শ্রীমদ ভাগবত পুরাণের সারসংক্ষেপ মেলপাথুর নারায়ণ ভট্টথিরি রচিত নারায়ণীয়ং (Narayaneeyam) এর ১৭তম দশকে ‘ধ্রুব চরিতম’ বা ভক্ত ধ্রুবের উপাখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে। এই দশকে মোট ১১টি শ্লোক রয়েছে।
মূল সারসংক্ষেপ (ধ্রুব চরিত্র):
রাজা উত্তানপাদের দুই স্ত্রী ছিলেন— সুরুচি ও সুনীতি। রাজা সুরুচিকে বেশি ভালোবাসতেন। একদিন সুরুচির পুত্র উত্তম বাবার কোলে বসেছিল। সুনীতির ৫ বছর বয়সী পুত্র ধ্রুবও বাবার কোলে উঠতে গেলে বিমাতা সুরুচি তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। মনের দুঃখে ধ্রুব মা সুনীতির কাছে গেলে, মা তাকে ভগবান শ্রীহরির শরণাপন্ন হতে বলেন। বালক ধ্রুব বনে গিয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তার তীব্র ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শ্রীহরি তাকে দর্শন দেন এবং সর্বোচ্চ স্থান ‘ধ্রুবপদ’ (ধ্রুবতারা) দান করেন।
নারায়ণীয়ং দশক ১৭ -ধ্রুবচরিতম্
উত্তানপাদনৃপতের্মনুনংদনস্য
জায়া বভূব সুরুচির্নিতরামভীষ্টা ।
অন্যা সুনীতিরিতি ভর্তুরনাদৃতা সা
ত্বামেব নিত্যমগতিঃ শরণং গতাঽভূত্ ॥১॥
অংকে পিতুঃ সুরুচিপুত্রকমুত্তমং তং
দৃষ্ট্বা ধ্রুবঃ কিল সুনীতিসুতোঽধিরোক্ষ্যন্ ।
আচিক্ষিপে কিল শিশুঃ সুতরাং সুরুচ্যা
দুস্ সংত্যজা খলু ভবদ্বিমুখৈরসূয়া ॥২॥
ত্বন্মোহিতে পিতরি পশ্যতি দারবশ্যে
দূরং দুরুক্তিনিহতঃ স গতো নিজাংবাম্ ।
সাঽপি স্বকর্মগতিসংতরণায় পুংসাং
ত্বত্পাদমেব শরণং শিশবে শশংস ॥৩॥
আকর্ণ্য সোঽপি ভবদর্চননিশ্চিতাত্মা
মানী নিরেত্য় নগরাত্ কিল পংচবর্ষঃ ।
সংদৃষ্টনারদনিবেদিতমংত্রমার্গ-
স্ত্বামাররাধ তপসা মধুকাননাংতে ॥৪॥
তাতে বিষণ্ণহৃদয়ে নগরীং গতেন
শ্রীনারদেন পরিসাংত্বিতচিত্তবৃত্তৌ ।
বালস্ত্বদর্পিতমনাঃ ক্রমবর্ধিতেন
নিন্যে কঠোরতপসা কিল পংচমাসান্ ॥৫॥
তাবত্তপোবলনিরুচ্ছ্-বসিতে দিগংতে
দেবার্থিতস্ত্বমুদযত্করুণার্দ্রচেতাঃ ।
ত্বদ্রূপচিদ্রসনিলীনমতেঃ পুরস্তা-
দাবির্বভূবিথ বিভো গরুড়াধিরূঢঃ ॥৬॥
ত্বদ্দর্শনপ্রমদভারতরংগিতং তং
দৃগ্ভ্যাং নিমগ্নমিব রূপরসায়নে তে ।
তুষ্টূষমাণমবগম্য কপোলদেশে
সংস্পৃষ্টবানসি দরেণ তথাঽঽদরেণ ॥৭॥
তাবদ্বিবোধবিমলং প্রণুবংতমেন-
মাভাষথাস্ত্বমবগম্য তদীযভাবম্ ।
রাজ্য়ং চিরং সমনুভূয় ভজস্ব ভূয়ঃ
সর্বোত্তরং ধ্রুব পদং বিনিবৃত্তিহীনম্ ॥৮॥
ইত্য়ূচিষি ত্বয়ি গতে নৃপনংদনোঽসা-
বানংদিতাখিলজনো নগরীমুপেতঃ ।
রেমে চিরং ভবদনুগ্রহপূর্ণকাম-
স্তাতে গতে চ বনমাদৃতরাজ্যভারঃ ॥৯॥
যক্ষেণ দেব নিহতে পুনরুত্তমেঽস্মিন্
যক্ষৈঃ স যুদ্ধনিরতো বিরতো মনূক্ত্যা ।
শাংত্যা প্রসন্নহৃদয়াদ্ধনদাদুপেতা-
ত্ত্বদ্ভক্তিমেব সুদৃঢামবৃণোন্মহাত্মা ॥১০॥
অংতে ভবত্পুরুষনীতবিমানয়াতো
মাত্রা সমং ধ্রুবপদে মুদিতোঽয়মাস্তে ।
এবং স্বভৃত্যজনপালনলোলধীস্ত্বং
বাতালয়াধিপ নিরুংধি মমাময়ৌঘান্ ॥১১॥
নিচে নারায়ণীয়ং-এর ১৭তম দশকের আলোচনে ধ্রুব চরিত্রের প্রধান পর্বগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. বিমাতা সুরুচির দুর্ব্যবহার ও ধ্রুবের গৃহত্যাগ
মহারাজ উত্তানপাদের দুই স্ত্রী ছিলেন—সুনীতি ও সুরুচি। রাজা সুরুচিকে বেশি ভালোবাসতেন এবং সুনীতি ছিলেন উপেক্ষিতা। একদিন সুরুচির পুত্র উত্তম যখন পিতার কোলে বসে ছিল, তখন সুনীতির পুত্র ৫ বছর বয়সী ধ্রুবও পিতার কোলে ওঠার চেষ্টা করেন। এতে সুরুচি অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে ধ্রুবকে কঠোর ভাষায় অপমান করেন এবং বলেন যে, রাজার কোলে বসতে হলে তাকে ভগবানের আরাধনা করে সুরুচির গর্ভে পুনর্জন্ম নিতে হবে। রাজা উত্তানপাদ সুরুচির প্রতি আসক্ত থাকায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। এই অপমানে ব্যথিত হয়ে শিশু ধ্রুব মা সুনীতির কাছে যান। মা সুনীতি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, একমাত্র ভগবান শ্রীহরিই পারেন তার দুঃখ দূর করতে। মায়ের কথা শুনে ধ্রুব গৃহত্যাগ করে বনের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
২. নারদ মুনির উপদেশ ও কঠোর তপস্যা
বনের পথে ধ্রুবের সাথে দেবর্ষি নারদের সাক্ষাৎ হয়। নারদের উপদেশে ধ্রুব যমুনার তীরে ‘মধুresource বন’-এ গিয়ে তপস্যা শুরু করেন। দেবর্ষি তাকে “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ধ্রুব এমন কঠোর তপস্যা শুরু করেন যা সাধারণের কল্পনাতীত। পঞ্চম মাসে এসে তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ণ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন হন। ধ্রুবের প্রাণায়াম ও তীব্র তপস্যার প্রভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জীবের শ্বাস রুদ্ধ হতে শুরু করে এবং দেবতারা ভীত হয়ে ভগবানের শরণাপন্ন হন।
৩. ভগবানের দর্শন ও স্তুতি
দেবতাদের আকুল প্রার্থনায় দয়ার্দ্রচিত্ত হয়ে ভগবান শ্রীহরি গরুড়বাহনে চড়ে ধ্রুবের সামনে আবির্ভূত হন। ভগবানের সেই জ্যোতির্ময় রূপ দেখে ধ্রুব পরমানন্দে মগ্ন হয়ে যান। তিনি ভগবানকে স্তুতি করতে চাইলেও বালসুলভ অজ্ঞতার কারণে ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন ভক্তবৎসল ভগবান তাঁর হাতের ‘পাঞ্চজন্য’ শঙ্খ দিয়ে ধ্রুবের গাল স্পর্শ করেন। এই দিব্য স্পর্শে ধ্রুবের অন্তরে পরম জ্ঞানের উদয় হয় এবং তিনি ভগবানের এক অপূর্ব স্তুতি গান করেন।
৪. বরদান ও ‘ধ্রুবপদ’ লাভ
ভগবান ধ্রুবের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে এক অনন্য বর প্রদান করেন। তিনি ধ্রুবকে বলেন যে, পৃথিবীতে দীর্ঘকাল ন্যায়পরায়ণতার সাথে রাজ্য শাসন করার পর তিনি এমন এক শাশ্বত পরম ধাম লাভ করবেন, যা প্রলয়কালেও ধ্বংস হয় না—যা আজ মহাকাশে ‘ধ্রুবতারা’ বা ধ্রুবলোক (Dhruvapadam) নামে পরিচিত।
৫. রাজ্যে প্রত্যাবর্তন ও জীবনের পরবর্তী অধ্যায়
ভগবানের নির্দেশ মেনে ধ্রুব রাজ্যে ফিরে আসেন। রাজা উত্তানপাদ অনুতপ্ত হয়ে ধ্রুবকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ধ্রুবের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে নিজে বনে গমন করেন। রাজ্য পরিচালনার সময় ধ্রুবের ভাই উত্তম যক্ষদের হাতে নিহত হলে ধ্রুব যক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে স্বায়ম্ভুব মনুর উপদেশে তিনি যুদ্ধ পরিত্যাগ করেন। তাঁর এই সংযমে সন্তুষ্ট হয়ে যক্ষরাজ কুবের তাঁকে বর দিতে চাইলে মহাত্মা ধ্রুব জাগতিক কোনো সুখ না চেয়ে কেবল ভগবানের প্রতি অটুট ভক্তি প্রার্থনা করেন। অবশেষে, আয়ুর শেষে ধ্রুব তাঁর মাতা সুনীতিসহ দিব্য বিমানে চড়ে চিরস্থায়ী ধ্রুবলোকে গমন করেন।
শ্রী মেলপুত্তুর ভট্টথিরির প্রার্থনা
দশকের শেষ শ্লোকে কবি ভট্টথিরি গুরুভায়ুরাপ্পার (শ্রীকৃষ্ণ) কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়েছেন যে, যেভাবে তিনি ধ্রুবের মতো এক শিশুকে তাঁর পরম কৃপায় ধ্রুবপদ দান করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই যেন তাঁর (ভট্টথিরির) শরীরের সমস্ত রোগ-ব্যাধি ও কষ্ট দূর করে তাঁকে রোগমুক্ত করেন।
