এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,৩১ জুলাই : যে শহরকে তিনি নিজের ঘর বলে মনে করতেন, সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়ার প্রায় দুই দশক পর নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন আজ শুক্রবার আবারও কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন। ৬৩ বছর বয়সী এই লেখিকা ও সমাজকর্মীর জন্য মুহূর্তটি রাজনীতির চেয়েও বেশি ছিল দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত এক গভীর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন । পরনে লাল পাড় শাড়ি আর লাল ব্লাউজে তাকে চিরাচরিত বাঙালি সনাতনি পরিবারের স্ত্রীদের মতই দেখাচ্ছিল । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর, এক নীরব স্বস্তির ছাপ যুক্ত একমুখ হাসি নিয়ে নাসরিন বললেন,’আমার এখানে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।’
অনেকের কাছে তাঁর আগমন ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০০৭ সালে তাঁর স্মৃতিকথা ‘দ্বিখণ্ডিত’-কে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থীদের সহিংস প্রতিবাদের মুখে নাসরিন কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০০৩ সালে তৎকালীন সিপিএম-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল। এর কয়েক বছর আগেই ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসার পর কলকাতাই তাঁর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল । কিন্তু ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে তার জন্য সেই দরজাও বন্ধ করে দেয় সিপিএম । তসলিমা সাংবাদিকদের বলেছিলেন,’আমি স্বেচ্ছায় কলকাতা ছাড়িনি; তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করেছিল। তবুও আমি আশা ছাড়িনি যে একদিন আমি ফিরব। বছর পেরিয়ে গেল, সরকার বদলাল, কিন্তু দরজাটা বন্ধই রইল ।’
বাম সরকারের আমলে সাহিত্য জগতে এই ঘটনাকে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনামলেও তসলিমাকে ফেরানোর বিষয়ে কোনও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে বর্তমানে রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে সেই পরিস্থিতির বদল ঘটল।
দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি নিয়ে বর্তমানে দিল্লিতে বসবাস করলেও, নাসরীন নিজের মনের কথা বলতে ফিরে এসেছেন বাংলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থলে। শনিবার, মৌলবাদ প্রতিরোধের উপর আলোকপাত করে রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি জনসভায় তিনি মঞ্চে নিজের বক্তব্য রাখবেন । আয়োজকরা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি একটি নাগরিক সংবর্ধনা পাবেন, তাঁর কবিতা আবৃত্তি করবেন এবং একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেবেন। এই অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রখ্যাত লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।স্বাভাবিকভাবেই, প্রায় ২০ বছর পর তার প্রত্যাবর্তন পুরনো রাজনৈতিক বিভেদকে উস্কে দিয়েছে।
তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন যে, লেখিকার ইসলাম -বিরোধী ঘন ঘন অবস্থানের কারণেই বর্তমান প্রশাসন তাঁকে আতিথ্য দিচ্ছে।
তসলিমা নাসরিনের এই সফরের জোরালো সমর্থন করে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে রাজ্যের জন্য গর্বের মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্র পাল। তিনি বলেন,’পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাঁকে কখনও ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিরোধীরা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে এত কথা বলে, কিন্তু যখন তিনি তাঁর বইতে সত্য লিখলেন, তখন তারা তাঁকে নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের অধীনে তসলিমা নাসরিনের আগমন আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়।’
রাজনৈতিক বিতর্ক একপাশে রাখলে, তসলিমা নাসরিনের কাছে শনিবার মানে কেবলই সেই শহরে নিজের কথা শোনানো, যে শহর একসময় তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রবীন্দ্র সদনে কবিতা পাঠের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়, নির্বাসনের এক দীর্ঘ অধ্যায়—মাত্র কয়েক দিনের জন্য হলেও—কলকাতার চেনা উষ্ণতায় জায়গা করে দেবে তাকে ।।
