এইদিন বিনোদন,২৯ জুন : অভিনেতা সঈফ আলি খান ও কারিনা কাপুর খানের দুই ছেলে — তৈমুর ও জাহাঙ্গীর। তাদের মধ্যে মুরুর নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তৈয়ার। ১৪ শতক একজন ভয়ঙ্কর মধ্যবর্তী এশীয় তুর্মঙ্গোল-হানাদার তৈমুর লং তার আমলে অগনিয়র রাজনৈতিক দল নরসংহার করা। এখন ছেলের এই নামকরণ নিয়ে মুখ করেছেন অভিনেতা সঈফ আলি খান। দ্য উইমেন-এর লন্ডনে সাংবাদিক বরখা দত্তের সঙ্গে এই বিষয়ে সঈফ আলি খান সাফাই, “তৈমুর মনে লোহা। আমাদের কোনো মন্তব্য ছিল না, কিন্তু লোকে বলত, ভারতে একই ব্যক্তি একজন এশীয় তুর্কি আক্রমণকারী ছিল, যার নাম নেতিবাচক ছিল।”
কিন্তু সঈফ যাই বলুন না কেন, তার স্ত্রী কারিনা কাপুর খান একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছিলেন, “সঈফ ইতিহাস ভালোবাসে, সে খুব স্পষ্টভাষী। সে যোদ্ধাদের পছন্দ করে এবং তাদের সম্পর্কে পড়ে। সে মোঙ্গল তৈমুরের ভক্ত ছিল।” এখন এই অভিনেতা দম্পতির এই পরস্পর বিরোধী মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে । একজন এক্স ব্যবহারকারী সঈফ ও কারিনার বক্তব্যের ভিডিও স্লিপিং শেয়ার করে লিখেছেন,’এখন আপনি কাকে বিশ্বাস করবেন — স্বামী নাকি স্ত্রীকে?’
কে এই তৈমুর লঙ?
তৈমুর লঙ বা আমির তৈমুর ছিলেন ১৪ শতকের একজন ভয়ংকর মধ্য এশীয় তুর্কো-মঙ্গোল বিজেতা এবং তৈমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করে তিনি মধ্য এশিয়া, পারস্য, সিরিয়া এবং রাশিয়া পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল তৈমুর, তবে ফার্সি ভাষায় “তৈমুর-ই-লঙ” কথার অর্থ “খোঁড়া তৈমুর”। কারণ বাল্যকালে যুদ্ধের সময় তাঁর ডান পা আহত ও পঙ্গু হয়ে যায়।
তৈমুর লঙ তাঁর নিষ্ঠুরতা এবং ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত। ১৩৯৮ সালে দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে তিনি ভারত আক্রমণ করেন। রাজধানী দিল্লি জয় করার পর তাঁর বাহিনী শহরটিতে এক বীভৎস গণহত্যা চালায় এবং ব্যাপক লুণ্ঠন করে। হাজার হাজার ভারতীয়কে বন্দি ও হত্যা করা হয়।যদিও তিনি চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন না, তবে নিজেকে চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যের পুনরুদ্ধারকারী হিসেবে দাবি করতেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের অমুসলিমরা আজও তৈমুর লঙকে ঘৃণার চোখে দেখে । ১৩৩৫ সালে ট্রান্স- অক্সিয়ানার ‘কেশ’ নামক স্থানে আমির তৈমুরের জন্ম হয়। ১৩৬৯ সালে তিনি চাগতাই নেতা হন এবং দেশ বিজয়ে বের হয়ে পড়েন। তৈমু্র পূর্ব দিকে পারস্য, আফগানিস্থান ও আরমেনিয়া জয় করেন। মধ্য এশিয়া জয় করার পরে তিনি ভারত বিজয় মনস্থির করেন। তার লেখা বই ‘ মালফুজাত-ই-তৈ্মুরী’ থেকে জানা যায়, সমরখন্দের সিংহাসনে আরহন করে তিনি পার্শ্ববর্তি রাজ্য জয় করে সাম্রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি করেন। এবারে তিনি হিন্দুস্থান(ভারত) জয় করতে মনস্থির করেন। তিনি তার পুত্র ও আমীরদের অভিমত জানতে চাইলেন।
যুবরাজ পীর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বললেন : “স্বর্ন প্রসবিনী হিন্দুস্থান জয় করে আমরা হব বিশ্বজয়ী।”
যুবরাজ সুলতান হোসেন বললেন : “আমরা যখন হিন্দুস্থান জয় করব তখন আমরা হব চার দেশের শাসক ও প্রভু।” আমীরগন বললেন : “যদিও আমরা হিন্দুস্থান জয় করতে পারি কিন্তু সেদেশে আমরা যদি থেকে যাই, আমাদের সন্তান ও তাদের সন্তান- সন্তদিগন হিন্দের ভাষায় কথা বলবে। তারা হারাবে তাদের পূর্ব পুরুষের শৌর্য-বীর্যের ঐতিহ্য। কালক্রমে আমাদের বংশধরগন কালস্রোতে হবে লুপ্ত।” আমার হিন্দুস্থান জয়ের সংকল্প অনড়-অটল। তার থেকে আমি বিরত হব না। আমি তাদের বললাম আমি খোদা ও কোরানের নির্দেশ প্রার্থনা করব। তারা সকলেই সম্মতি জানালেন।
১৩৯৮ সালে কাটোর, উত্তর পূর্ব সীমান্তের একটা ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য আক্রমনের মাধ্যমে শুরু হয় তার ভারত অভিযান। কাটোরের অধিবাসীরা তৈমুরের বাহিনীকে প্রতিরোধ অসম্ভব জেনে পালিয়ে যায় দূর্গম পাহাড়ে। তৈমুর পরিত্যক্ত নগরী লুন্ঠন ও ধ্বংসের আদেশ দেন। তার আদেশে মুসলিম বাহিনী আল্লাহ আকবর রণ ধ্বনি দিয়ে পাহাড়ে উঠে হিন্দুদের আক্রমন করে। বহু হিন্দু নিহত হয়, বহু হত আহত ও পালিয়ে যায় অনেকে। তৈমুর আক সুলতানকে পরাজিত হিন্দু বাহিনীর নিকট পাঠান। শর্ত- ইসলাম গ্রহন করলে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত। তারা সকলেই প্রান রক্ষার তাকিদে ইসলাম গ্রহন করেন। তারপর অবাধ্য, দূর্বিনীত অবিশ্বাসীদের ছিন্নমুন্ডু দিয়ে পাহাড়ের উপরে তৈরী করা হল স্তম্ভ।
এগিয়ে চলে তৈমুর বাহিনী। এবারের লক্ষ্য রাজস্থানের ভাটনীর রাজ্য। রাজা দুল চাঁদ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু মাত্র এক ঘন্টায় দশ হাজার রাজপুত যোদ্ধা নিহত হয়। লুন্ঠিত হয় ধন -সম্পদ, ভস্মীভূত হয় দূর্গ ও সংলগ্ন অট্টালিকা সমূহ। এরপর তৈমুর দমন করেন জাঠদের, বন্ধী করেন তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের।
এরপর তৈমুর যমুনার তীরে ছাউনি ফেলেন। নদীর অপর তীরে লোদি শহর ও দূর্গ। তৈমুর বাহিনী নদি পার হয়ে দূর্গ আক্রমন করে। রাজপুতরা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ঘরের মধ্যে পুড়িয়ে মারে এর পর বেপরোয়া ভাবে ঝাপিয়ে পড়ে তৈমুর বাহিনীর উপর। কিন্তু রাজপুত বাহিনী পরাজিত হয়, অনেকে হয় বন্ধী। পরদিন তাদেরও হত্যা করা হয়।
একের পর এক রাজ্য জয় করে তৈমুর দিল্লির দ্বারপ্রান্তে এসে শিবির স্থাপন করেন। বহু লক্ষ্য কাফের হত্যা করেও লক্ষাধিক হিন্দু তার শিবিরে বন্ধী। পেছনে শত্রু ফেলে রেখে যুদ্ধযাত্রা নিরাপদ নয়, প্রধান আমীরদের এমন পরামর্শ শুনে তৈমুর সেই অসহায়, শৃংখলিত লক্ষ হিন্দুকে হত্যার নির্দেশ দেন। এক সংগে লক্ষ বন্ধীর হত্যা যুদ্ধের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তৈমুর তার আত্ম জীবনীতে লিখেছেন,”দিল্লিতে আমি ১৫ দিন ছিলাম। দিনগুলি বেশ সুখে ও আনন্দে কাটছিল। দরবার বসিয়েছি, বড় বড় ভোজ সভা দিয়েছি। তারপরেই মনে পড়ল কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই আমার হিন্দুস্থানে আসা। খোদার দয়ায় আমি সর্বত্রই আশাতীত সাফল্য পেয়েছি। লক্ষ লক্ষ কাফের হিন্দু বধ করেছি। তাদের তপ্ত শোনিতে ধৌত হয়েছে ইসলামের পবিত্র তরবারি——–তাই এখন আরাম-আয়েসের সময় নয় বরং কাফেরদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ করা উচিৎ।”
ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট লিখেছেন,”১৩৯৮ সালে তৈমুর সিন্ধুনদ অতিক্রম করে হিন্দুস্থান আক্রমন করেন। যারা পালাতে পারেনি তাদের সকলকে হত্যা অথবা বন্ধী করেন। দিল্লির শাসক মামুদ তুঘলককে পরাস্ত করে অধিকার করেন দিল্লি। নির্বিকার চিত্তে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেন এক লক্ষ বন্দীকে। দিল্লি নগরী লুন্ঠন করে ফিরে যান সমরখন্দে। সঙ্গে লক্ষ বন্ধী নারী ও দাস।”
তৈমুর লঙের অভিযান মধ্য এশিয়া ও ভারতের ইতিহাসে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর মধ্য এশিয়ায় তৈমুরীয় রেনেসাঁ শুরু হলেও, তাঁর ষষ্ঠ বংশধর বাবর পরবর্তীতে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ।
অন্যদিকে সঈফ আলি খানের পারিবারিক কাহিনীর কথা বলতে গেলে তিনি প্রয়াত ক্রিকেটার মনসুর আলী খান পতৌদি এবং প্রবীণ অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের সন্তান। শর্মিলা ঠাকুর, এর আগে ‘রঁদেভু উইথ সিমি গারেওয়াল’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন যে, মনসুর আলি খানকে বিয়ে করার আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় আয়েশা। তিনি বলেছিলেন, “এটা সহজ ছিল না, আবার খুব কঠিনও ছিল না। এর মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং এটি বুঝতে হয়েছিল। এ নিয়ে খুব হালকাভাবে নেওয়া যায় না। এর আগে আমি খুব বেশি ধার্মিক ছিলাম না। এখন, আমার মনে হয় আমি হিন্দুধর্ম এবং ইসলাম সম্পর্কে আরও বেশি জানি।”
সঈফ আলি খানের নিজেও দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিয়ে করেন; প্রথমটি অভিনেত্রী শিখ অমৃতা সিংয়ের সঙ্গে, যাকে তিনি ২০০৪ সালে তালাক দেন, এবং পরে হিন্দু অভিনেত্রী কারিনা কাপুরের সঙ্গে, যাকে তিনি ২০১২ সালে বিয়ে করেন।
উই দ্য উইমেন-এর লন্ডন সংস্করণে কথা বলতে গিয়ে সাইফ বলেন, “এই আলোচনাটা আমি তাদের সাথে করতে ভালোবাসি। কারণ আমি নিজে খুব বেশি ধার্মিক মানুষ নই। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন, এবং আমি আমার সন্তানদেরও শিখিয়েছি যে, ঈশ্বর একজনই এবং তাঁর অনেক নাম আছে। ব্যাপারটা এতটাই সহজ। আপনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর উপাসনা করেন। আর আপনার ধর্ম যদি সহমানুষের প্রতি ভালোবাসা ও ক্ষমার কথা বলে, তাহলে সেটাই যথেষ্ট।”
তিন বছর আগে ‘দ্য এক্সপ্রেস আড্ডা’ অনুষ্ঠানে কারিনা কাপুর খানও সাইফের সঙ্গে তাঁর বিয়ে নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক এবং তাঁদের বয়সের ব্যবধান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক বেশি সময় ও শক্তি ব্যয় হয়েছে। এর সাথে তিনি আরও যোগ করেন, “সাইফ এবং আমার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা একে অপরকে পছন্দ করি এবং একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করি।” তিনি বলেন, একবার তিনি ভিন্ন ধর্মের অনুসারী বলে গির্জার প্রার্থনা এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু “তখন তারা একজন মৌলভীকে (ইসলামিক পণ্ডিত) আমাদের সাথে কথা বলতে নিয়ে আসেন। তাতে কাজ হয়নি”। সাইফ বলেন, তার বেড়ে ওঠার সময় অন্যান্য ধর্মের প্রার্থনাও প্রচলিত ছিল এবং দিওয়ালির মতোই বড়দিনও উদযাপন করা হতো।তিনি যোগ করেন, “আমি এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি। এটা স্বতঃস্ফূর্ত ।”
সাইফ সম্প্রতি তৈমুরের সাথে তার একটি কথোপকথনও শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, তিনি তার ৯ বছর বয়সী ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ধর্ম এবং পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য কী?” উত্তরে তৈমুর বলেছিল, “ধর্মে আমরা প্রার্থনা করি, আর পদ্ধতিতে করি না।” সাইফ এটিকে “একটি ভালো উত্তর” বলে অভিহিত করে বলেন, “তাই, আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে ক্রমাগত কথা বলি।” তিনি আরও বলেন যে ধর্মের বিষয়ে তার মায়ের একটি খোলা মন ছিল, এবং তার স্ত্রীরও তাই, যাকে তিনি “আরও বেশি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি” বলে অভিহিত করেন।
গত বছর, সাইফের ছোট বোন, অভিনেত্রী সোহা আলি খান বলেছিলেন যে, সাইফ ও কারিনা কাপুরের মতো তিনিও তাঁর অভিনেতা-স্বামী কুনাল খেমুকেও তাঁদের আন্তঃধর্মীয় বিয়ের জন্য একই ধরনের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সাংবাদিক নয়নদীপ রক্ষিতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “অনেক অদ্ভুত ঘটনা” ঘটেছিল এবং তিনি “লাভ জিহাদ” ও “ঘর ওয়াপসি” সংক্রান্ত শিরোনামের পাশাপাশি “তোমরা আমাদের একজনকে নিয়েছ, এখন আমরা তোমাদের একজনকে নিয়ে নেব” – এই ধরনের মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন।।
