এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০১ মে : আফ্রিকার দেশ মালি থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে রাজধানী বামাকোর দিকে এগিয়ে আসছে।তারা রুশ মিলিশিয়া-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটাতে সক্ষম হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, এই আল-কায়েদা সন্ত্রাসীরা যদি মালির রাজধানী দখল করে, তবে আফ্রিকায় প্রথম জিহাদি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।
আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন নুসরাত আল- ইসলাম ওয়াল-মুসলিমীন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তর ও মধ্য মালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে, যার ফলে বামাকোগামী গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসী দলটি মঙ্গলবার মালির রাজধানী অবরোধের ঘোষণা করেছে। দলটির স্থানীয় কমান্ডার আবু হুযাইফা আল -বাম্বারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছে: “আমরা কোনো রাস্তা খোলা রাখব না, কারণ পুরো শহরটি কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে।”
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বামাকোর উপকণ্ঠে,বিশেষত বিমানবন্দর ও সামরিক এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বেড়েছে। একই সময়ে, শহরের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে এবং কিছু শিক্ষাকেন্দ্র ও শহরের রাস্তাঘাট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদীরা রাজধানী ঘিরে ফেলে, বামাকো বিমানবন্দরে হামলা চালায় এবং মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল সাদিও কামারাকে তাঁর শহরতলির বাড়িতে হত্যা করে। তারা বিপুল পরিমাণ রুশ সরঞ্জামও বাজেয়াপ্ত করেছে।
ওয়াগনার গ্রুপের অন্তর্গত রুশ ভাড়াটে মিলিশিয়ারা আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের দমন করার জন্য ২০২২ সালে প্রথম মালিতে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, বামাকোর ওপর সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নড়বড়ে এবং তারা মালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আল- কায়েদার অনুগত সন্ত্রাসীরা পশ্চিমা বাহিনী ও রুশ মিলিশিয়াদের হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, রুশ মিলিশিয়াদের উপস্থিতি ছিল আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য মস্কোর একটি বৃহত্তর ও আরও উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টার অংশ। ক্রেমলিন মালি, সুদান ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোর সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে সেখানকার সরকারগুলোকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরও বিস্তৃতভাবে বললে, রাশিয়া আফ্রিকায় তার উপস্থিতি ও স্বার্থকে বিশ্ব আধিপত্যের জন্য পশ্চিমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার একটি মূল কারণ হিসেবে দেখত, কিন্তু এই পন্থাটি এখন ব্যর্থ হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম হওয়ার পর লিবিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব বলয় সীমিত হয়ে পড়েছে এবং বহিষ্কারের হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়াতেও ক্রেমলিন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
মালিতে সাম্প্রতিক এই ধাক্কা আফ্রিকায় রাশিয়ার সম্প্রসারণের সমাপ্তি ঘটাতে পারে। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই মহাদেশটিকে ওয়াগনার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভজেনি প্রিগোজিন রাশিয়ার আরও ধনী হওয়ার একটি উপায় হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।
২০২৩ সালে প্রিগোজিন ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন এবং এর দুই মাস পর তার ব্যক্তিগত জেট বিমানে বিস্ফোরণে নিহত হন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, রুশ মিলিশিয়ারা উত্তর মালির কৌশলগত ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ শহর কিদাল থেকে পিছু হটতে শুরু করেছে। আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা সাঁজোয়া যান ও একটি রুশ অ্যাটাক হেলিকপ্টার দখল করেছে।
জিহাদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা :
আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জিহাদিদের পাশাপাশি পূর্ব মালিতে আইসিসের একটি স্থানীয় শাখাও সক্রিয় রয়েছে। যদিও গোষ্ঠী দুটি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, উভয়ই কেন্দ্রীয় সরকারকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন আয়াজ আগ ঘালি, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চোরাচালান, চাঁদাবাজি এবং ব্ল্যাকমেলের উপর ভিত্তি করে একটি সামরিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
বিশ্লেষকরা মালির বর্তমান পরিস্থিতিকে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে তুলনা করছেন। মালিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ২০১২ সালে গালির নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল । একসময় রক-সংগীতপ্রেমী ও মার্লবোরো সিগারেটে আসক্ত এই ব্যক্তি পরে চরমপন্থী হয়ে ওঠেন এবং তার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সংগীত নিষিদ্ধ করেন।ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে যে, ফরাসি নেতৃত্বাধীন বাহিনী আট বছর ধরে ইসলামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে ব্যর্থ হওয়ার পর মালির সরকার ওয়াগনারের কাছে সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।।
