আপনি কি জানেন যে ভ্যাটিকান ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক ‘ভূতুড়ে’ সন্ন্যাসিনীর কাটা মাথার মমি শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে ?ভ্যাটিকানের অত্যন্ত গোপনীয়তার কারনে এমন সব ঘটনার বিবরণ যা প্রকাশ্যে আনা হয় না, তাই মানুষ কখনোই তা জানতে পারে না। এমনই দাবি নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াচ্ছে খ্রিস্টান সম্প্রতি কিছু মানুষ । বলা হচ্ছে যে এই সবকিছুই গোপন নথি এবং আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়েছে এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও থাকবে, এবং হয়তো বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি অনেক কিছুর সত্যও আড়ালে রয়ে গেছে…
সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে যে প্রাক্তন সন্ন্যাসিনী মারিয়া রোজেনথালের মমি করা মাথা হল এমনই এক রহস্য । ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও, মাথাটি প্রায় অক্ষত রয়েছে। এই কল্পকাহিনীটি ঠিক এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিবেশন করা হয়েছে :
চলুন কয়েক বছর পেছনে ফিরে যাই, বিশেষ করে ১৭৪২ সালে, যখন জোসেফিন রোজেনথাল নামের এক সন্ন্যাসিনী হোহেনওয়ার্ট মঠে আবির্ভূত হন এবং হঠাৎ করেই তাকে গর্ভবতী হয়ে পড়েন । একজন সন্নাসিনী হয়েও গর্ভধারণ করে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন৷ তবে তিনি জোরালোভাবে দাবি তোলেন যে গির্জার ভেতরে কোনো পুরুষের সাথে বা তাঁর কোনো কাছের মানুষের সাথে তাঁর কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়নি। ফলস্বরূপ, তাঁর বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়, যা তাঁর কুমারীত্বকে নিশ্চিত করে । শেষ পর্যন্ত নিষ্কলঙ্ক গর্ভধারণের (Immaculate Conception) সম্ভাবনাটি উত্থাপিত হয়েছিল, যা একটি ক্যাথলিক মতবাদ এবং যা কুমারী মেরির গর্ভধারণের মুহূর্ত থেকেই তাঁর পবিত্রতাকে ঘোষণা করে। ফাদার আরেচ্চি এই ঘটনাটিকে কোনো ঐশ্বরিক কিছুর প্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন, এবং জোসেফিনের গর্ভধারণের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দেয় । কালক্রমে, জোসেফিনকে চতুর্দশ বেনেডিক্টের পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ধারাবাহিক কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে তার কুমারীত্ব পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছিল।অবশেষে, তিনি মারিয়া রোজেনথাল নামে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন; এই নামকরণ করা হয়েছিল প্রসবকালে মৃত্যুবরণকারী তার মায়ের সম্মানে।
কিছুদিন পর, তার কথিত উভলিঙ্গ অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়াতে শুরু করল।বছরের পর বছর ধরে, তার এই অবস্থার কারণে, মারিয়া কিছু সন্ন্যাসিনী ও যাজকের কাছ থেকে ক্রমাগত অপমানের শিকার হতে লাগলেন, যারা তাকে কোনো ঐশ্বরিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং একজন ডাইনি হিসেবে দেখত। ফলস্বরূপ, গির্জার নেতারা মারিয়াকে হত্যা করার একটি পরিকল্পনা তৈরি করল। কৌশলটি ছিল, মারিয়ার মৃত্যু হবে ৩৩ বছর বয়সে, অর্থাৎ যিশুর বয়সে, এবং একই সাথে তার মৃত্যুকে একটি ঐশ্বরিক তাৎপর্য দেওয়া হবে।
পরিকল্পনাটির কথা মারিয়ার কানে পৌঁছালে সে নিজেই নিজের গলা কেটে জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর, যাজকেরা সন্ন্যাসিনীদের আদেশ দেন তার শিরশ্ছেদ করতে, তারপর তার মাথাটি মমি করে একটি ক্রুশ ও কিছু লেখা সহ একটি বাক্সে রাখতে।তার মৃত্যুর পর গির্জায় ব্যাখ্যাতীত অলৌকিক ঘটনার গল্প ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। লোকেরা করিডোরে তার গোঙানি ও কান্নার শব্দ শোনার কথা জানায়। বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসিনীও মারিয়াকে মঠের হলঘরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখার দাবি করেন। “তার কান্নার শব্দও শোনা যায়।” কিন্তু আজও ভ্যাটিকান এই সমস্ত গুজবের কোনো স্পষ্টিকরণ দেয়নি ।
এই কাহিনীর পিছনে আসল রহস্য
আসলে ভ্যাটিকানকে মহিমান্বিত করতে বা অন্য কোনো কারনে এটি একটি সম্পূর্ণ কল্পকাহিনী । সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মে ভ্যাটিকান সিটিতে শিকল দিয়ে বাঁধা একটি মমির মাথার ছবি এবং ভিডিও প্রায়শই ভাইরাল হয়, যা নিয়ে একটি “ভুতুড়ে সন্ন্যাসিনী” বা “পজেসড নান” (Possessed Nun)-এর কাহিনী প্রচলিত আছে । তবে, এই কাহিনীটি সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং এটি মূলত একটি ইন্টারনেট আরবান লেজেন্ড বা গুজব ।
গুগুল জানিয়েছে যে দাবি করা হয় যে, ১৭৪২ সালে ‘জোসেফিন রোজেনথাল’ (Josephine Rosenthal) নামক এক সন্ন্যাসিনী রহস্যজনকভাবে গর্ভবতী হন এবং কুমারী থাকা সত্ত্বেও সন্তান জন্ম দেন। পরে তার মেয়ে ‘মারিয়া রোজেনথাল’ (Maria Rosenthal)-কে ডেমোনিক বা অশুভ মনে করে চার্চ তার শিরশ্ছেদ করে এবং তার মমি করা কাটা মাথাটি শিকল দিয়ে বেঁধে ভ্যাটিকানে লুকিয়ে রাখা হয় ।প্রচলিত আছে যে, এই মাথাটি আজও ভ্যাটিকানের গোপন কক্ষে শিকলবদ্ধ অবস্থায় আছে এবং ওই সন্ন্যাসিনীর আত্মা সেখানে ঘুরে বেড়ায় ।
কিন্তু,এটি আদতে কোনো ঐতিহাসিক ভুতুড়ে মমি নয়, বরং এটি একটি শিল্পকর্ম বা ‘আর্ট পিস’ । ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এটিকে ভুতুড়ে কাহিনী হিসেবে প্রচার করে । অনলাইনে অনেকেই এই মাথার ছবিটিকে ‘সেন্ট ক্যাথরিন অফ সিয়েনা’ (St. Catherine of Siena)-র মমি করা মাথার সাথে মিলিয়ে ফেলেন, যা ইতালির সিয়েনাতে সংরক্ষিত আছে, কিন্তু সেটি শিকল দিয়ে বাঁধা নয় ।কিছু সূত্র দাবি করে, এই মমি করা মাথার শিল্পটি ‘Alex CF’ নামক একজন শিল্পীর তৈরি করা (witch-grass on Tumblr) । আসলে,ভ্যাটিকানে শিকল দিয়ে বাঁধা কোনো ভুতুড়ে সন্ন্যাসিনীর কাটা মাথা ৩০০ বছর ধরে রাখার কাহিনীটি একটি ভৌতিক গল্প বা কাল্পনিক ইন্টারনেট ভাইরাল কন্টেন্ট মাত্র।।
