প্রশ্নোপনিষদের পঞ্চম প্রশ্নটি ওঙ্কার (ॐ) বা প্রণবের মাহাত্ম্য এবং তার ধ্যানের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করে । ঋষি পিপ্পালাদ ও সত্যকামের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পরম ব্রহ্ম লাভের উপায় বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রশ্নকর্তা: সত্যকাম (শৈব্য গোত্রের সন্তান)।
উত্তরদাতা: মহর্ষি পিপ্পালাদ।
ওঙ্কারের তিনটি মাত্রা: ওঙ্কারের তিনটি মাত্রা বা অংশ রয়েছে — অ, উ, এবং ম। এর মধ্যে প্রথম দুটি মাত্রা (অ এবং উ) মানবকে পার্থিব ও স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে যুক্ত করে, যা অপূর্ণ ফল প্রদান করে।
তৃতীয় মাত্রার তাৎপর্য: যে সাধক ওঙ্কারের তৃতীয় মাত্রা বা ‘ম’-কার সহ সম্পূর্ণ ওঙ্কার ধ্যান করেন, তিনি তেজ বা সূর্যের আলোর মতো পবিত্র হয়ে ব্রহ্মলোকে উন্নীত হন। সেখানে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ পরম পুরুষকে উপলব্ধি করেন।
মুক্তির ফল: ওঙ্কার সাধনার ফলে সাধক এই জগত থেকে মুক্ত হয়ে পরমাত্মায় লীন হন।
প্রশ্নোপনিষদ্ – পঞ্চম প্রশ্ন
পঞ্চম প্রশ্ন
অথ হৈনং সৈব্যঃ সত্যকামঃ পপ্রচ্ছ।
স যো হ বৈ তদ্ বগবন্মনুষ্যেষু প্রায়ণাংতমোংকারমভিধ্যায়ীত কতমং-বাঁব স তেন লোকং জয়তীতি ॥১॥
অতঃপর শিবিপুত্র সত্যকাম ঋষি পিপ্পলাদকে প্রশ্ন করলেন: ‘ভগবান, যদি কোন ব্যক্তি সমস্ত জীবন ওম্কে ধ্যান করেন তাহলে তিনি এই ধ্যানের দ্বারা কোন্ লোক প্রাপ্ত হবেন?’
তস্মৈ স হোবাচ এতদ্ বৈ সত্যকাম পরং চাপরং চ ব্রহ্ম যদোংকারঃ।
তস্মাদ্ বিদ্বানেতেনৈবাযতনেনৈকতরমন্বেতি ॥২॥
পিপ্পলাদ তাঁকে বললেন : হে সত্যকাম, ওম্ নির্গুণ ব্রহ্ম (পরব্রহ্ম) এবং সগুণ ব্রহ্ম (অপরব্রহ্ম) এই দুই-এরই প্রতীক। যিনি একথা জানেন তিনি ওম্কে ব্রহ্মের প্রতীক রূপে ধ্যান করেন। পরিণামে তিনি যে কোন অবস্থা প্রাপ্ত হন।
স যধ্যেকমাত্রমভিধ্যায়ীত স তেনৈব সংবেঁদিতস্তূর্ণমেব জগত্যাভিসংপধ্যতে।
তমৃচো মনুষ্যলোকমুপনয়ংতে স তত্র তপসা ব্রহ্মচর্য়েণ শ্রদ্ধয়া সংপন্নো মহিমানমনুভবতি ॥৩॥
যিনি ‘অউম্’-এর যে কোন একটি অক্ষর (যেমন অ)-এর ধ্যান করেন, সেই ধ্যানই তাঁর জাগতিক জ্ঞানলাভের পক্ষে যথেষ্ট। শীঘ্রই তিনি আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ‘অউম্’-এর ‘অ’ ঋগ্বেদের প্রতীক। ‘অ’-এর ধ্যানের দ্বারা তিনি মনুষ্যজন্ম লাভ করেন। তখন তিনি তপস্যায় মগ্ন হন ও ব্রহ্মচর্য, আত্মসংযম অভ্যাস করেন। শাস্ত্র ও গুরুবাক্যে তখন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। এই সকল গুণের জন্য তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন।
অথ যদি দ্বিমাত্রেণ মনসি সংপদ্যতে সোঽংতরিক্ষং-য়ঁজুর্ভিরুন্নীযতে সোমলোকম্।
স সোমলোকে বিভুতিমনুভূয় পুনরাবর্ততে ॥৪॥
সাধক যদি ‘অউম্’-এর দ্বিতীয় অক্ষরের (‘উ’কার) ধ্যান করেন, তবে এর দ্বারা তিনি মনকে উন্নত করেন (অর্থাৎ সাধক এই অক্ষরটির সাথে একাত্মতা অনুভব করেন)। মৃত্যুর পর এই বর্ণই (‘উ’কার) সাধককে অন্তরীক্ষের মধ্য দিয়ে চন্দ্রলোকে নিয়ে যায়। অন্তরীক্ষ হল স্বর্গ এবং মর্তের মধ্যবর্তী আকাশ। ‘অউম্’-এর দ্বিতীয় বর্ণ ‘উ’ যজুর্বেদের প্রতীক। সাধক চন্দ্রলোকের সমস্ত ঐশ্বর্য ভোগ করে পুনরায় মানুষ রূপে এই মর্তলোকে ফিরে আসেন।
যঃ পুনরেতং ত্রিমাত্রেণোমিত্য়েতেনৈবাক্ষরেণ পরং পুরুষমভিধ্য়ায়ীত স তেজসি সূর্য়ে সংপন্নঃ।
যথা পাদোদরস্ত্বচা বিনির্ভুচ্যত এবং হ বৈ স পাপ্মনা বিনির্ভুক্তঃ স সামভিরুন্নীযতে ব্রহ্মলোকং স এতস্মাজ্জীবঘনাত্পরাত্পরং পুরিশয়ং পুরুষমীক্ষতে তদেতৌ শ্লোকৌ ভবতঃ ॥৫॥
যিনি পরমাত্মার প্রতীকরূপে তিন অক্ষর বিশিষ্ট ‘অউম্’-এর ধ্যান করেন তিনি জ্যোতির্ময় সূর্যে লীন হয়ে যান। সাপ যেমন জীর্ণ খোলস ত্যাগ করে ঠিক তেমনি এরূপ ব্যক্তিও নিজেকে সব পাপ থেকে মুক্ত করেন। সামমন্ত্র তখন তাঁকে ব্রহ্মলোকে নিয়ে যায়, সেখানে তিনি ব্রহ্মের সাথে অভিন্নতা উপলব্ধি করেন। এমনকি সাধক তখন নিজেকে হিরণ্যগর্ভ থেকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে থাকেন। তখন তিনি জানেন তিনিই এ জগতের সবকিছু হয়েছেন। এ বিষয়ে দুটি শ্লোক আছে।
তিস্রো মাত্রা মৃত্য়ুমত্য়ঃ প্রয়ুক্তা অন্যোন্যসক্তাঃ অনবিপ্রয়ুক্তাঃ।
ক্রিয়াসু বাহ্যাংতরমধ্যমাসু সম্যক্ প্রয়ুক্তাসু ন কম্পতে জ্ঞঃ ॥৬॥
যিনি ‘অউম্’-এর তিনটি অক্ষরকে আলাদাভাবে ধ্যান করেন তিনি মৃত্যুর অধীন। কিন্তু এই তিনটি অক্ষরকে একত্রে ধ্যান করতে পারলে সেই ধ্যানই যথার্থ। জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা আলাদা নন, এক। যিনি সঠিকভাবে এই দেবতার ধ্যান করেন তিনিই ‘অউম্’-এর প্রকৃত অর্থ জানতে পারেন। যিনি এই ‘অউম্’কে ঠিক ঠিক ভাবে জানেন তিনি অভয়পদ লাভ করেন।
ঋগ্ভিরেতং-য়ঁজুর্ভিরংতরিক্ষং সামভির্যত্তত্কবয়ো বেদয়ংতে।
তমোংকারেণৈবাযতনেনান্বেতি বিদ্বান্ যত্তচ্ছাংতমজরমমৃতমভয়ং পরং চেতি ॥৭॥
সাধক যদি ব্রহ্মরূপে ‘অউম্’কে ধ্যান করেন, তবে তিনি ঋক্-মন্ত্রের সাহায্যে মনুষ্যলোক, যজুঃমন্ত্রের দ্বারা চন্দ্রলোক এবং সামমন্ত্রের সহায়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন। একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই এই ব্রহ্মলোক লাভ করেন। ওম্কে ঠিক ঠিক ভাবে জানতে পারলে সাধক পরম শান্তি অনুভব করেন। সাধক তখন জরা, ব্যাধি এবং সকল প্রকার ভয় থেকে মুক্ত। তখন তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন এবং পরমাত্মার সাথে এক হয়ে যান।
