এইদিন ওয়েবডেস্ক,বীরভূম,৩০ জুলাই : অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ বীরভূমের মহম্মদ বাজারের পাথর ব্যবসায়ী মিনার মণ্ডলের বাড়িতে যকের ধন উদ্ধার করল পুলিশ । তদন্তকারীদের একাংশের অনুমান, নগদ আর সোনা মিলিয়ে সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মহম্মদবাজারের ডেউচায় মিনারের বাড়িতে বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ঘিরে ফেলে৷ ঘিরে ফেলা হয় বাড়ি সংলগ্ন গোটা এলাকা । রাতভর পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে রাখা হয়েছিল । টাকা গোনার জন্য আনা হয় ৫টি নোট গোনার মেশিন৷ আনা হয় দুটি পেল্লাই টিনের ট্যাঙ্ক৷ প্রায় ১৯ ঘণ্টা ধরে ম্যারাথন গণনা গলে৷ শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয় ২৮.৫০ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা । তার মধ্যে রয়েছে ১ কেজি ওজনের ১৪টি সোনার বার এবং ১০০ গ্রামের ১০টি সোনার বিস্কুট, যার বাজারমূল্য প্রায় ২১.৫ কোটি টাকা । জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) গাইকোয়াদ নীলেশ শ্রীকান্ত বলেন, ‘বাড়িটি যার ছিল, সেই মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেহেতু এখান থেকে অনেক জিনিস পাওয়া গিয়েছে, তাই এই মুহূর্তে বাড়িটি কে সিল করা হয়েছে।’
ধৃত মিনার মণ্ডলকে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় চরম উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য ছড়ায়, এবং তাঁকে কার্যত ‘টানতে টানতে’ পুলিশের গাড়িতে তুলে মহম্মদবাজার থানায় নিয়ে যাওয়া হয়৷ এই বিপুল ধনসম্পদের উৎস ও সিন্ডিকেট যোগ রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ সুপার । তিনি জানিয়েছেন, এই পাহাড়প্রমাণ সম্পত্তি মূলত বেআইনি বালি ও পাথর খাদানের সিন্ডিকেটের টাকা । প্রাথমিক জেরায় ধৃত মিনার মণ্ডল দাবি করেছেন যে, এই ‘যকের ধন’ আসলে অনুব্রত-ঘনিষ্ঠ টুলু মণ্ডল ও তাঁর সিন্ডিকেটের ।
পুলিশ কিভাবে এই যকের ধনের সন্ধান পেলো?
বুধবার সন্ধ্যায় সিউড়ি ও মহম্মদবাজারের মাঝে আগ্নেয়াস্ত্রসহ একটি গাড়ি আটক করে পুলিশ। ধৃত আরোহীদের জেরা করতেই জানা যায়, তারা মিনার মণ্ডলের বাড়িতে মজুত থাকা কোটি কোটি টাকা ও সোনা লুঠ করার ছক কষেছিল। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত মিনারের বাড়িতে হানা দেয়৷ বাড়িতে হানা দিয়ে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় । পুলিশের । পুলিশ ঘরের আলমারি ভেঙে দেখে থরে থরে সাজানো টাকার বান্ডিল ও বিপুল সোনা । রাতভর চলে তল্লাশি ও টাকা গোনার কাজ । অনুব্রত-ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনারের এই বিপুল অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
যদিও মিনারের স্ত্রীর দাবি, ‘টুলু মণ্ডল এক বছর আগে এই টাকা রেখে গিয়েছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল, কাগজ রয়েছে। আলমারির চাবিও ছিল টুলু মণ্ডলের কাছেই। আমাদের সংসার চলে পেনশনের টাকায়। আমরা এ সবের কিছুই জানতাম না।’
উদ্ধার হওয়া টাকা ও সোনার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বুধবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লিখেছিলেন,’বালি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযানে আমাদের আইন প্রয়োগকারী কর্মীদের প্রশংসনীয় কাজ।সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযানের পর, বীরভূম পুলিশ মোহাম্মদ বাজার থানার অধীনে অবৈধ বালি মাফিয়া তুল্লু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবউদ্দিনের আস্তানাকে লক্ষ্য করে একটি বড় অভিযান চালায়।এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ উন্মোচিত হয়েছে:এখন পর্যন্ত উদ্ধারকৃত নগদ অর্থ: ৫.৫ কোটি টাকা, গণনা এখনও চলছে।উদ্ধারকৃত সোনা: ১৫ কেজি।’ তিনি পুলিশের ভুয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন,’এই অভিযানে জড়িত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজিপি, বীরভূমের এসপি এবং বীরভূম জেলা পুলিশ কর্মীদের তাদের দ্রুত, পেশাদার এবং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের জন্য আমি গভীরভাবে প্রশংসা করি।দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’কে পথপ্রদর্শক নীতি হিসেবে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট হোক: কলঙ্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও যারা সরকারি সম্পদ শোষণ করে এবং তৎকালীন শাসক রাজনৈতিক দলের সাথে আঁতাত করে সম্পদ গড়ে তুলেছে, তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।সরকারি সম্পদ জনগণের, এবং যারা তা লুট করবে, তারা আইনের পূর্ণ শক্তির সম্মুখীন হবে। সতর্কতা ও আপসহীন পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। মাফিয়া সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।’
মঙ্গলবার গভীর রাত প্রায় তিনটে নাগাদ মহম্মদবাজারের ডেউচায় মিনারের বাড়িতে পৌঁছয় পুলিশ। পরে তাঁকে পুলিশের একটি দল তুলে মহম্মদবাজার থানায় নিয়ে যায়। অন্য একটি দল বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে। থানায় মিনারকে জিজ্ঞাসাবাদে আলমারি ও অন্য জায়গায় টাকা রাখার কথা জানা যায়। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘এরা কয়লা খাদানের পরিচিত নাম। তৃণমূল জমানায় ফুলেফেঁপে উঠেছিল। পুলিশও তো সাহায্য করত। নবান্নে টাকা যেত। এখন সব লিঙ্ক কেটে গিয়েছে। নতুন তথ্য সামনে আসছে। এখন পুলিশই গ্রেপ্তার করছে।’
প্রসঙ্গত, টুলু মণ্ডল ছিলেন এলাকার পাথর ব্যবসায়ী। পাশাপাশি তিন জেলার ছয় টি পাথর শিল্পাঞ্চলের গেটে সরকারি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে যেখানে রাজস্ব আদায় হচ্ছে মাসে ৮৩ কোটি টাকা। সেখানে ২ – ৫ কোটি টাকা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করতেন টুলু মণ্ডল। ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। দিন কয়েক আগে দু-দুবার কয়েক লক্ষ সিএফটি অবৈধ বালি বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। এবার বিপুল পরিমান টাকা ও সোনা উদ্ধার হল।।
