এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,২৯ সেপ্টেম্বর : বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ভরা বাজারে বিমান হামলা চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী । এই হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন । আহত হয়েছে আরও ৩৬ জন ৷ মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের কিয়াউকতাও শহরের একটি স্থানীয় বাজারের কাছে সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় এই হামলা হয় । একটি যুদ্ধবিমান থেকে পরপর দুটি বোমা নিক্ষেপ করা হয় । এতে বিক্রেতা, ক্রেতা ও পথচারীসহ ৩৩ জন নিহত হন। আরাকান আর্মি জানিয়েছে যে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে । রাখাইনের উদ্ধারকাজের দায়িত্বে থাকা এক বরিষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াই হুন অং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বার্তা সংস্থাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বাজারটি ছিল ওই অঞ্চলের প্রধান পাইকারি কেনাবেচার কেন্দ্র, যেখানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আসতেন।২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক সরকারের গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চালানো ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। ওয়াই হুন অং বলেন,“রাখাইনে চালানো বিমান হামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম ভয়াবহ।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, বিভিন্ন ভবনে আগুন জ্বলছে, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নিকটবর্তী একটি সেতুর কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি; তবে অতীতে তারা দাবি করেছে যে তারা কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর দায়ে অভিযুক্ত করেছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিয়ানমার সংঘাতের কবলে পড়েছে। এরপর দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন সামরিক সরকার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র জাতিগত ও গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যকার গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
মিয়ানমারের প্রাক্তন সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং-কে গত এপ্রিলে সেনাবাহিনী-সমর্থিত পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে; এর মধ্য দিয়ে পাঁচ বছরের সামরিক শাসনের পর ক্ষমতার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হয়। ‘আরো একটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা রাখাইনের জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য স্বায়ত্তশাসন অর্জনের লক্ষ্যে লড়াই করছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তারা একটি সামরিক অভিযান শুরু করে এবং তখন থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সদর দপ্তরসহ রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়েছে। রাখাইনে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে সামরিক বাহিনী সেখানে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের পথগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে খাদ্য সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ডিসেম্বর মাসে রাখাইনের ম্রাউক-ইউ (Mrauk U) টাউনশিপের একটি হাসপাতালে সামরিক বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং ৭০ জন আহত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতের ফলে রাখাইনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আগস্ট মাসে জাতিসংঘ জানায় যে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি “সর্বনিম্ন পর্যায়ে” নেমে গেছে; সংস্থাটি এক্ষেত্রে “রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বর নির্যাতন” এবং বিরল খনিজ পদার্থের অবৈধ উত্তোলনসহ বিভিন্ন বেআইনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে। যদিও ইসলামপন্থী ওই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের বর্বরতা নিয়ে নিরব ।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনী—উভয় পক্ষই এখন ড্রোন ব্যবহার করছে। ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’ (ACLED) প্রকল্পের তথ্যমতে, এই সংঘাতে এ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।।

