এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,০২ আগস্ট : মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসাবে বামপন্থীদের চিহ্নিত করলেন বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন । শনিবার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তসলিমা বলেন,’বামপন্থীরা নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান, কিন্তু মুসলমানদের জন্য চান মধ্যযুগীয় বিধান । এরাই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ।’
তসলিমা নাসরিন ইসলামি চরমপন্থী আর বামপন্থীদের কার্যত একই তালিকাভুক্ত করেছেন । তিনি বলেন,’ইসলামি জিহাদি-জঙ্গিরা সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হুমকি ও হত্যা ব্যবহার করে। মৌলবাদের কাছে নত রাষ্ট্র ব্যবহার করে আইন, কারাগার এবং নির্বাসন। আর তথাকথিত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থীরা ব্যবহার করেন অপবাদ, উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ এবং সামাজিক বর্জন। পদ্ধতি আলাদা কিন্তু ফল একই। ইসলামের সমালোচনা বন্ধ হয়, মুসলিম নারীর বঞ্চনা অক্ষত থাকে, মুসলিম সমাজের বিবর্তন থেমে থাকে।’
তসলিমা বলেন,’আমরা যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করছি, আমরা চাই মুসলিম সমাজও অন্ধ আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে যুক্তি-সমতা- মানবাধিকার এবং আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাক। আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য। যে বিধান নারীকে পুরুষের যৌনদাসী হিসেবে গণ্য করে, অমুসলিমকে ঘৃণা করে, ইসলামের সমালোচককে হত্যা করে, সেই বিধানকে প্রশ্ন করতেই হবে।’
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বামপন্থীদের ভন্ডামির তীব্র সমালোচনা করে লেখিকা বলেন,’আরও বেদনাদায়ক হল, মুসলিম সমাজকে অন্ধকারে রাখতে শুধু উগ্রপন্থীরাই সক্রিয় নন, তথাকথিত প্রগতিশীল এবং বামপন্থীদের একটি অংশ এই অচলাবস্থাকে রক্ষা করে। নিজেরা বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার ভোগ করেও, ইসলামের সমালোচক এবং সংস্কারকদের মুসলিম বিদ্বেষী আখ্যা দেন। আমি অহরহ তাঁদের আক্রমণের শিকার হই।’ তিনি বলেন,’তাদের অভিযোগ, আমি কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টাম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে একই ভাবে যুদ্ধ করছি না? তাঁরা কি একই যুক্তিতে রাজা রামমোহন রায়কে বাতিল করেন এই বলে যে তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়েছেন কিন্তু পৃথিবীর সব ধর্মের, সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়েননি? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কি কেউ দোষ দিয়েছিলেন যে তিনি হিন্দু বিধবাদের অধিকারের জন্য লড়লেন, অন্য ধর্মের সংস্কার করতে গেলেন না কেন? সমাজ সংস্কারকরা সমাজের সবচেয়ে পরিচিত অন্যায় থেকে লড়াই শুরু করেন। আমার ক্ষেত্রে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে কেন?’
তসলিমা ইসলাম ধর্মে মেয়েদের সমানাধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছেন । তিনি বলেন,’এক জন নারীর অধিকার তাঁর জন্ম বা ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নির্ভর করতে পারে না। জীবন তাঁর নিজের, শরীর তাঁর নিজের, সিদ্ধান্তও তাঁর নিজের। কোনও ধর্মীয় আইন নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলে, সেই আইন বাতিল করতে হবে। ধর্মের মর্যাদার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়। একই দেশে নাগরিকের অধিকার ধর্মভেদে আলাদা হতে পারে না। ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার।’
তিনি বলেন,’৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলে এসেছি। বিপদ এসেছে, নির্বাসন এসেছে, একাকিত্ব এসেছে কিন্তু আমার বিশ্বাস বদলায়নি। বাংলাদেশে আজ মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ভয়াবহ। রাজীব হায়দর, অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলয় নীল ফয়সল-সহ অনেক সাহসি মুক্তচিন্তকদের জিহাদিরা নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। অপরাধ তাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন। ইসলামের বৈষম্যমূলক বিধানের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের হত্যা করে সমাজকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্ন করলে মৃত্যু, নীরব থাকলে জীবন। আমি সেই শর্ত মানি না।’
তিনি বলেন,’নীরবতার বিনিময়ে যে জীবন কিনতে হয়, সেটি স্বাধীন জীবন নয়। কিন্তু প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। প্রশ্নকারীকে হত্যা করলে আরও বহু মানুষের কণ্ঠে প্রশ্ন ফিরে আসে। যে সমাজ সমালোচককে হত্যা করে, কারাগারে পাঠায় বা নির্বাসিত করে, সেই সমাজ সমালোচককে নয়, নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে, বন্দি করে বা নির্বাসিত করে।’
উল্লেখ্য,২০০৭ সালে ইসলামি চরমপন্থীদেরর চাপে কলকাতা থেকে তসলিমাকে কার্যত তাড়িয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার । তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরেও একই কারনে এরাজ্যে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাকে । দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিজেপি ক্ষমতায় এসে অবশেষে কলকাতায় ফিরলেন তসলিমা নাসরিন।।
