দিন দুয়েক আগে দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন চেকিং-এ আটকে দেওয়া হয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমানকে । পূর্বে সে একজন ইউটিউবার হিসাবে কাজ করত । সেই সুযোগে ব্যাপক ভারত বিদ্বেষী প্রচার চালাত জাহিদ । যেকারণে তাকে ব্লাকলিস্টেড করে রেখেছে দিল্লি সরকার । যদিও তাকে আটকে দেওয়ার এটাই একমাত্র কারন নয়। জাহিদ উর রহমান ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত যথাযথ প্রটোকল মেনে চলেননি বলে খবর । যাই হোক,তারই প্রতিশোধ নিতে ঢাকায় ভারতের নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীকে সাক্ষাতের অনুমতি দিল না বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ।
যেকারণে স্বাধীনতার পর এই প্রথম দু’দেশের বৈরী সীমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে । তবে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে ক্ষেত্রে সম্পর্ককে প্রথম নষ্ট করে দেয় মৌলবাদী মহম্মদ ইউনূস৷ এখন কট্টর ইসলামি দল জামাত ইসলামি ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি বা বিএনপি সেই তিক্ততাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে । যেটা সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি মুসলিমদের বিতাড়নকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ।
দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাক্ষাতের অনুমতি না দেওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার খালেক ঘরামি লিখেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর বৈরী সীমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে।কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক দেশের কাউকে আরেক দেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের জন্য নিয়োগকৃত দেশে নব রাষ্ট্রদূতের বিস্তারিত জানিয়ে এগ্রোনোমো চাওয়া হয়।সে দেশ থেকে সম্মতি পেলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে তার নাম ঘোষণা করে তাকে সে দেশে পাঠানো হয়।দীনেশ ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে যথাযথ সব প্রক্রিয়া অবলম্বন করেই তাকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়েছে। নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত তার নিয়োগকৃত দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে দেখা করে তার আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র পেশ করে তার দায়িত্ব শুরু করে। এর আগে সেই রাষ্ট্রদূত নিজকে সেই দেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত বলে পরিচয় দিতে পারেন না।মানে অনেকটা চাকুরীতে যোগদান পত্র কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করলে যেভাবে চাকুরীজীবি তার পদের পরিচয় দিতে পারে।’
এরপর তিনি লিখেছেন,’দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় পৌছানোর এক সপ্তাহ অতিবাহিত হতে চলেছে।এখনো উনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ ডেট পাননি।উল্টো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কষা জাহিদ কান্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ত্রিবেদীকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না।দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগে সম্মতি দিয়ে এখন গ্রহণ না করা হবে ভারতের জন্য চরম অবমাননাকর।’
খালেক ঘরামির উপলব্ধি হল,’দুষ্ট বাচ্চারা স্কুলে না যাওয়ার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে বা খাল/পুকুরে ডুবিয়ে জ্বর বাধাতো।পরবর্তীতে সে জ্বর অনেক সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বাবা মায়ের স্থায়ী কান্নায় রূপ নিত।যেচে বিপদ ডেকে আনলে অন্যদের করার কি থাকে? দেশের বিপদ ডেকে নিয়ে আসার জন্য যারা কথার বচনের খই ফুটাচ্ছেন,তাদের খই যেন শেষ আহার না হয়।ভূজপাতা বা তেজপাতা তো নয়ই, আষাঢ়ের আমসত্ত্বের পথে চলেছি।’
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরাই বলছেন যে দীনেশ ত্রিবেদী আর জাহিদ উর রহমান এর বিষয় দুটো সম্পূর্ন আলাদা। দীনেশ ত্রিবেদী ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ধাঁচে একটি ভারত বাংলাদেশ জোট গঠনের কথা বলতে চেয়েছেন। কারন বর্তমান পরিস্থিতিতে অখন্ড ভারত অবাস্তব কথা। জাহিদ উর রহমান কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে যাননি। সেই জন্য সমস্যা হয়েছে। এখানে ভুল ওনার নিজের। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশকে এক করার বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে ভুল ব্যাখ্যা করে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশের উগ্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলি ।
বাংলাদেশের একাংশের যুক্তি হল,২০২৫ এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তখনকার বাংলাদেশের সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসের যোগ দিতে গিয়েও একই ঘটনা ঘটেছিল ৷ ইউনূসের সফরসঙ্গী ছিল বিএনপি মহাসচিব, জামাতের চৌধুরী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও এনসিপির আখতার হোসেন প্রমুখ । সেই সময় সরকারের লোকজন ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে জেএফকে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে গেলেও একজনের ইমিগ্রেশনে একটু সময় লাগে৷ তিনি হলেন আখতার হোসেন । সরকারের উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা সবাই চলে গেলেও বিএনপি মহাসচিব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এনসিপি নেতার ইমিগ্রেশন না হওয়া পর্যন্ত তিনি বের হবেন না। পরে সাধারণ গেট দিয়ে তারা বের হন। তারপর আখতারের ওপর ডিম নিক্ষেপের চেষ্টা হয় । কিন্তু বয়সে রাজনীতিতে অনেক নবীন আখতারকে রেখে ইমিগ্রেশন থেকে বের হননি সিনিয়র রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ।
এরপর গত ১৪ জুন, তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছান। টিম লিডারের ইমিগ্রেশন নিয়ে জটিলতা বা তাকে ঢুকতে না দিলেও দুই কর্মকর্তা ( একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদা, অপরজন সহকারী সচিব) জাহেদকে রেখে চলে যান ইমিগ্রেশন করে। পরে ওপাশে গিয়ে উপদেষ্টার সাখে যোগাযোগ হলেও তার পরামর্শেই কর্মকর্তারা ফেরত আসেননি। বরং সোমবার থেকে ইন্ডিয়ান ওশেন রিম এসোসিয়েশন সম্নেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছেন তারা । কিন্তু পরে জাহিদ উর রহমান ভারত ও কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষ উগরে দিচ্ছেন । এখন বিগত এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দীনেশ ত্রিবেদীকে সাক্ষাতের অনুমতি না দিয়ে ভারতের সঙ্গে তারা সংঘাতে জড়াতে চাইছে । কিন্তু যে দেশের ভারতের খনিজ তেল,বিদ্যুৎ, খাদ্যসামগ্রী ছাড়া চলে না তারা কেন এবং কার ইন্ধনে ভারতের সঙ্গে সংঘাত চাইছে ?
ইন্ধনের কথা বলতে গেলে বাংলাদেশকে সরাসরি উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে যেদুটি দেশের নাম সর্বপ্রথমে সামনে আসছে,সেই দুটি দেশ হল আমেরিকা ও পাকিস্তান । বিশেষ করে কুখ্যাত জর্জ সোরসের অর্থায়নে পুষ্ট মার্কিন ডিপ স্টেট এক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে । পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পর মার্কিন ডিপ স্টেট আরও খোলাখুলি ভারত বিদ্বেষ শুরু করে দিয়েছে । আর তারা বাংলাদেশকে একটা মোহরা হিসাবে ব্যবহার করছে ।
কিন্তু এতে বাংলাদেশের কি স্বার্থ ?
আসলে জমাত ইসলামি সমর্থিত বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকার চাইছে যেকোনো উপায়ে ভারতের “পুশ ব্যাক” আটকাতে। কারন এটা দাবি করা হয় যে ভারতে এক থেকে দেড় কোটি অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী বহাল তবিয়তে বসবাস করছে । ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের সৌজন্যে তারা ভারতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে রীতিমতো ভারতীয় নাগরিক বনে গেছে । এমনিতেই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে চরম অতান্তরে পড়েছে বাংলাদেশ । তার উপর ভারত যদি ওই বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারীদের ঠেলে দেয় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে । তাই নিজের দেশের নাগরিকদের জিরো পয়েন্টে থাকতে বাধ্য করে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে বাংলাদেশ । এক্ষেত্রে মার্কিন সমর্থিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) কে কাজে লাগাচ্ছে । ইতিমধ্যেই এইচআরডব্লিউ এশিয়ার ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী ভারতকে পুশ ইন বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া, পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের নেতা বিকাশ ভট্টাচার্যও অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ঠেলে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।।
