এইদিন স্পোর্টস নিউজ,০৭ আগস্ট : এক স্কটিশ নারীকে হত্যার অভিযোগে আফগানিস্তানের ২৬ বছর বয়সী পেশাদার বক্সার শরীফ আহমাদজাইকে গ্রিসের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে ৩৮ বছর বয়সী এলিজাবেথ জেন রসকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আহমাদজাইয়ের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি এবং অস্ত্র রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট আফগানিস্তানের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী শরিফ আহমাদজাইকে এথেন্সের আদালতে হাজির করানো হয় । আদালতের এক বিশেষ শুনানিতে জানানো হয় যে, তার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে নরহত্যা, ডাকাতি এবং অস্ত্র আইনে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। শরিফ আহমাদজাই কোনো মন্তব্য করেননি এবং মামলাটি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। স্কটিশ আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে নরহত্যা করা খুনের অভিযোগের সমতুল্য।
শুনানির জন্য আহমাদজাইকে কালো কাঁচযুক্ত একটি ধূসর হুন্ডাই আই-৩০ গাড়িতে করে আদালতে আনা হয়েছিল।এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর মুখ ঢাকা পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে আদালত থেকে নিয়ে যান। ভবন থেকে গাড়ির দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় আহমাদজাই মাথা নিচু করে রেখেছিল ।
পুলিশ জানিয়েছে, এলিজাবেথ জেন রসকে এডিনবার্গের বাসিন্দা এবং পরিবার ও বন্ধুদের কাছে লিসা নামে পরিচিত – এথেন্স-ভিত্তিক একটি শরণার্থী সহায়তা গোষ্ঠীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ২৬ জুন গ্রিসে আসেন এবং ১০ জুলাই পর্যন্ত পিরিয়াসের কেরাতসিনি এলাকায় ছিলেন। ১৮ জুলাই এথেন্সের কিপসেলি জেলা থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তকারীর প্রাথমিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায়নি, তবে আরও বিস্তারিত পরীক্ষায় এই সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে যে এটি একটি “সুস্পষ্ট অপরাধমূলক কাজ, সম্ভবত শ্বাসরোধজনিত মৃত্যু”।
অন্যদিকে ১৫ বছর বয়সে অনাথ হওয়ার পর আফগানিস্তান ছেড়ে আসা আহমদজাই তার আমেরিকান স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রিসে বসবাস করেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (IFRC) কর্তৃক প্রকাশিত তার কাহিনী নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও অনুসারে, নিজ দেশ ছাড়ার পর তিনি ইরান ও তুরস্ক হয়ে গ্রিসে যান। এরপর তিনি লেসবস দ্বীপের একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন, যেখানে তার স্ত্রীর সাথে পরিচয় হয় এবং তিনি খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হন।
এরপর এই দম্পতি অন্যান্য শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্য ‘লাভ এভরি নেশন এথেন্স’ নামক একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। চলতি বছরের শুরুতে তিনি একটি গ্রিক সুপার লাইটওয়েট বক্সিং খেতাব জেতেন।
দক্ষিণ-পূর্ব অ্যাটিকার পুলিশ অফিসার ইউনিয়নের সভাপতি জর্জ কালিয়াকমানিস বলেছেন, দাতব্য কাজের সূত্রেই রস এবং আহমদজাইয়ের পরিচয় হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, রস যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকছিলেন, সেটির চাবি আহমাদজাইয়ের কাছে ছিল কি না, তা তারা তদন্ত করে দেখছেন।
ইউনিয়নটি জানিয়েছে, তারা এমন একটি ফুটেজ যাচাই করেছে যেখানে আহমাদজাইকে একটি স্যুটকেস বহন করতে দেখা যাচ্ছে, যেটিতে মৃতদেহটি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।তারা আরও জানায় যে, আহমাদজাইয়ের স্ত্রীর ব্যবহৃত একটি লোকেশন শেয়ারিং অ্যাপ থেকে দেখা গেছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি রেথিম্নু স্ট্রিটের সেই বাড়িতে ছিলেন, যেখানে রসের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কালিয়াকমানিস বলেন, আহমাদজাই মৃতদেহ সরানোর কথা স্বীকার করলেও হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে তিনি রসকে বাথরুমে মৃত অবস্থায় পেয়েছিলেন।ওই কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ বিশ্বাস করে যে সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি ভুক্তভোগীর ব্যাংক কার্ড ও ফোন নিয়েছিল এবং তার পরিবার ও বন্ধুদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিল যাতে মনে হয় সে তখনও জীবিত আছে।
তিনি বলেন, পুলিশ আরও বিশ্বাস করে যে সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি ভুক্তভোগীর ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে মোট প্রায় ১০,০০০ ইউরো তুলেছিল।
কালিয়াকমানিস আরও যোগ করেন যে, এই কথিত অপরাধে আহমাদজাইয়ের স্ত্রীর কোনো সম্পৃক্ততা বা পূর্বজ্ঞান ছিল না।
স্থানীয় দোকানদার অ্যানি ন্টিন্টা বিবিসি নিউজকে বলেছেন, এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে । তিনি বলেন: “পুরো পাড়া চরম আতঙ্কের মধ্যে আছে। এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও। আমার নিজের ১০ বছর বয়সী মেয়েও ভয়ে কাঁপছে।”
কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, এলিজাবেথকে হয়তো তার খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদনগুলোতে মে মাসের একটি ফেসবুক পোস্টের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে আহমাদজাই লিখেছিলেন, “দানশীলতার নামে দুর্নীতির জন্য লজ্জা। যারা খ্রিস্টের নামে ব্যবসা করে, তাদের জন্য লজ্জা।”
তদন্তে আরও জানা গেছে যে, আহমাদজাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়শই বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) বিরুদ্ধে পোস্ট করতেন। তিনি বারবার দাতব্য স্বেচ্ছাসেবকদের সমালোচনা করতেন এবং গ্রিক দ্বীপ লেসবসের একটি শরণার্থী শিবিরে তার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ‘কর্মফল’-এর কথা বলতেন।।
