শ্যামসুন্দর ঘোষ,মন্তেশ্বর(পূর্ব বর্ধমান),২২ অক্টোবর : পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর দামোদর পাড়া অনাথ আশ্রমে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন রাজ্যের প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ । মাটির প্রতিমায় পুজোর পাশাপাশি আশ্রমের শিশুদের নিয়ে আয়োজন করা হতো জীবন্ত দুর্গাপুজোরও। পুজোর বিভিন্ন দিনে আশ্রমে হাজির হতেন জেলাশাসক, পুলিশ সুপার-সহ প্রশাসনের আধিকারিক, শিল্পপতি এবং এলাকার বহু মানুষ। অনাথ শিশুদের ঘিরে এই পুজো ধীরে ধীরে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর এই প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়নি ওই অনাথ আশ্রমে । ফলে আশ্রমের অসহায় শিশুদের খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল । তাদের সেই আক্ষেপ কিছুটা দূর করার চেষ্টা করলেন মন্তেশ্বরের এক পরিবার । বুধবার বিজয়া দশমীর দিন পরিবারটির পক্ষে থেকে তুলে দেওয়া হল নতুন পোশাক,আতসবাজি ও বাড়িতে বানানো নারকেলের নাড়ু । দুর্গাপুজো না হওয়ার মনখারাপের মাঝেই কিছুটা খুশির ঝিলিক দেখা গেল ওই সমস্ত অসহায় শিশুগুলোর চোখে মুখে ।
এই মানবিক উদ্যোগটি নিয়েছেন মন্তেশ্বর থানার বামুনপাড়া পঞ্চায়েতের শাহাজাদপুরের বাসিন্দা পরিতোষ ঘোষ । তিনি জানান,সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমে এবার দুর্গাপুজো হচ্ছে না। গত ছয় বছর ধরে এই আশ্রমে দুর্গাপুজো হত। কচিকাঁচারা জীবন্ত দুর্গা সেজে আনন্দে মেতে উঠত। এবার পুজো না হওয়ায় মন খারাপ ছিল আশ্রমের আবাসিকদের।এরপর বাবা তপন ঘোষ ও মা শিখা ঘোষের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আশ্রমের শিশু ও মায়েদের হাতে তুলে দেবেন নতুন জামাকাপড়।
সেই মতো অষ্টমীর দিন আশ্রমের পরিচালক সমর মুখার্জির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন পরিতোষবাবু। এরপর কেনা হয় নতুন জামাকাপড়। কিন্তু নবমীর সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন পরিতোষ ঘোষ। তাঁকে ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে। তবুও তাঁদের উদ্যোগ থেমে থাকেনি।অবশেষে বুধবার বিজয়া দশমীর সকালেই ব্যাগভর্তি নতুন জামাকাপড়, রংমশাল এবং বাড়িতে তৈরি নারকেল নাড়ু নিয়ে দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমে হাজির হন তাঁরা।এক এক করে আশ্রমের আবাসিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন জামাকাপড়। আর নিজের হাতে তৈরি নারকেল নাড়ু শিশুদের খাইয়ে দেন শিখাদেবী।নতুন পোশাক হাতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে কচিকাঁচারা। জ্বলে ওঠে রংমশাল। আনন্দে ভরে ওঠে আশ্রমের পরিবেশ। যে শিশুদের মনে পুজো না হওয়ার কষ্ট ছিল, তাদের মুখেই ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি।
জানা গেছে,তপন ঘোষ পেশায় দুধ ও ছানার ব্যবসায়ী। ছেলে পরিতোষও বাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দিল, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় আয়োজন নয়, প্রয়োজন একটি সুন্দর মন। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায় তাঁদের সঙ্গে, যাঁদের জীবনে আনন্দের অভাব রয়েছে।দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমের কচিকাঁচাদের এই হাসি শুধু একটি পরিবারের উদ্যোগের গল্প নয়, এ যেন মানবিকতার এক সুন্দর ছবি।আশ্রমের ম্যানেজার সমীর মুখার্জি বলেন,’নতুন জামাকাপড় হয়তো একদিনের উপহার, কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যায় আজীবন।’।

