনীতিতে ভগবানকে টেনে এনে অরুন হালদার এখন সবার কাছে হাসির খোরাক বনে গিয়েছেন।’ তিনি মুখে ধর্মের কথা বললেও বাস্তবে অধর্মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সুশান্ত মন্ডল মন্তব্য করেছেন । আর বিজেপির মহিলা মোর্চার জামালপুর ১ মন্ডলের সভানেত্রী নেত্রী দেবিকা দেবনাথ কটাক্ষ করে বলেন,’ভগবানের দূত এখন জামালপুরবাসীর কাছে ‘যমদূত’ বনে গিয়েছেন । সরকারি ঘর দেওয়ার নাম করে, চাকরি দেওয়ার নাম করে যাঁরা টাকা তুলছে তারাই এখন তাঁর অনুগত পূজারী হয়েছেন ।’
অরুন হালদারের বক্তব্য নিয়ে বামেরাও তীব্র কটাক্ষ করেছে। জামালপুরে প্রাক্তন বাম বিধায়ক সমর হাজরা বলেন,’বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার যদি ভগবানের দূতই হবেন তাহলে এখনো কেন জামালপুরের গরীব মানুষরা ঘর পাচ্ছেন না ? উন্নয়ন কাজ কেন থমকে আছে?’ অন্যদিকে ২০২৬ বিধানসভা ভোটে জামালপুর বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া তৃণমূল প্রার্থী ভূতনাথ মালিক বলেন,’ভোটের প্রার্থী নির্বাচনে স্বয়ং ভগবান এখন হস্তক্ষেপ করছেন তা জানতাম না’। একইভাবে জামালপুরের কংগ্রেস নেতা বুদ্ধদেব ঘোষের কটাক্ষ,’জামালপুরের চারদিকে হয়ে চলা এত অন্যায় ভগবানের দূত দেখতে পাচ্ছেন না ,এটাই সবথেকে বড় আশ্চর্যের।’
