এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,৩১ জুলাই : বীরভূমের মহম্মদ বাজারের পাথর ব্যবসায়ী নাজিমউদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ঠিক কি পরিমান সম্পদের মালিক হয়েছিল তার একটা চিত্র তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । আজ শুক্রবার নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান,গতকাল মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে । সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা । মিনার মণ্ডল ও তার পরিবারের সদস্যরা বলেছে যে ওসব নাজিমউদ্দিন মন্ডল ওরফে টুলু মন্ডলের টাকা ৷ ওকে খুঁজে বের করার জন্য আমরা পুলিশকে বলেছিলাম । প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি যে নাজিম উদ্দিন মন্ডল বিদেশে আছে । হয়তো ৪ তারিখের পরিবর্তনের পরে সরে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নাজিমউদ্দিন মন্ডলের অ্যাকাউন্টগুলি থেকে এখনো পর্যন্ত ৯৩ কোটি টাকা পাওয়া গেছে । এই অ্যাকাউন্ট গুলোকে ফ্রিজ করা হয়েছে। এর বাইরে নগদ উদ্ধার করা হয়েছে ৫৩ লক্ষ টাকা। সোনার গয়না ২৬৮ গ্রাম, সিলভার ৪০০ গ্রাম, প্লাটিনাম গহনা প্রায় ২৩ গ্রাম উদ্ধার হয়েছে । নোট গণনার মেশিন পাওয়া গেছে । একটা কম্পিউটার, দুটো পেনড্রাইভ, একটা সিপিইউ এবং বিভিন্ন নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে । এছাড়াও ৮৩ ট্রাক আর ডাম্পারসহ ২৪২ টি যানবাহন পাওয়া গেছে । ট্রাক আর ডাম্পার ছাড়াও বিএনডবলু কার,অডি কার আছে । এগুলো সিজার লিস্টে নেওয়া হয়েছে । এর বাইরেও ২১ টা প্রপার্টি পেয়েছি । তার মধ্যে রয়েছে সাতটা বাড়ি, একটা ফার্ম হাউস, দুটো পেট্রোল পাম্প, একটা ইঁটের ভাটি,২ টো ক্রাশার প্রভৃতি সব মিলিয়ে প্রায় ২১ টা প্রপার্টি৷ আর জায়গার পরিমাণ হচ্ছে ৩০০ বিঘা । আইনগত ভাবে ৩০০ বিঘা সম্পত্তি আমরা সিজার লিস্টে নিয়েছি ।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় আমরা মামলা শুরু করেছি । এখনো পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে । তার মধ্যে প্রধান একান্ট্যান্ট পিনাকি দে, সহ একাউন্ট্যান্ট রাকিবুল ইসলাম, পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার কাউসার । সমস্ত সম্পত্তি নিলামে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন,এটা একটা বিরাট চক্র৷ এরকম চক্র বহু জেলাতে আছে৷ ১০০০ কোটি টাকা একটা জেলা থেকে একটা আইটেমে রাজস্ব লস, অর্থাৎ ১৫ বছরে ১৫০০০ কোটি টাকা রাজস্ব লিকেজ হয়েছে । প্রধান যে সুবিধাভোগী তাকেও আমরা খুঁজে বের করব । বছরের পর বছর রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, ২৪৩ টা গাড়ি তো একদিনে কেনা যায় না, বিএনডবলু-অডি-৩০০ দীঘা সম্পত্তি কিনে তো লুকিয়ে রাখা যায় না, এটা অনেক দিনের কাজ । অন্তত ৫-৭ বছর ধরে এই কাজ চলছে । এতে রেজিস্ট্রি অফিস, লোকাল পুলিশ, পঞ্চায়েত,সহ একাধিক ডিপার্টমেন্ট এতে জড়িত৷ হাইস ডিপার্টমেন্ট থেকে অর্ডার না গেলে যে মিস্টার মন্ডল ইন আওয়ার ম্যান ওর দিকে তাকাবে না, তাই সবাই চোখ বন্ধ করে রেখেছে । এই অর্গানাইজ ক্রাইম, সিন্ডিকেটে মাধ্যমে রেভেনিউ সাইফন করা হয়েছে । অভিযোগ করেন যে, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ‘সাপোর্ট’ ছাড়া এই ধরনের অপরাধমূলক সিন্ডিকেট চালানো কখনই সম্ভব ছিল না। ওই বিপুল টাকা অন্তত এক লাখ কর্মসংস্থান হত।
উল্লেখ্য, বুধবার সন্ধ্যায় সিউড়ি ও মহম্মদবাজারের মাঝে আগ্নেয়াস্ত্রসহ একটি গাড়ি আটক করে পুলিশ। ধৃত আরোহীদের জেরা করতেই জানা যায়, তারা টুলুর ভগ্নিপতি মিনার মণ্ডলের বাড়িতে মজুত থাকা কোটি কোটি টাকা ও সোনা লুঠ করার ছক কষেছিল। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত মিনারের বাড়িতে হানা দেয়। বাড়িতে হানা দিয়ে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় পুলিশের । পুলিশ ঘরের আলমারি ভেঙে দেখে থরে থরে সাজানো টাকার বান্ডিল ও বিপুল সোনা । রাতভর চলে তল্লাশি ও টাকা গোনার কাজ ।
মিনারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সিউড়ির আদালত তাঁকে আট দিনের পুলিশি হেপাজতে পাঠায়। পুলিশের তরফে আদালতে জানানো হয়েছে যে উদ্ধার হওয়া সোনা দুবাই থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে এসেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দিকে আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সরকারের ছত্রছায়ায় এত দিন ধরে চলা এই বিশাল দুর্নীতি চক্রের সঙ্গে সকলেই জড়িত ছিলেন ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন,বীরভূমের পাথর থেকে আগের সরকারের যখন বছরে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকার রাজস্ব আসতো, তখন বর্তমান সরকার ১১ মে থেকে ১১ জুন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটা জায়গা থেকে ৮৩ কোটি টাকার রাজত্ব সংগ্রহ করেছে । যেটা এখন ১০০ কোটির কাছাকাছি চলে গেছে । আমি আগে বলেছিলাম যে, একশ কোটি টাকা সরকারের ঘরে জমা হতো এবং হাজার কোটি টাকা নিয়ে নিত । ওই টাকার সুবিধাভোগী কে এটা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ খুঁজে বার করবে ।
পাশাপাশি বীরভূম পুলিশ এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সঠিক সুযোগ পেলে যে এ রাজ্যের পুলিশও কেন্দ্রীয় এজেন্সির মতো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, তা তারা প্রমাণ করে দিয়েছেন ।।
