প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় বর্ধামান ১৫ আগস্ট : খাতায় কলমে ১৯৪৭ সালের ১৫ ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে । আজ ৮০-তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়ে গেলো দেশ জুড়ে ৷ কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল যে, দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করতে অনেক বীর সন্তানের বীরত্বের কাহিনী আজও দেশবাসীর কাছে অজানা রয়ে গেছে, মূলত যাঁদের আত্মবলিদান,ত্যাগ ও লড়াই আন্দেলনের ফলেই মিলেছে এই স্বাধীনতা। এমনই এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার দশরথি তা । পরাধীন ভারতে দাশরথি তা-র নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল এক লড়াই । পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর ও রায়না থানার ব্রিটিশদের দখল মুক্ত করা হয়েছিল । দশরথি তা ও তাঁর বিপ্লবী সাথিরা জামালপুর থানায় আগুন ধরিয়ে দেন । প্রাণ ভয়ে পালাতে হয়েছিল ইংরেজ সিপাইদের । দাশরথি তা-র নেতৃত্বে হওয়া সে দিনের সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কথা আজও জামালপুরের অনেক প্রবীণদের স্মৃতির মণিকোঠায় বন্দি রয়েছে । কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল যে, এই অসমসাহসী বীরত্বের কাহিনী উপেক্ষিত থেকে গেছে ইতিহাসের পাতায়৷
দশরথি তা ১৩১৮ বঙ্গাব্দের (১৯১১ খ্রীষ্টাব্দ) ২৩ কার্তিক অবিভক্ত বর্ধমান জেলার রায়না থানার ধামাস গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।ভারতের পরাধীনতা ব্যাথিত করতো কৃষক পরিবারের সুশিক্ষিত সন্তান দশরথি তা কে।১৯৩০ সালে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে তিনি গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশ নেন ।পরবর্তী সময়ে ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি ইংরেজ সিপাহি পরিচালিত রায়না ও জামালপুর থানা দখল এবং জামালপুর থানায় আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন।
পাশাপাশি তিনি ব্রিটিশদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করার জন্য বি.ডি.আর(বাঁকুড়া- দামোদর রেলওয়ে) রেললাইন উপড়ে ফেলে দেন।দাশরথি তা কে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরার জন্য ১০ হাজার টাকা আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো তদানীন্তন ইংরেজ সরকার । মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের আদলে বর্ধমানেও সমান্তরাল সরকার গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।দেশের স্বাধীনতার জন্য এহেন লড়াই আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণও করেছিলেন ।
জামালপুরের বত্রিশ বিঘা গ্রামে বসবাস করেন ১০৪ বয়সী প্রবীণ শেখ ইব্রাহিম। তিনি পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসন কাল দেখেছেন।তারই সাথে তিনি দেখেছেন ভারতকে স্বাধীনতার জন্য মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী সহ বাাংলার বহু বিপ্লবীর সংগ্রাম ।তিনি বলেন,ইংরেজদের ভারত ছাড়া করতে১৯৪২ সালে গান্ধীজী “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে“ স্লোগান তোলেন। এর দুই-এক বছরের মধ্যে জামালপুর থানা পোড়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামী দশরথি তা এর নেতৃত্বে সেই সময় জামালপুর থানা পোড়ানো হয়েছিল ।’ এই ঘটনায় কয়েক বছর বাদে ভারত স্বাধীন হয় বলে শেখ ইব্রাহিম জানিয়েছেন।
স্বাধীনতা আন্দোলন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য দাশরথি তা ১৯৩৬ সালে বর্ধমান জেলায় প্রথম ’দামোদর’ নামে বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ বিরোধী লেখাও এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত।দশরথি তা আত্মগোপন করে থাকাকালে তাঁর স্ত্রী তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী রমা তা একা পত্রিকাটি চালাতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পত্রিকাটি দৈনিক পত্রিকার রুপ নেয়।স্বাধীন ভারতে ১৯৫১ সালে কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টির টিকিটে এবং ১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে প্রজা সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে দশরথি তা রায়না বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পিডিএফ মন্ত্রিসভায় কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন। দামোদর বন্যা প্রতিরোধ ও ক্যানাল আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।১৩৮৭ বঙ্গাব্দের(১৯৮০ খ্রীষ্টাব্দ)১৪ বৈশাখ দাশরথি তা প্রয়াত হন।।
