ভাগ্য বদল আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার নারী শ্রমিক পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলিতে, যার সিংহভাগেরই গন্তব্য সৌদি আরব। দেশগুলি স্বজাতীয় অধ্যুষিত হওয়ায় বাংলাদেশি মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাস একটি বেশিই থাকে । কিন্তু সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পরেই তাদের সেই ভ্রম কেটে যায় । রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রার এই চকচকে চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জঘন্য ও অন্ধকার বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে চরম হেনস্তা, প্রতারণা, শারীরিক- মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ৮০ হাজার নারী কর্মী শূন্য হাতে দেশে ফিরে এসেছেন । আরও চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে ৮০০ জনেরও বেশি নারীর মৃতদেহ কফিনে চড়ে দেশে ফিরেছে।
নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে নাজমার ঘটনাও রয়েছে, যিনি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একজন স্থানীয় পাচারকারীর মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবর্তে, তাকে গৃহকর্মে বাধ্য করা হয়, যেখানে তিনি যৌন নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের অত্যাচারের শিকার হন। তার পরিবারের ভাষ্যমতে, এই অমানবিক আচরণের ফলেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ৫৩ দিন পর মৃতদেহ বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। আরও বেশ কয়েকজন মৃত নারীর আত্মীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, বিদেশে আটকা পড়ে পালানোর কোনো উপায় না থাকায় তাদের প্রিয়জনদের ওপর চালানো মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে।
স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, বিনিময়ে বন্দিজীবন ও দাসত্ব :
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সাথে গৃহকর্মী আমদানির চুক্তি হওয়ার পর থেকে নারী কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, দালালের খপ্পরে পড়ে ভালো বেতনের আশায় যাওয়া এই নারীদের একটি বড় অংশই সেখানে গিয়ে আধুনিক যুগের দাসত্বের মুখোমুখি হন।
ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগ, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরপরই নিয়োগকর্তারা বা স্থানীয় এজেন্টরা তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। ফলে তারা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাদের ওপর চলে একটানা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করানো, নিয়মিত খাবার না দেওয়া এবং পারিশ্রমিক আটকে রাখার মতো অমানবিক আচরণ।
জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন ও পতিতাবৃত্তি :
বাংলাদেশে ফিরে আসা নারীদের জবানবন্দি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে পূর্বে স্বীকার করা হয়েছে যে, ফিরে আসা নারী গৃহকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার।অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, সরল সোজা নারীদের বাসাবাড়িতে কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় অপরাধী চক্রের মাধ্যমে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকে যখন বাংলাদেশ দূতাবাস বা সেফ হোমে আশ্রয় নিতে পালানোর চেষ্টা করেন, তখন নিয়োগকর্তারা উল্টো তাদের বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। এমনকি অনেক নারী চরম নির্যাতনের ফলে গর্ভবতী অবস্থায় বা তীব্র মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরছেন।
মৃতদেহের মিছিল ও আত্মহত্যার প্রবণতা:
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে মৃতদেহের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত আট বছরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৭৯৯ থেকে ৮০০ জন নারী শ্রমিকের লাশ বাংলাদেশে এসেছে, যার একটি বড় অংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্ট্রোক বা স্বাভাবিক মৃত্যু দেখানো হলেও মানবাধিকার কর্মীরা একে ‘হত্যাকাণ্ড’ বা ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু’ বলে দাবি করছেন।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ডেটা অনুযায়ী, প্রবাসে নারী শ্রমিকদের আত্মহত্যার প্রায় ৭৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে সৌদি আরবে। অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং দেশে ফেরার কোনো পথ না পেয়ে এই অসহায় নারীরা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
একটি মর্মান্তিক নতুন প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের ভয়াবহ মানবিক মূল্য উন্মোচিত হয়েছে। গত সাত বছরে প্রায় ৮০,০০০ নারী শ্রমিককে প্রধানত সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, যারা যৌন নির্যাতন, পাচার এবং অনেক নথিভুক্ত ক্ষেত্রে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়ার পর দেশে ফিরে এসেছেন। একই সময়ে বিদেশ থেকে ৮০০ নারীর মৃতদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বৈধ গৃহকর্মের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া অনেক নারীকে সংগঠিত প্রতারণা চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত করা হয়েছিল—যার মধ্যে একটি চক্র কথিতভাবে একটি টিস্যু কোম্পানির আড়ালে পরিচালিত হতো—এবং নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
স্থানীয় দালাল ও পাচারকারীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই চক্রটি পরিচালিত হতো, যা বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সংকটের ব্যাপকতা এমন একটি ব্যবস্থার প্রতিফলন, যা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী নারীকে উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশে পাঠিয়েছে, কিন্তু তাদের অনেকেই পরিবর্তে যৌন শোষণের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো স্থগিত করার পর, ২০১৫ সালে গৃহকর্মী নিয়োগের জন্য সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে একটি শ্রম চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে আনুমানিক ৩ লক্ষ বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মের জন্য সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের পেছনের মানবিক মূল্য মর্মান্তিক।
রাষ্ট্রীয় নীতি ও বিচারহীনতার সংকট:
বিশেষজ্ঞ এবং অভিবাসন খাতের গবেষকরা তীব্র সমালোচনা করে বলছেন যে, রাষ্ট্র সবসময় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব রাখলেও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন।‘রেমিট্যান্স-ফার্স্ট’ বা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়ার এই কূটনীতির কারণে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশ সরকার শক্ত কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ বা কঠোর নিয়ম করলেও বাংলাদেশ এখনো সস্তা শ্রম রপ্তানি করে যাচ্ছে। আরবের এই আধুনিক দাসপ্রথার শিকার হয়ে কত হাজারো নারীর জীবন চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তার কোনো সঠিক বিচার বা প্রতিকার আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।।
