শ্যামসুন্দর ঘোষ,মন্তেশ্বর(পূর্ব বর্ধমান),০১ অক্টোবর : রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর গোহত্যা বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে । একদিকে নির্বিচারে গোহত্যা বন্ধে যেমন পুলিশের নজরদারি চলছে,পাশাপাশি বিক্রির জন্য গরু-মোষ নিয়ে যেতে দেখলে রাস্তায় গনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে পশু পাইকেরদের । খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সতর্ক করে বলে দিয়েছেন,’রাজ্যের প্রতিটি পশুহাটের উপর কড়া নজর থাকবে ৷’ গোপালন নাকি মাংসের জন্য গরু মোষ বেচাকেনা হচ্ছে তার ওপর কড়া নজর রাখা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ।
যার ফলে এখন রাজ্যের পশুহাটগুলো চলছে মূলত ভেড়া -ছাগল ও হাঁস-মুরগির ভরসায় । এমনই দৃশ্য দেখা গেলো পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী থানার জামালপুর পশুহাটে। হাটমালিক ঘোতন দাস বলেন, ‘রাস্তায় গরু-মোষ নিয়ে যেতে দেখলেই পুলিশ আর সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে পশু পাইকেরদের । ফলে ভয়ে কেউ আর গরু-মোষ হাটে আনছেন না । হাটে ভেড়া-ছাগল ও হাঁস-মুরগি কেনাবেচা হচ্ছে । সরকার যদি কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে আমার হাটে আর গরু কেনাবেচা হবে না।’
পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর পশুহাটটি সপ্তাহে একদিন রবিবার বসে । এতদিন যাবৎ এই হাটে পশুর রমরমা কারবার ছিল । মূলত গরু-মোষ-এ ভর্তি থাকত এই হাট । কিন্তু এই হাটে আর দেখা মিলছে না গরু বা মোষের। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বড় গরু-মোষ কেনাবেচা বন্ধ থাকায় হাটের মাঠে গজিয়ে উঠেছে ঘাস। বর্তমানে ভেড়া, ছাগল এবং হাঁস-মুরগির কেনাবেচাতেই সীমাবদ্ধ হাটের কার্যক্রম ।
পূর্বস্থলী থানার বারুইপাড়ার বাসিন্দা পশু পাইকের করিম শেখ বলেন,’নিরাপত্তার ভয়ে গরু আনছি না । মাঝ রাস্তায় যদি চোট হয়ে যায় তাহলে সেই টাকা কবে দেবে আমায় ? কারুর গোয়াল থেকে যদি গরু নিয়ে আসি তাহলে বলছেন লিখিত করে আনতে হবে। কয়েকদিন আগে বর্ধমানে শুভেন্দুর মিটিং হল, সেখানে বলে দিল যে সব হবে কিন্তু গরু বিক্রি হবে না । তাহলে কি করে করব?’ তার কথায়,’গরু তো গোয়ালে প্রচুর হয়ে গেছে। চাষিরা নেওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করছে৷ কিন্তু আমরা নিতে পারছি না। কিন্তু গরু নিয়ে রাস্তায় বেরোলেই মাথা খারাপ করে দিচ্ছে । আমি বলে দিয়েছি গরু নেব না ।’
আর এক গরুর পাইকের কাটোয়ার ঘুমুরিয়ার সাহিল সেখ বলেন,’গরু বিক্রির ওপর সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। রাস্তাঘাটে পুলিশ প্রচুর ঝামেলা করছে । পোনানো জায়গায় হাট খুলেছে। পাত্রসায়রে চলছে গরু কেনাবেচা। কিন্তু আমাদের জামালপুরে বলছে হবে না। এই ভয়ে আমরা আর গরু নিইনা । ছাগল ভেড়া টুকটাক কেনাবেচা করছি ৷’
প্রসঙ্গত,পশ্চিমবঙ্গে গরু, মহিষ ও অন্যান্য গবাদি পশু কেনাবেচা, জবাই এবং মাংস কাটার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০ (West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950) কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। সরকারিভাবে অনুমোদিত ও রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো গরু, ষাঁড়, বলদ বা মহিষ জবাই করা যাবে না। সার্টিফিকেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে পশুটি জবাইয়ের উপযুক্ত (Fit for slaughter)—যেমন পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি, কাজের বা বংশবৃদ্ধির অযোগ্য অথবা স্থায়ীভাবে অসুস্থ/অক্ষম।
এছাড়া,কোনো উন্মুক্ত বা জনসমক্ষে খোলা স্থানে গবাদি পশু জবাই করা বা মাংস কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।শুধুমাত্র নির্ধারিত এবং অনুমোদিত পৌর তথা মিউনিসিপ্যালFacility বা নির্দিষ্ট খাঁচাবন্দি জায়গায় নিয়ম মেনে জবাই করা যাবে।
বেআইনি পশুর হাট, অবৈধ কসাইখানা এবং অননুমোদিত গবাদি পশু কেনাবেচার ওপর রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন কঠোর নজরদারি ও জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বৈধ কাগজপত্র ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত পশুর ব্যবসা ছাড়া বেআইনিভাবে গবাদি পশু পাচার বা অবৈধ বাজার বসানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।এই আইন অমান্য করলে বা বিনা অনুমতিতে ও শংসাপত্র ছাড়াই পশু জবাই করলে বা বেআইনিভাবে ব্যবসা চালালে সর্বোচ্চ ৬ মাসের জেল, ১,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ফলে এতদিন নির্বিচারে চলা পশুহত্যার উপর লাগাম টেনে ধরায় বিপাকে পড়ে গেছে পশুকারবারিরা ।
পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের তরফে সরকারি নিয়ম মেনে গরু বিক্রিতে আপত্তি না থাকার কথা জানানো হলেও, বাস্তবে গরু নিয়ে জামালপুরেরবহাটে আসতে এখনও ভয় পাচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতাদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, বাড়ি থেকে গরু কিনে হাটে নিয়ে যাওয়ার পথে ক্ষোভ- বিক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে।
ক্রেতাদের বক্তব্য, গৃহস্থরা গরু বিক্রি করতে আগ্রহী হলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাঁরা কিনে হাটে আনতে সাহস করছেন না। হাট মালিকদেরও দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না মিললে পরিস্থিতি বদলানো কঠিন।এদিকে খড় ও গবাদি পশুর খাবারের দাম বাড়ায় সমস্যায় পড়েছেন গৃহস্থরা। বাড়ির গরু বিক্রি করতে না পারায় বাড়ছে চাপ। যদিও সম্প্রতি বর্ধমান সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলে গেছেন যে,গবাদি পশু প্রতিপালকদের জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।।

