এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,০৫ মে : পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী থাকল রাজ্য। দুই শতাধিক আসনে জিতে বিজেপি এখন পরবর্তী ৫ বছর রাজ্যের শাসনক্ষমতার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত । গেরুয়া ঝড়ের ঝাপটায় নিজের ঘরের মাঠ হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর কেন্দ্রেও শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জিকে । কিন্তু তিনি এই পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না । আজ মঙ্গলবার কালীঘাটের বাড়ি থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কিছুতেই পদত্যাগ করবেন না ৷ তিনি বলেন,’আমরা কিন্তু হারিনি । আমাদের ১০০ সিট জোর করে লুট করা হয়েছে ।’ তিনি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক-কে “ভিলেন” আখ্যা দিয়ে “মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার” অভিযোগ তুলে বলেছেন,’আমি পদত্যাগ করব না ।’
গতকাল পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পরেও মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দেননি । এদিকে আজ ৫ মে তার সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৷ কিন্তু মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, এই রাজ্যের জনাদেশ তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যায়নি। আর সেই কারণেই তাঁর আর তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের ইস্তফা দেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। মমতা ব্যানার্জি, অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে এদিন সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্য়ায়, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ডেকের ও’ব্রায়ন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা।
মমতার অভিযোগ সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ভোট গণনা কেন্দ্রে তাঁর ও তাঁর দলের এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ‘ভিতরে ওরা আমার পেটে লাথি মেরেছে। পিছনে লাথি মেরেছে। সিসিটিভি বন্ধ ছিল।’ মমতা বলেন,’আমি ১৩ হাজার ভোটে লিড করছিলাম, ৩২ হাজারের বেশি লিড পাওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে ওরা সব ভেঙে দিয়েছে। এটা শুনেই আমি গেলাম। জগুবাজারের কাছে আমার গাড়ি আটকাল। বলল যেতে দেবে না। লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।’
তিনি বলেন,’এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল কমিশন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী -এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মমতা আরও জানান, এখনই তিনি পদত্যাগ করেননি। বলেন,’কেন পদত্যাগ করব? জোর করে ভোট লুঠ করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’
তিনি বলেন,’২০০৪ সালেও এমন জিনিস দেখিনি। ১৯৭২-এর সন্ত্রাসের কথা শুনেছি, কিন্তু এই সরকার সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করেছে, তারাই আসল ভিলেন।’ ভোটের আগে ষড়যন্ত্র করে অফিসার বদল এবং কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি তোপ দাগেন। মমতা বলেন,‘এত দিন আমি চেয়ারে ছিলাম। অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ। সাধারণ মানুষ। আর সহ্য করব না। সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমি রাস্তার লোক। রাস্তায় ছিলাম, রাস্তায় থাকব।’
তিনি বলেন,’বলেন,’সোনিয়া জি, রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উদ্ধব ঠাকরে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, হেমন্ত সোরেন আমাকে ফোন করেছিলেন। ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সের সমস্ত মিত্ররা আমাকে বলেছেন যে তাঁরা সম্পূর্ণ এবং পুরোপুরি আমার সঙ্গে আছেন। আমি মনে করি, আগামী দিনগুলিতে আমাদের সংহতি ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী থাকবে। অখিলেশ আমাকে অনুরোধ করেছিল যে সে আজই আসতে পারে কিনা, কিন্তু আমি তাকে আগামীকাল আসতে বলেছি। তাই, সে আগামীকাল আসবে। একে একে সবাই আসবে। আমার লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। আমি একজন সাধারণ মানুষের মতো ইন্ডিয়া টিমকে শক্তিশালী করব ।’
মমতা ব্যানার্জি বলেছেন,’আমার এখন কোনো চেয়ার নেই, তাই আমি একজন সাধারণ মানুষ। সুতরাং, আপনারা আমাকে বলতে পারেন না যে আমি আপনাদের চেয়ার ব্যবহার করছি। আমি এখন মুক্ত পাখি। আমি আমার পুরো জীবন মানুষের সেবায় দিয়েছি, এমনকি এই ১৫ বছরেও আমি এক পয়সাও পেনশন তুলিনি। আমি এক পয়সাও বেতন নিচ্ছি না। কিন্তু এখন, আমি মুক্ত পাখি।’
দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূল সুপ্রিমোর মন্তব্য,’কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, বিচারব্যবস্থা নেই, কেন্দ্রীয় সরকার এক দলের শাসন চায়—তখন গণতন্ত্র কোথায় যাবে?’ সব মিলিয়ে পরাজয়ের পর পদত্যাগ নয়, বরং আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মেজাজেই ধরা দিলেন তৃণমূল নেত্রী।।
