ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের গতি বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জে.ডি. ভ্যান্স শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলেছেন। একটি সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টেলিফোনে আলাপকালে দুই নেতা ‘ভারত-মার্কিন সমন্বিত বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন’ এবং ‘উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার অব্যাহত গতিশীলতার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন’।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মোদি ও ভ্যান্স পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি নিয়েও মতবিনিময় করেছেন।
প্রসঙ্গত,মোদি-ভ্যান্স ফোনালাপের ঠিক কয়েক ঘন্টা আগেই রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট, ২০২৬) মার্কিন সিনেট একটি বিল অনুমোদন করেছে, যা আইনে পরিণত হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস ক্রয়কারী কিছু দেশের আমদানির ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিতে পারে। এই প্রস্তাবের দ্বারা ভারত ও চীন সরাসরি প্রভাবিত হবে। সিনেটে বিলটির পক্ষে ৮৬টি এবং বিপক্ষে ১১টি ভোট পড়েছে । তবে, এটিকে আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে।
কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাঝেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জে.ডি. ভ্যান্সের ফোন করার ঘটনাকে “ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প” বলে মনে করছেন অনেকে । আসলে,প্রধানমন্ত্রী মোদীকে জেডি ভ্যান্সের আকস্মিক ফোন কোনো গতানুগতিক কূটনীতি নয়। এটি একটি সংকেত । কারন একই সময়ে তিনটি ঘটনা ঘটছে :
প্রথমতঃ, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান একটি আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সমঝোতার দিকে এগিয়েছে। এটি পশ্চিম এশিয়ায় একটি নতুন সামরিক জ্যামিতি তৈরি করেছে যা যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত প্রভাবকে দুর্বল করে এবং পাকিস্তানকে চীনের বাইরে একটি বাহ্যিক নিরাপত্তা বলয় প্রদান করে।
দ্বিতীয়তঃ,ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের জন্য শি জিনপিং এবং ভ্লাদিমির পুতিন উভয়েরই নয়াদিল্লিতে থাকার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালের পর শি-এর এই প্রথম সফর কোনো পর্যটন নয়। এটি একটি কৌশলগত সংকেত যে, উদীয়মান বহুকেন্দ্রিক কাঠামোতে ভারতই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এবং তৃতীয়তঃ,মার্কিন শুল্ক আরোপের হুমকি এবং অর্থনৈতিক জবরদস্তির মাধ্যমে সমান্তরাল চাপ অব্যাহত রয়েছে। যখন সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব দুর্বল হতে শুরু করে, তখন এগুলোই প্রভাব বিস্তারের চিরাচরিত কৌশল।
ওয়াশিংটন তার কৌশল পুনর্বিন্যাস করছে বলে মনে হচ্ছে। ভয়টা শুধু ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল বিষয় হলো এমন একটি উদীয়মান শক্তির সাথে অগ্রাধিকারমূলক কৌশলগত জোট হারানো, যে শক্তিটি একই সাথে মস্কো ও বেইজিং উভয়ের সাথেই সম্পর্ক গভীর করছে এবং কোনো একক শিবিরে কনিষ্ঠ অংশীদার হতেও রাজি নয়।
আসল প্রশ্নটি এটা নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ‘গ্লোবাল সাউথ’-কে ‘হারিয়ে ফেলছে’ কি না। বরং প্রশ্নটি হলো, একটি সত্যিকারের বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখার মতো উপায় ওয়াশিংটনের কাছে এখনও আছে কি না। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখন আর কোনো স্লোগান নয়। এটি বাস্তব সময়ে পরীক্ষিত হচ্ছে।।
