মুণ্ডক শব্দটির আক্ষরিক অর্থ যিনি মুণ্ডিত। একদিক থেকে বলতে গেলে, মুণ্ডক উপনিষদে যে জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে তা মুণ্ডিত মস্তক তথা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের জন্য। প্রসঙ্গত ‘মুণ্ডক’ কথাটির অন্য একটি অর্থও আছে—‘দূর করা’। এক্ষেত্রে এটিই প্রাসঙ্গিক। এই জ্ঞান আমাদের অজ্ঞতা দূর করে। কিসের অজ্ঞতা? নিজের এবং জগতের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতা। আমরা ব্রহ্ম, আমরা স্বরূপত দেবতা, যে কোন কারণেই হোক আমরা একথা জানি না। এই না জানাটাই অজ্ঞতা। আর এই অজ্ঞতা দূর করাই মুণ্ডক উপনিষদের লক্ষ্য।
মুণ্ডক উপনিষদের প্রথম কান্ডটি মূলত জাগতিক জ্ঞান (অপরা বিদ্যা) এবং আধ্যাত্মিক বা পরম জ্ঞানের (পরা বিদ্যা) মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে। এটি দেখায় যে জাগতিক আচার-অনুষ্ঠান বা যজ্ঞ মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না, বরং আত্মজ্ঞানই হলো চরম সত্য।
প্রথম কান্ডটিকে দুটি অধ্যায়ে ভাগ করা যায়:
১. প্রথম অধ্যায়: জ্ঞানের পরম্পরা ও স্বরূপ
গুরু-শিষ্য পরম্পরা: সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র অথর্বাকে ব্রহ্মবিদ্যা বা আত্মজ্ঞান দান করেছিলেন। এই জ্ঞান পরবর্তীতে গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে মুনি অঙ্গিরার কাছে পৌঁছায়।
শৌনকের প্রশ্ন: মহান গৃহস্থ শৌনক মুনি অঙ্গিরার কাছে গিয়ে বিনীতভাবে জানতে চান, “এমন কী এক পরম সত্য আছে, যা জানলে এই জগতের সমস্ত কিছুই জানা হয়ে যায়?”
পরা ও অপরা বিদ্যা: এর উত্তরে অঙ্গিরা মুনি জানান, বিদ্যা দুই প্রকার—
অপরা বিদ্যা: বেদ, বেদাঙ্গ, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ, শিক্ষা ও কল্পসহ জাগতিক শাস্ত্রীয় জ্ঞান। এগুলি মানুষকে পার্থিব উন্নতি ও পরলোকে স্বৰ্গলাভের পথ দেখায়, কিন্তু চিরন্তন মুক্তি বা মোক্ষ দিতে পারে না।
পরা বিদ্যা: যার দ্বারা সেই অবিনশ্বর পরব্রহ্মকে জানা বা উপলব্ধি করা যায়।
২. দ্বিতীয় অধ্যায়: কর্মফল ও যজ্ঞের সীমাবদ্ধতা
যজ্ঞের অসারতা: এই অংশে বৈদিক যাগ-যজ্ঞ এবং পূজাপাঠের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলি অস্থায়ী ফল প্রদান করে।
মোক্ষের পথ: বলা হয়েছে, শুধুমাত্র ভালো কাজের মাধ্যমে স্বর্গে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই পুণ্য ক্ষয় হলে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। জাগতিক আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের সন্ধান করলে তবেই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
প্রথম মুণ্ডক : প্রথম অধ্যায়
ওঁ ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ সংবভূব
বিশ্বস্য কর্তা ভুবনস্য গোপ্তা।
স ব্ৰহ্মবিদ্যাং সর্ববিদ্যাপ্রতিষ্ঠা-
মথর্বায় জ্যেষ্ঠপুত্ৰায় প্ৰাহ॥ ১।।
অন্বয়: ব্রহ্মা (ব্রহ্মা); দেবানাম্ (দেবতাগণের মধ্যে); প্রথমঃ (প্রথমে); সংবভূব (সম্যক্-রূপে অভিব্যক্ত হলেন); সঃ (তিনি); বিশ্বস্য (জগতের); কর্তা (স্রষ্টা); ভুবনস্য (সৃষ্টির); গোপ্তা (পালয়িতা); সর্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠাম্ (সকল বিদ্যার আশ্রয় স্বরূপ); ব্রহ্মবিদ্যাম্ (ব্রহ্মবিদ্যা [তিনি]); জ্যেষ্ঠপুত্ৰায় (জ্যেষ্ঠপুত্র); অথর্বায় (অথর্বাকে); প্রাহ (বলেছিলেন)।
সরলার্থ: দেবগণের মধ্যে যিনি প্রথম প্রকাশিত তিনিই ব্রহ্মা। তিনিই এই জগৎ চরাচরের স্রষ্টা ও আশ্রয়। ব্রহ্মজ্ঞানই অপর সকল জ্ঞানের উৎস। ব্রহ্মা তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র অথর্বাকে এই জ্ঞান দান করেন।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মের সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। তিনি নামরূপহীন। তিনি বাক্যমনাতীত। তাঁকে বর্ণনা করা যায় না। তিনি নির্গুণ এবং অব্যক্ত।
কিন্তু মায়াশক্তির দ্বারা তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন। এই জগতে যা কিছু আছে তিনিই তার আদি কারণ এবং তাঁরই অপর নাম ব্রহ্মা বা প্রজাপতি। ব্রহ্মার জন্ম হয়নি। কারণ ব্রহ্মা ‘জাত’ হলে তাঁর নিশ্চয়ই পিতামাতা আছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই পিতামাতারও আবার পিতামাতা আছে। আবার তাঁরও আছে, এভাবে চলতেই থাকবে। ব্রহ্মাই ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ এবং দেবগণের মধ্যেও ইনি প্রথম। তিনিই এই জগৎকে সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন, আবার তাঁকে আশ্রয় করেই এ জগৎ রয়েছে।
যেহেতু বেদসমূহ ব্রহ্মার কাছ থেকে এসেছে সেহেতু ব্রহ্মবিদ্যা বা ব্রহ্মজ্ঞানের তিনিই উৎস। ঋষিদের মধ্যে অথর্বাই প্রথম ঋষি। তাই তাঁকে ব্রহ্মার প্রথম সন্তান বলা হয়। কথিত আছে, ব্রহ্মা এই জ্ঞান (ব্রহ্মজ্ঞান) অথর্বাকে দান করেন। সকল জ্ঞানের উৎস বা ভিত্তি হল এই ব্রহ্মজ্ঞান। তাই তাকে ‘সর্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠাম্’ বলা হয়। ব্রহ্মই পরমসত্য। তিনিই সব কিছুর আশ্রয়। তিনি আছেন বলেই সব কিছু আছে। ব্রহ্মই সকল জ্ঞানের ভিত্তিস্বরূপ।
অথর্বণে যাং প্রবদেত ব্রহ্মাঽথর্বা
তাং পুরোবাচাঙ্গিরে ব্রহ্মবিদ্যাম্।
স ভারদ্বাজায় সত্যবহার প্রাহ
ভারদ্বাজোঽঙ্গিরসে পরাবরাম্॥ ২।।
অন্বয়: ব্রহ্মা (ব্রহ্মা); যাম্ (যে ব্রহ্মবিদ্যা); অথর্বণে (অথর্বাকে); প্রবদেত (বলেছিলেন); অথর্বা (অথর্বা); তাম্ (সেই); ব্রহ্মবিদ্যাম্ (ব্রহ্মবিদ্যা); অঙ্গিরে (অঙ্গিরকে); পুরা (পুরাকালে); উবাচ (বললেন); সঃ (তিনি); ভারদ্বাজায় (ভরদ্বাজ গোত্রীয়); সত্যবহায় (সত্যবহকে); প্রাহ (বললেন); ভারদ্বাজঃ (ভারদ্বাজ অর্থাৎ সত্যবহ); পরাবরাম্ ([পরা—শ্রেষ্ঠ, প্রবীণ, যেমন গুরু, এবং অবরাম্—নিকৃষ্ট, তরুণ, যেমন ছাত্র] গুরু থেকে শিষ্য পরম্পরায়); অঙ্গিরসে [প্ৰাহী] (অঙ্গিরসকে বললেন)।
সরলার্থ: পুরাকালে ব্রহ্মা যে ব্রহ্মবিদ্যা অথর্বাকে দিয়েছিলেন, অথর্বা আবার সেই জ্ঞান ঋষি অঙ্গিরকে দিয়ে যান। অঙ্গির আবার সেই জ্ঞান ভরদ্বাজ-বংশীয় সত্যবহকে দেন। গুরু থেকে শিষ্য পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত এই জ্ঞান সত্যবহ আবার অঙ্গিরসকে দিয়ে যান।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্মজ্ঞান গুরুমুখী বিদ্যা। এই জ্ঞান (এই মৌখিক বিদ্যা) পিতা থেকে পুত্রে, গুরু থেকে শিষ্যে, পরম্পরাক্রমে চলে আসছে। যিনি ব্রহ্মকে জেনেছেন তিনিই একমাত্র এই জ্ঞান দান করতে পারেন, কোন অজ্ঞ ব্যক্তি পারেন না। এ যেন একটা দীপ থেকে আর একটা দীপ জ্বালানো।
শিষ্যকে গুরুগৃহে বাস করতে হবে। গুরুর জীবন দেখে সে শিক্ষা লাভ করবে। ব্রহ্মজ্ঞান মানুষের জীবনকে পালটে দেয়। যিনি এই জ্ঞান লাভ করেছেন তিনি অন্য এক ব্যক্তিতে পরিণত হন। এমন মানুষ আমাদের মধ্যে আছেন বলেই এ পৃথিবী আমাদের বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এই জ্ঞানলাভই মানুষের জীবনের লক্ষ্য এবং আমরা তারই চেষ্টা করছি। আমাদের শাস্ত্রে বলে বই পড়া জ্ঞানই সব নয়। বই পড়ে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায় না। সৎ-গুরুই একমাত্র এই জ্ঞান দিতে পারেন। সৎ-গুরুর নির্দেশেই এই ইন্দ্রিয়াতীত অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।
শৌনকো হ বৈ মহাশালোঽঙ্গিরসং
বিধিবদুপসন্নঃ পপ্রচ্ছ।
কস্মিন্নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং
বিজ্ঞাতং ভবতীতি॥ ৩।।
অন্বয়: মহাশালঃ (বিশিষ্ট গৃহস্থ); শৌনকঃ (শুনক পুত্র); হ বৈ (প্রসিদ্ধি অর্থে); বিধিবৎ (শাস্ত্র বিধি অনুসারে); অঙ্গিরসম্ উপসন্নঃ (অঙ্গিরসের কাছে উপস্থিত হয়ে); পপ্রচ্ছ (জিজ্ঞাসা করলেন); ভগবঃ (হে ভগবান); কস্মিন্ নু বিজ্ঞাতে (কি জানলে); ইদম্ (এই); সর্বম্ (সব কিছু); বিজ্ঞাতং ভবতি ইতি (জানা যায়)।
সরলার্থ: শাস্ত্রবিধি অনুসারে ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য বিশিষ্ট গৃহী শৌনক ঋষি অঙ্গিরসের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে প্রভু, কি জানলে বা কোন্ বস্তুকে জানলে, সব কিছুকে (এই জগৎ) বিশেষ রূপে জানা যায়?’
ব্যাখ্যা: শৌনক উত্তম গৃহী। যিনি সকল কর্তব্য ঠিক ঠিকভাবে সম্পন্ন করেছেন, এবং পরম জ্ঞান লাভের জন্য যাঁর মন প্রস্তুত, তিনিই উত্তম গৃহী। এই পরম জ্ঞান শুধু ঋষি এবং সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসীদের জন্যই নয়। সংসারের সকল কর্তব্য যথাবিধি করেছেন এমন গৃহীও এই জ্ঞানলাভের অধিকারী। গৃহী ব্যক্তি যখন নিখুঁতভাবে কর্তব্য পালন করেন তখন তাঁর চিত্তশুদ্ধি হয়। তিনি তখন বুঝতে পারেন তিনি এই দেহ নন। মনও তখন তাঁর বশে। এই হল পরম জ্ঞান লাভের উপযুক্ত ক্ষণ।
এই জ্ঞান অর্জনের জন্য গুরুর কাছে যেতে হবে। তাই শৌনক বিধিমতে অর্থাৎ শাস্ত্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী যজ্ঞের কাঠ নিয়ে অঙ্গিরসের কাছে গেলেন। যজ্ঞের কাঠ হাতে নিয়ে গুরুর কাছে যাওয়া বিনয় ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। গুরু সব শিষ্যকেই এই জ্ঞান দেন না। শিষ্যকে পরীক্ষা করে উপযুক্ত বলে মনে হলেই এই জ্ঞান দান করেন।
শৌনক গুরুকে একটি চমৎকার ও কঠিন প্রশ্ন করলেন: ‘কোন্ বস্তুকে জানলে এই জগৎ-চরাচরের সবকিছুকে জানা যায়? অনুগ্রহ করে আমাকে সেই শিক্ষা দিন, যার ফলে আমি এই জগৎকে জানতে পারি। কেউ কেউ বলেন যে, বিজ্ঞানকে জানতে গেলে গণিতবিদ্যাকে অবশ্যই জানতে হবে। কারণ অঙ্কই বিজ্ঞান জগতে ঢোকার চাবিকাঠি। অনুরূপভাবে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এমন কোন জ্ঞান আছে কি যা লাভ করলে আমি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে জানতে পারব? তাই কথোপকথন শুরু হচ্ছে সরাসরিভাবে—‘আমার কি করা উচিত? আমি আর ঘুরে বেড়াতে পারছি না। আমি সোজাসুজি সত্যকে জানতে চাই। কি জানলে বা কাকে জানলে এই দৃশ্যমান জগতের সবকিছুকে আমি জানতে পারব? অনুগ্রহ করে আমাকে সেই শিক্ষা দিন।’ এটাই হল মূল জিজ্ঞাসা।
তস্মৈ স হোবাচ। দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে
ইতি হ স্ম যদ্ব্রহ্মবিদো বদন্তি পরা চৈবাপরা চ॥৪।।
অন্বয়: তস্মৈ (তাঁকে অর্থাৎ শৌনককে); সঃ (তিনি অর্থাৎ অঙ্গিরস); হ উবাচ (বললেন); ইতি হ স্ম (এই যে কথাটি); ব্রহ্মবিদঃ (ব্রহ্মজ্ঞানীরা); বদন্তি (বলেন); দ্বে (দুটি); বিদ্যে (বিদ্যা); বেদিতব্যে (জানতে হবে [বিদ্যা দুটি]); যৎ পরা (শ্রেষ্ঠ [আধ্যাত্মিক] জ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞান [‘পরা পরম-আত্মা’, পরম অর্থাৎ পরমাত্মা]); চ এব (এবং); অপরা চ (নিকৃষ্ট [পার্থিব] জ্ঞান, এই দৃশ্যমান জগতের জ্ঞান)।
সরলার্থ: অঙ্গিরস শৌনককে বললেন, ‘ব্রহ্মজ্ঞানীরা বলেন জ্ঞান দুই প্রকার, ব্রহ্মজ্ঞান অর্থাৎ পরম-জ্ঞান; আর আপেক্ষিক জ্ঞান অর্থাৎ এই দৃশ্যমান জগৎ সম্পকীয় জ্ঞান।’
ব্যাখ্যা: আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এই দুই প্রকার জ্ঞানই অর্জন করতে হবে। জাগতিক জ্ঞান বলতে এই দৃশ্যমান জগৎ-সংক্রান্ত জ্ঞান বোঝায়, এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান বলতে ব্রহ্মজ্ঞানকে বোঝায়। জাগতিক জ্ঞান বহুর জ্ঞান; আধ্যাত্মিক জ্ঞান হল একের জ্ঞান। জাগতিক জ্ঞানের নিজস্ব কোন মূল্য নেই, আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভের সহায়ক হিসাবে এর যা কিছু মূল্য। পার্থিব জ্ঞানকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাথে যুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই দৃশ্যমান জগৎ ব্রহ্মেরই প্রকাশ। আর এই অর্থেই এ জগৎকে উপেক্ষা করা যায় না। জ্ঞান জ্ঞানই, তা পার্থিবই হোক বা আধ্যাত্মিকই হোক। কিন্তু জাগতিক জ্ঞান মানুষকে শান্তি বা আনন্দ দিতে পারে না। এই জ্ঞান আমাদের জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয় বটে কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে কিন্তু অচিরেই সেই তৃপ্তির নাশ হয়। একমাত্র আধ্যাত্মিক জ্ঞানই আমাদের চিরস্থায়ী শান্তি ও আনন্দ দিতে পারে।
তত্রাপরা ঋগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোঽথর্ববেদঃ
শিক্ষা কল্লো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষমিতি।
অথ পরা যয়া তদক্ষরমধিগম্যতে॥ ৫।।
অন্বয়: তত্র (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক—এই বিদ্যা দুটির মধ্যে); ঋগ্বেদঃ (ঋগ্বেদ); যজুর্বেদঃ (যজুর্বেদ); সামবেদঃ (সামবেদ); অথর্ববেদঃ (অথর্ববেদ); শিক্ষা (উচ্চারণ বিদ্যা); কল্পঃ (আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বিদ্যা); ব্যাকরণম্ (ব্যাকরণ বিদ্যা); নিরুক্তম্ (শব্দার্থ বিদ্যা); ছন্দঃ (ছন্দ বিদ্যা); জ্যোতিষম্ (জ্যোতিষ বিদ্যা); ইতি অপরা (এই সকল অপরা বিদ্যা); অথ পরা (আর পরাবিদ্যা হল); যয়া (যে বিদ্যার দ্বারা); তৎ অক্ষরম্ (যা ক্ষয়হীন বা নিত্য [ব্রহ্মকে]); অধিগম্যতে (জানা যায়)।
সরলার্থ: উপরোক্ত দুই শ্রেণীর বিদ্যা হল পরা বিদ্যা এবং অপরা বিদ্যা। অপরা বিদ্যা হল : ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা (উচ্চারণ বিদ্যা), কল্প (অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বিদ্যা), ব্যাকরণ, নিরুক্ত (শব্দার্থ বিদ্যা), ছন্দ, জ্যোতিষ—এই দশটি। আর পরা বিদ্যার দ্বারা ব্রহ্মকে জানা যায়, যে ব্রহ্ম শাশ্বত ও নিত্য।
ব্যাখ্যা: জাগতিক অর্থাৎ অপরা বিদ্যার মধ্যে কি কি পড়ে? তা হল, চারটি বেদ—ঋক্, সাম, যজুঃ, অথর্ব; এ ছাড়া ছয়টি বেদাঙ্গ, যা বেদ পাঠে সাহায্য করে। এই ছয়টি বেদাঙ্গ হল—শিক্ষা (উচ্চারণ), কল্প (আচার-অনুষ্ঠান), ব্যাকরণ, নিরুক্ত (শব্দার্থ বিদ্যা), ছন্দ এবং জ্যোতিষ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই জগৎ সংক্রান্ত বিদ্যাই হল অপরা জ্ঞান বা অপরা বিদ্যা। বস্তুত এই জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নয়। কারণ এর দ্বারা আমরা মুক্তি লাভ করতে পারি না। কথামৃতকার শ্ৰীম (শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) তাঁর নিজের স্ত্রী সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যে মন্তব্য করেছিলেন আমরা সেকথা সকলেই জানি। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পত্নী অজ্ঞান।’ শ্রীরামকৃষ্ণ বিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন, ‘তা সে অজ্ঞান, আর তুমি বুঝি খুব জ্ঞানী?’ এর আগে জ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়ে শ্রীম-র মনে কোন প্রশ্ন জাগেনি। তাই তিনি ভেবেছিলেন, ‘অবশ্যই আমি জ্ঞানী। কারণ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত। এছাড়া অনেক বইও আমি পড়েছি। তখন পর্যন্ত তিনি জানতেন লেখাপড়া শিখলে ও বই পড়তে পারলেই জ্ঞানলাভ হয়। এই প্রথম তিনি বুঝলেন, ঈশ্বরকে জানার নামই জ্ঞান, না জানাই অজ্ঞান।
আমরা বেদ, বেদাঙ্গ ও অন্যান্য বিষয় জানতে পারি। বস্তুত পার্থিব জীবনে এই সব জ্ঞান প্রয়োজনীয়। জীবন ধারণের জন্য এসব অপরিহার্য। কারণ মানুষকে স্বনির্ভর হতে হবে। কিন্তু এটিই শেষ কথা নয়, জীবনের লক্ষ্যও নয়। এই জাতীয় জ্ঞান কখনই আমাদের মুক্তি দিতে পারে না।
তবে প্রকৃত জ্ঞান কি? অঙ্গিরসকে শৌনক যে প্রশ্ন করেছিলেন আমরা আবার সেই মূল প্রশ্নে ফিরে যাই। প্রশ্নটি ছিল—‘কোন্ বস্তুকে জানলে সব কিছুকে জানা যায়?’ অঙ্গিরস উত্তরে বললেন, ‘এই পরা বিদ্যার দ্বারা আমরা অক্ষরকে জানতে পারি। অক্ষর অর্থাৎ যাঁর ক্ষয় নেই। তিনি অপরিবর্তনীয়, নিত্য এবং অবিনাশী। সেই অপরিবর্তনীয় বস্তুটি কী? ব্রহ্ম। যে বিদ্যার দ্বারা আমরা ব্রহ্মকে জানতে পারি তা হল পরাবিদ্যা বা প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞানলাভই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য।
যত্তদদ্রেশ্যমগ্রাহ্যমগোত্রমবর্ণ-
মচক্ষুঃশ্রোত্রং তদপাণিপাদম্।
নিত্যং বিভুং সর্বগতং সুসূক্ষ্মং
তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ॥।৬।।
অন্বয়: তৎ যৎ (সেই অক্ষর ব্রহ্ম); অদ্রেশ্যম্ (অদৃশ্য অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ধরা যায় না); অগ্রাহ্যম্ (যাঁকে গ্রহণ করা যায় না); অগোত্রম্ (মূল বা উৎস নেই); অবর্ণম্ (রূপহীন); অচক্ষুঃশ্রোত্রম্ (চক্ষুকর্ণহীন); তৎ (সেই); অপাণিপাদম্ (হাত পা বর্জিত); নিত্যম্ (অবিনাশী); বিভুম্ (ব্যাপক); সর্বগতম্ (সর্বব্যাপী); সুসূক্ষ্মম্ (অতি সূক্ষ্ম); তৎ (সেই); অব্যয়ম্ (ক্ষয়হীন); যৎ (যিনি); ভূতযোনিম্ (সৃষ্টির উৎস); [সেই ব্ৰহ্মকে] ধীরাঃ (জ্ঞানী ব্যক্তিরা); পরিপশ্যন্তি (সর্বত্র দেখেন)।
সরলার্থ: যিনি অদৃশ্য (জ্ঞানেন্দ্রিয়ের অতীত), অগ্রাহ্য (কর্মেন্দ্রিয়ের অতীত), স্বয়ম্ভূ, অরূপ, সকল ইন্দ্রিয়ের ঊর্ধ্বে (জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়) অবিনাশী এবং সর্বব্যাপী (আকাশের মতো) এবং যিনি সূক্ষ্মতম ও সকল সৃষ্টির উৎস—সেই ব্ৰহ্মকে জ্ঞানী ব্যক্তিরা সর্ববস্তুতে এবং সর্বত্র দেখেন।
ব্যাখ্যা: এই ব্রহ্মকে বর্ণনা করা যায় কি ভাবে? তিনি অবর্ণনীয়। প্রথমে উপনিষদ ব্রহ্মকে নেতিবাচক ভাবে বর্ণনা করেছেন। ‘নেতি নেতি’—ব্রহ্ম এই নন, ব্রহ্ম সেই নন। ব্রহ্মকে চোখে দেখা যায় না (অদ্রেশ্যম্)। তিনি জ্ঞেয় বস্তু নন। তিনি জ্ঞাতা, কাজেই তিনি দৃষ্টিগোচর হতে পারেন না। তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন—অগ্রাহ্যম্। কোন বস্তুকে আমরা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করতে পারি কিন্তু ব্রহ্মকে পারি না। কারণ ব্রহ্ম নির্গুণ, যিনি কোন শর্তের অধীন নন। তিনি স্বয়ম্ভূ—অগোত্রম্। অর্থাৎ তিনি বংশ পরিচয়ের অতীত। তাঁর কোন রূপ নেই—অবর্ণম্। তাঁর কোন গুণ নেই। তিনি চোখ কান (অচক্ষুঃ শ্রোত্রম্), এবং হাত-পা (অপাণিপাদম্) বর্জিত। তিনি নিরাকার। তাই তাঁর কোন রূপ নেই। তাঁর যদি রূপ থাকত তবে তাঁকে আমরা দেখতে পেতাম, স্পর্শ করতে পারতাম, তাঁর কথা শুনতে পেতাম। কিন্তু যেহেতু তিনি অরূপ তাই আমরা বলতে পারি না, ‘আমি ব্ৰহ্মকে দেখেছি’।
যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্নতে চ
যথা পৃথিব্যামোষধয়ঃ সংভবন্তি।
যথা সতঃ পুরুষাৎ কেশলোমানি
তথাঽক্ষরাৎ সংভবতীহ বিশ্বম্॥ ৭।।
অন্বয়: যথা (যেমন); ঊর্ণনাভিঃ (মাকড়সা দ্বারা); [জাল] সৃজতে (সৃষ্টি হয়), চ (এবং); গৃহ্নতে (জাল নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়); যথা (যেমন); পৃথিব্যাম্ (পৃথিবীর ওপরে); ওষধয়ঃ (বৃক্ষেরা); সংভবন্তি (জন্মায়); যথা (যেমন); সতঃ (সজীব); পুরুষাৎ (জীবদেহ থেকে); কেশলোমানি (কেশ এবং লোম); [সংভবন্তি (জন্মায়)]; তথা (সেইরূপ); অক্ষরাৎ (নিত্য ব্রহ্ম থেকে); ইহ (এই সংসারে); বিশ্বম্ (সমস্ত জগৎ); সংভবতি (উৎপন্ন হয়েছে)।
সরলার্থ: মাকড়সা নিজ দেহের ভিতর থেকে জাল বার করে এবং প্রয়োজনে সেই জাল আবার নিজ দেহের মধ্যেই গুটিয়ে নেয়। একইভাবে এই মাটিতে ফলমূল উৎপন্ন হয়, জীবন্ত মানুষের দেহ থেকে কেশ ও লোম রাশি বের হয়। অনুরূপ ভাবে অক্ষর এবং শাশ্বত ব্রহ্ম থেকেই এই জগতের উদ্ভব।
ব্যাখ্যা: এই জগতের উৎপত্তি হয়েছে কী ভাবে? ব্রহ্মের সঙ্গে জগতের সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে উপনিষদ এখানে একাধিক উপমার উল্লেখ করেছেন। উপনিষদ প্রথমে বলেছেন, মাকড়সা যেমন তার জাল নিজের শরীরের ভেতর থেকে বার করে, জগৎ সৃষ্টিও অনেকটা সেইরকম। কীটকে ফাঁদে ফেলবার জন্য মাকড়সা ঘরের কোণে জাল বোনে। এই মাকড়সার দেহ থেকেই বিরাট জাল বের হয়, আবার ইচ্ছা করলেই মাকড়সা তার জালটিকে নিজ দেহের ভিতর গুটিয়ে নিতে পারে। সেই রকমভাবে ব্ৰহ্ম এই জগৎকে নিজের ভেতর থেকে বাইরে বার করে আনেন আবার সেটিকে নিজের মধ্যেই ফিরিয়ে নেন। এই জগৎ ব্রহ্ম থেকে এসেছে আবার ব্রহ্মেই লয় হয়। কিন্তু এর দ্বারা কি ব্রহ্ম নিজে প্রভাবিত হন? না, তা হন না। জাল বোনার ফলে মাকড়সার যেমন কোন পরিবর্তন হয় না, ঠিক তেমনি এই জগৎ প্রকাশের দ্বারা ব্ৰহ্ম বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হন না। ব্রহ্ম অবিচল। সকল অবস্থাতেই তিনি অচঞ্চল, পরিবর্তনরহিত। জগতের অস্তিত্ব থাক বা না থাক ব্রহ্মের কোন পরিবর্তন হয় না, ব্রহ্ম ব্রহ্মই থাকেন। উপনিষদ আর একটি উপমা দিচ্ছেন, এই পৃথিবীর মাটিতেই উদ্ভিদের জন্ম। আমাদের চারপাশে ছোট বড় নানা রকম গাছপালা আমরা দেখে থাকি। এ সবই মাটি থেকে এসেছে এবং ভবিষ্যতে সব মাটিতেই ফিরে যাবে। উপনিষদের আর একটি উপমা হল মানুষের দেহের কেশ ও লোম রাশি। দেহের চৈতন্য আছে বলেই আমাদের দেহ থেকে কেশ ও লোম রাশি জন্মাতে পারে।
একই ভাবে এই জগৎ ব্রহ্মের কাছ থেকেই এসেছে আবার ব্রহ্মেই ফিরে যাবে। এই জগৎ কারোর সৃষ্টি নয়। এ ব্রহ্মেরই প্রকাশমাত্র। বেদান্ত মতে, শূন্য থেকে কোন কিছুর সৃষ্টি হতে পারে না। সৃষ্টি বলে আসলে কিছুই নেই; যা আছে তা প্রকাশ মাত্র। ব্রহ্মই জগৎ রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন। আবার তিনি জগৎকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেন। এই প্রক্রিয়া নিরবধি ঘটে চলেছে। এ জগতের উপাদান কারণ ও নিমিত্ত কারণ দুই-ই ব্রহ্ম।
তপসা চীয়তে ব্রহ্ম ততোঽন্নমভিজায়তে।
অন্নাৎ প্রাণো মনঃ সত্যং লোকাঃ কর্মসু চামৃতম্॥৮।।
অন্বয়: ব্রহ্ম (ব্রহ্ম); তপসা ([আক্ষরিক অর্থ হল তপস্যা, কিন্তু এখানে] মননের দ্বারা); চীয়তে (বিস্তৃত হলেন [অর্থাৎ নিজেকে প্রকাশ করলেন]); ততঃ (তা থেকে [ব্রহ্ম]); অন্নম্ (অন্ন বা সৃষ্টির বীজ অর্থাৎ মায়া); অভিজায়তে (জন্মায়); অন্নাৎ (সেই হিরণ্যগর্ভ থেকে); প্রাণঃ (প্রাণ); মনঃ (মন); সত্যম্ (পঞ্চ মহাভূত); লোকাঃ (ভূ প্রভৃতি লোকসমূহ); [অভিজায়তে (ব্যক্ত হল বা সৃষ্টি হল)]; কর্মসু চ (এবং কর্ম থেকে); অমৃতম্ (কর্মফল সৃষ্টি হল])।
সরলার্থ: নিজ মনন শক্তি দ্বারা ব্রহ্ম নিজেকে প্রকাশ করেন। প্রথমে সৃষ্টির বীজ (অর্থাৎ মায়া) সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই বীজ থেকে আসে প্রাণ (অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ—ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ), প্রাণ থেকে আসে মন, সমষ্টি মন। তারপর আসে পঞ্চভূত এবং শেষে এই জগৎ। কর্ম থাকলেই তার ফল থাকবে, তাই কর্মফল অনন্ত ও অবিনাশী।
ব্যাখ্যা: জাল বাইরে বার করার বা নিজের ভেতরে গুটিয়ে নেওয়ার জন্য মাকড়সাকে কিছু চেষ্টা করতে হয়। জগৎকে প্রকাশ করতে ব্রহ্মকেও কি অনুরূপ চেষ্টা করতে হয়? না, তা হয় না। এই শ্লোকে এই সূত্রটির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
‘ব্রহ্ম চীয়তে’—ব্রহ্ম প্রসারিত হন এবং নিজেকে প্রকাশ করেন। কেমন করে? ‘তপসা’—মনন শক্তির দ্বারা। ‘তপসা’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘কৃচ্ছ্র সাধনের দ্বারা’। কোন কাজ করতে গেলে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। হয়তো আমার কোন জরুরী কাজ পড়ে গেছে, আর সেকাজটি তখনই করতে হবে। সে জন্য সময় অভাবে আমার হয়তো খাওয়াই হল না, যদিও আমি খুবই ক্ষুধার্ত। এই হল কৃচ্ছ্র সাধন। কিন্তু ব্রহ্মের ক্ষেত্রে এ জাতীয় কোন চেষ্টার প্রয়োজন হয় না। ব্রহ্ম কেবলমাত্র নিজ চিন্তার দ্বারা এই জগৎকে প্রকাশ করেন। ব্রহ্ম শুধু চিন্তা করলেন—‘আমি এক, আমি বহু হতে চাই’ এবং সঙ্গে সঙ্গে বহুর সৃষ্টি হল। ব্রহ্মের ইচ্ছামাত্রই এই জগতের সৃষ্টি হল। এ ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছাই এই সৃষ্টির কারণ।
কথাটিকে অন্যভাবেও বলা যেতে পারে: আমাদের সকলের মধ্যেই ব্রহ্ম আছেন। আমরা সকলেই স্বরূপত ব্রহ্ম, কিন্তু এ সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। কৃচ্ছ্রসাধনের দ্বারা আমরা নিজেদের স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি। আত্মসংযম, নিত্য-অনিত্য বস্তু বিচার, ধ্যান ধারণা, শাস্ত্র ও গুরুবাক্যে শ্রদ্ধা ইত্যাদির সাহায্যে আমরা মনকে প্রস্তুত করে থাকি। আর মন প্রস্তুত হলে ব্রহ্ম নিজেই নিজেকে প্রকাশ করেন। আমাদের সকলের মধ্যে ব্রহ্ম প্রচ্ছন্ন ভাবে রয়েছেন, তাই আমরা সে সম্পর্কে অবহিত নই। দেহ এবং কামনা-বাসনা নিয়েই আমরা মত্ত। তাই কেউ আমাদের আঘাত করলে সেই মুহূর্তেই আমরা খুব রেগে যাই এবং প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করি। কিন্তু আত্মসংযম অভ্যাস করলে আমাদের ভেতরের দৈবী ভাবটি ফুটে ওঠে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই দৈবী গুণাবলী রয়েছে, কিন্তু যে-কারণেই হোক সেগুলি চাপা পড়ে আছে। তপস্যার দ্বারা সেই প্রচ্ছন্ন গুণগুলিকে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু ব্রহ্মের ক্ষেত্রে কোন তপস্যার দরকার হয় না। এক্ষেত্রে ‘তপসা’ বলতে মনন শক্তিকে বোঝায়।
এই শ্লোকে প্রকাশের ক্রমও বলা হয়েছে। প্রথমে শুধু ব্রহ্ম, জগৎ বলে কিছুই নেই। এ অবস্থা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য; তবু ধরে নেওয়া যাক, কোন এক বিশেষ মুহূর্তে শুধু শুদ্ধচৈতন্য ব্রহ্মই আছেন। এর পর ব্রহ্ম চিন্তা করলেন, ‘আমি আমাকেই প্রকাশ করব।’ এ সবই আমাদের অনুমানের কথা। বস্তুত ব্রহ্ম কি করেন তা আমরা সত্যিই জানি না। কিন্তু নিজেদের অবস্থা দিয়েই আমরা তাঁকে বোঝার চেষ্টা করি। যেমন, কোন কাজ করবার আগে আমরা চিন্তা করি, আবার কেমন ভাবে সেই কাজ করব তার পরিকল্পনাও করি। অর্থাৎ চিন্তা সবসময়ই কর্মের পূর্ববর্তী। কোন ইঞ্জিনিয়ার যখন বাড়ী তৈরী করেন তখন তিনি মনে মনে তার একটা ছক এঁকে নেন। তারপর সেই ছকই ক্রমশ বাস্তব রূপ নেয়। তাই প্রথমে চিন্তা ও পরে কর্ম। তাই প্রথমেই ব্ৰহ্ম থেকে আসে মায়া। মায়ারই আর এক নাম প্রকৃতি। প্রকৃতি থেকে আসে প্রাণ বা হিরণ্যগর্ভ। হিরণ্যগর্ভ হল ব্রহ্মের প্রথম সমষ্টি প্রকাশ। তারপর আসে মন, এ কোন একক মন নয়, এ হল নিখিলমন। মন থেকে আসে ‘সত্যম্’ অর্থাৎ উপাদান (যথা—আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী), এবং সত্যম্ থেকে আসে চতুর্দশ লোক বা জগৎ।
তারপর থাকে অমৃতম্। ‘অমৃতম্’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল—‘অমর’, কিন্তু এর আর এক অর্থ হল ‘কর্মফল’। কর্ম করলেই তার ফল থাকবে। আমরা ভাল কর্ম করলে ভাল ফল লাভ করে থাকি। শাস্ত্রমতে আমরা সবসময়ই যাগযজ্ঞ করে চলেছি। আমরা কে বা সমাজে আমাদের মান কি এ সব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে আমাদের জন্য কিছু কর্ম নির্দিষ্ট থাকে। এই কাজগুলি ঠিক ঠিকভাবে করতে পারলে তা-ই যজ্ঞের সমান। এর ফলে আমরা দীর্ঘ জীবন, প্রচুর ধন সম্পদ, বহু সুসন্তান, এবং মৃত্যুর পর স্বর্গলাভ করে সুখ ভোগ করতে পারি। কিন্তু কিছু কাল পরে আবার আমরা এই পৃথিবীতেই ফিরে আসি এবং জীবন শুরু করি। একেই বলা হচ্ছে অমৃতম্ বা অমরত্ব। কিন্তু এই অমরত্ব চিরস্থায়ী নয়। এই অমরত্বের দ্বারা আমরা হয়তো স্বর্গলাভ করতে পারি এমনকি স্বর্গের দেবদেবীও হতে পারি। তখন কিছু সময়ের জন্য আমরা বিপুল শক্তির অধিকারী হই ঠিকই কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। প্রকৃত অমরতার তুলনায় এই অমরতা অস্থায়ী, একটি বিশেষ মুহূর্তে সত্য। কিন্তু আমরা এ কথা ভুলে গিয়ে আপেক্ষিক অমরতা বা স্বর্গসুখের পেছনে ছুটি।
এই ভাবেই সূক্ষ্ম থেকে স্থূল জগতের প্রকাশ চলতে থাকে। প্রথম ব্রহ্ম, তারপর প্রকৃতি, পরে হিরণ্যগর্ভ, তারপর সমষ্টি-মন, পরে পঞ্চ মহাভূত, তারপর চতুর্দশ লোক বা জগৎ, এবং সর্বশেষে নিরবচ্ছিন্ন কর্ম ও তার ফলভোগ।
যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্ যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ।
তস্মাদেতদ্ব্রহ্ম নাম রূপমন্নং চ জায়তে॥ ৯।।
অন্বয়: যঃ (যিনি); সর্বজ্ঞঃ (সর্বজ্ঞ); সর্ববিৎ (সকল বিষয় [পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে] জানেন); যস্য (যাঁর); জ্ঞানময়ম্ (জ্ঞানময়); তপঃ (তপস্যা); তস্মাৎ (তা থেকে [পরব্রহ্ম]); এতৎ ব্রহ্ম (এই ব্রহ্ম [অপরা ব্রহ্ম অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ]); নাম (নাম); রূপম্ (রূপ); চ (এবং); অন্নম্ (নাম, রূপ ও অন্ন); জায়তে (জন্মায়)।
সরলার্থ: যিনি সর্বজ্ঞ, যিনি সর্ববিৎ, জ্ঞানই যাঁর তপস্যা সেই পরা ব্রহ্ম থেকেই এই অপরা ব্রহ্ম (হিরণ্যগর্ভ) এবং নাম, রূপ ও অন্নাদি এসেছে।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্ম সর্বজ্ঞ—তিনি সব কিছু জানেন। ‘যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ’—জ্ঞানই তাঁর একমাত্র তপস্যা। ব্রহ্ম যেহেতু সর্ব ব্যাপী সেহেতু তিনি সবই জানেন এবং সবই বুঝতে পারেন। ব্রহ্ম যেন জ্ঞানের সমুদ্র। আর এই সৃষ্টি বা এই প্রকাশ যেন ঐ সমুদ্রের তরঙ্গ। জগৎ এই জ্ঞানসমুদ্রের একটি তরঙ্গ মাত্র। কিন্তু এই জগৎ প্রকাশে ব্রহ্মের কোন চেষ্টার প্রয়োজন হয় না। তাঁর ক্ষুদ্র একটি চিন্তাই মুহূর্তের মধ্যে এই জগৎ রূপে নিজেকে প্রকাশ করে। এ জগতে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে তার একটি নাম ও রূপ আছে। আর আছে অন্ন অর্থাৎ খাদ্য। নাম, রূপ এবং খাদ্য সবই ব্রহ্ম থেকে এসেছে। এই বৈচিত্রময় জগৎও ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নয়। এই জগতের উপাদান কারণ ও নিমিত্ত কারণ দুই-ই ব্রহ্ম। কেউ একজন ব্রহ্মকে সৃষ্টি করেছেন এবং পরে সেই ব্রহ্মই জগৎকে সৃষ্টি করেন—এ কথাটি ঠিক নয়। ব্রহ্ম নিজেই নিজেকে প্রকাশ করেন। নর, নারী, গাছপালা, জীবজন্তু, গ্রহনক্ষত্র, বাতাস, জল, আগুন ইত্যাদি নানারকমের বৈচিত্র আমরা দেখে থাকি। নামরূপ নিয়েই এই জগৎ। মাকড়সার জাল যেমন মাকড়সার দেহ থেকেই আসে, মাটি থেকে যেমন গাছপালা আসে, এবং জীবন্ত মানুষের দেহ থেকে যেমন কেশ ও লোম বার হয় ঠিক তেমনি সবকিছু এই ব্রহ্মের কাছ থেকেই আসে।
পরা ব্রহ্মই সর্বশ্রেষ্ঠ বা পরম। তিনি নির্গুণ তাই কোন বিশেষণ দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করা যায় না। পরা ব্রহ্মের পরেই হল অপরা ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম সগুণ। এঁকে হিরণ্যগর্ভ বা ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে।
॥ ইতি মুন্ডোকোপনিষদি প্রথমমুন্ডকে প্রথমঃ খন্ডঃ ॥
