প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০৯ জুলাই : রাজ্যে পালাবদলের পর পূর্বতন শাসকদলের কুখ্যাত নেতাদের রাতের ঘুম কার্যত কেড়ে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । রাজ্য জুড়ে একের পর গ্রেপ্তার হচ্ছে এক সময়ে এলাকার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা তৃণমূলের কুখ্যাত নেতারা । এমনই এক কুখ্যাত তোলাবাজ তৃণমূল নেতা হলেন পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের মেহেমুদ খান । বিজেপি সরকার শপথ গ্রহনের পরেই চম্পট দিয়েছিলেন তিনি । কিন্তু শেষ রক্ষা হল না । জামালপুর থানার পুলিশ তাকে গোপন আস্তানা থেকে পাকড়াও করে এনেছে৷ মেহেমুদ খানের বিরুদ্ধে রয়েছে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা আদায় সহ মারধোর ও খুনের হুমকি দেওয়ার মত গুরুতর সব অভিযোগ । বিশ্বজিৎ পণ্ডিত নামে ওই ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করে জামিন অযোগ্য একাধিক ধারার মামলা রুজু করেছে । আজ বৃহস্পতিবার ধৃত তৃণমূল নেতাকে বর্ধমান আদালতে পেশ করে পুলিশ ১০ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে চেয়ে আবেদন জানায় । সিজেএম ধৃতকে ৫ দিনের পুলিশি হেপাজত মঞ্জুর করেছেন ।
তৃণমূল নেতা মেহেমুদ খানকে জামালপুরের দ্বিতীয় শেখ শাহজাহান বলা হত । বালিপাচার, ভয় দেখিয়ে তোলাবাজি, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সম্পদ ও অর্থ অত্মসাৎ প্রভৃতি এমন কোনো কুকাজ নেই সে করেনি বলে অভিযোগ । কিন্তু মমতা ব্যানার্জির দলের এই “সম্পদ”-এর দাপট এতটাই ছিল যে অত্যাচারিতরা মুখ খোলা তো দুরের কথা,পুলিশ পর্যন্ত তাকে সাত হাত মেপে চলত । এই সুযোগে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনকালে কার্যত ধনকুবের বনে গিয়েছিল মেহেমুদ খান । জামালপুরের একটি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রী মীরাতাজ শেখ বলেন,’৪ মে ভোটের ফল ঘোষণার দিন রাত ৯ টা থেকে ১১টার মধ্যে বড় বড় চার ব্যাগ ভর্তি টাকা ও কেনা জমির অজশ্র দলিল মেহেমুদ খান তাঁর জামাইকে দিয়ে পার্টি অফিস থেকে অন্যত্র পাচার করিয়ে দেয় । অত টাকা মেহেমুদ খাঁন কোথা থেকে পেল এবং অত জমি কিভাবে কিনলো তার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হোক ।’
কিন্তু যার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মেহেমুদ খানকে গ্রেপ্তার করেছে, সেই সালালপুর গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পণ্ডিতের উপর চালানো সন্ত্রাসের বর্ণনা তিনি যা করেছেন তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মত । গত ৮ জুলাই থানায় দায়ের করা অভিযোগে বিশ্বজিৎ বাবুর জানান,২০২৪ সাল থেকে মেহেমুদ খান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর কাছে ১২ লক্ষ টাকার দাবি করে চলে।তার মধ্যে ৬ লক্ষ টাকা ধাপে ধাপে তিনি দিয়েছেন। তার পরেও তাঁকে রেহাই দেওয়া হয় না। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টা নাগাদ মেমারি-তারকেশ্বর রোড ধরে তিনি বাড়ি ফেরার সময় সেলিমাবাদের কাছে দলবল নিয়ে তাঁর পথ আটকায় মেহেমুদ খান। ওই দলে মহেমুদ খানের অনুগত জামালপুর ব্লকের আঝাপুর অঞ্চলের ডাক্তার খ্যাত তৃণমূল নেতা প্রতাপ রক্ষিত সহ আরো অনেকে ছিলো ।
বিশ্বজিৎ পণ্ডিতের অভিযোগ,তাঁর পথ আটকে তাঁকে মেহেমুদ খান বলে,”অনেক দিন ধরে টাকা চাইছি তুই কোনো কথা শুনছিস না তোর কি এলাকাতে থাকার ইচ্ছে নেই? টাকা দে না হলে তোকে প্রাণে মেরে দেব“ । এই কথা বলেই মেহেমুদ খাঁন তাঁর পরণে থাকা পাঞ্জাবির পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে । সেই আগ্নেয়াস্ত্র তাঁর মাথায় ঠেকিয়ে মেহেমুদ খান বলে,’আমাকে টাকা না দিলে আমি তোকে ও তোর পরিবারের লোকজনকে খুন করবো’ । এই হুমকি দেওয়ার পর তাঁকে মারধর শুরু করে মেহেমুদ ও তাঁর দল বল।ওই সময়ে ওই পথে কিছু লোকজনকে আসতে দেখে তারা সবাই পালিয়ে যায়।
তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন,পরে নিজের ও পরিবারের কথা চিন্তা করে ঘটনার ২ দিন পর আরও ১ লক্ষ টাকা জোগাড় করে তিনি তাদের দেন। কিন্তু ওই টাকা পেয়েও তারা সন্তুষ্ট হয় না। বাকি টাকা আদায়ের জন্য তারা নানা ভাবে তাঁকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা সহ হুমকি দিয়ে চলে । বিশ্বজিৎ পণ্ডিতের দাবি অনুযায়ী,তৃণমূল রাজত্বে ভয়ে তিনি এই ঘটনা নিয়ে থানায় অভিযোগ জানানোর সাহস পাননি। তাই রাজ্যে পালা বদলের পর তিনি মেহেমুদ খান ও তাঁর দলবলের এই কুকীর্তির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন।
মেহেমুদ খাঁন ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি ব্লকের অন্য কোন তৃণমূল নেতা। তবে তৃণমূল জমানায় এলাকায় ঘটে যাওয়া সীমাহীন দুর্নীতি আর ত্রাসের রাজত্ব নিয়ে সরব হয়েছেন জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার। তিনি বলেন,’রাজ্যে পালা বদলের পর তৃণমূল নেতা মেহেমুদ খানের আসল স্বরুপ প্রকাশ্যে এসেছে। মেহেমুদ খান ও তাঁর দল বলের বিরুদ্ধে হুমকি, তোলাবাজি ও দুর্নীতির এক গুচ্ছ অভিযোগ ইতিমধ্যেই থানায় জমা পড়েছে। তারা মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সম্পদ ও অর্থ অত্মসাৎ করতেও পিছুপা হয় নি। মেহেমুদ খাঁন তৃণমূলের জামালপুর ব্লকের সভাপতি হওয়ার পর তিনি দামোদর থেকে বালি লুটের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন।’ মেহেমুদ খাঁন কি করে এত ধন-দৌলত ও সম্পতির অধিকারী হলেন তার তদন্ত ’ইডি’ কে দিয়ে যাতে করানো হয় সেই আর্জি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে রাখবেন বলে অরুণ হালদার জানিয়েছেন।।
