শ্যামসুন্দর ঘোষ,বর্ধমান,০২ আগস্ট : বর্ধমান শহরে রেনেসাঁ টাউনশিপের রোহিনি অ্যাপার্টমেন্টে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া পাকিস্তান কেন্দ্রিক জইশ-ই -মোহাম্মদ (Jaish- e-Mohammed) সন্ত্রাসী হামিম মণ্ডলের মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অর্পিতা সরকারকে গ্রেপ্তার করে জেরার পর বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচন করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)।গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে এসটিএফ জানিয়েছে, পাকিস্তান কেন্দ্রিক এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ‘হিট লিস্ট’-এ ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দিল্লির জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলাকালীন নাশকতার ছক করেছিল এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কটি । এজন্য পুলিশের উর্দি জোগাড় করারও পরিকল্পনা হামিদ-অর্পিতা । এই তথ্য সামনে এনে স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর আইজি গৌরব শর্মা জানান, হামিদ ও অর্পিতার কাছে এই সমস্ত নির্দেশ আসছিল পাকিস্তানি হ্যান্ডেলারদের কাছ থেকে ।
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি উত্তর হাওড়ার বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী উমেশ রায়ের পুত্রকে অপহরণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই এই সন্ত্রাসী চক্রের সন্ধান পায় এসটিএফ। আইজি গৌরব বলেন, ‘কয়েক দিন আগেই খবর আসে, হাওড়ার এক সিনিয়র রাজনীতিকের থেকে টাকা তোলার, তাঁর ছেলেকে ‘হানিট্র্যাপ’ করে অপহরণ করার পরিকল্পনা হচ্ছে। এর সঙ্গে একটি সংগঠন জড়িত বলে খবর আসে। সেই সূত্র ধরে সাহেবগঞ্জের একটি (সমাজমাধ্যম) হ্যান্ডলের দিকে সন্দেহ যায়। হ্যান্ডলটি ছিল অর্পিতা সরকারের।’ পরে অর্পিতার সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলের সূত্র ধরে খোঁজ মেলে হামিমের। এসটিএফ-এর আইজি জানান, গত চার বছর ধরে অর্পিতার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে হামিমের। প্রথমে ইনস্টাগ্রামে যোগাযোগ হয়। পরে দেখাও করেন তাঁরা। হামিম এবং অর্পিতার মধ্যে ‘অ্যাফেয়ার’ ছিল । তদন্তকারীদের দাবি, গত কয়েক মাসে অর্পিতার মাধ্যমে হামিম বিভিন্ন ভাবে জাল ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
এসটিএফ আইজি গৌরব শর্মা জানান,হামিমকে জেরা করে তদন্তকারীরা আরও বেশ কয়েকটি হ্যান্ডলের সন্ধান পান— যেমন, ‘রাণা’, ‘উজ়েইর’, ‘আবিদ জাট৩৩৩’, ‘হামাদ’। সবগুলিই পাকিস্তানি হ্যান্ডল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গত দুই-তিন মাস ধরে এই হ্যান্ডলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে হামিমের। প্রথমে ইনস্টাগ্রামে ফলো করতে শুরু করেন। তার পরে হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামেও যোগাযোগ হয়।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই হ্যান্ডলগুলি পাকিস্তানি গ্যাংস্টার শাহজ়াদ ভট্টির দুষ্কৃতীদলের সঙ্গে যুক্ত। এগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন মৌলবাদী প্রচার করা হত এবং তরুণদের ‘টার্গেট’ করা হত। পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন ‘এনক্রিপ্টেড চ্যাটের’ মাধ্যমে হামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হত। পাকিস্তানি ওই হ্যান্ডলগুলি ব্রিটেন এবং মেক্সিকোর সিম কার্ডও ব্যবহার করত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এসটিএফের আইজি জানান, পাকিস্তানি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি মুখ্যমন্ত্রীকেও ‘টার্গেট’ করার ছক কষেছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর গতিবিধির উপর নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হামিমের উপরে। মুখ্যমন্ত্রী কোথাও ‘আনগার্ডেড’ থাকতে পারেন কি না, এমন সম্ভাব্য জায়গাগুলির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁর উপরে। আইজি বলেন, ‘দিল্লিতে যন্তর মন্তরে সম্প্রতি যে ছাত্রবিক্ষোভ হল, সেখানেও কোনও ভাবে পুলিশের উর্দি জোগাড় করে নাশকতা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তা ছাড়া কয়েক জন পুলিশ আধিকারিক এবং রাজনীতিককে ‘টার্গেট’ করা হচ্ছিল।’
জানা গেছে,অর্পিতা সরকারের বাড়ি ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ এলাকায় ৷ মামার বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়া এলাকায় । মাঝেমধ্যে মামার বাড়িতে যাতায়াত করতেন অর্পিতা । তখন দেখা হত হামিমের সঙ্গেও। ধৃত সন্ত্রাসী হামিম মণ্ডল একসময় হাওড়ার পিলখানা এলাকায় ভাড়া থাকত এবং সেখানে একটি গেঞ্জি কারখানায় কাজ করত। পরে সে বর্ধমানের অভিজাত এলাকা রেনেসাঁ টাউনশিপের রোহিনি অ্যাপার্টমেন্টে বাবা,মা ও তিন ভাইবোন মিলে বসবাস করছিল । তবে অর্পিতার মগজধোলাই করে এই চক্রে যুক্ত করা হয়েছিল, না কি তিনি কোনও আর্থিক সুবিধা পেতেন চক্রের থেকে— তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট নয়।
এসটিএফ সূত্রের দাবি, অর্পিতা সরকারের একটি নিজস্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা রয়েছে এবং তিনি পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। এই পেশার সুবাদে বিভিন্ন প্রভাবশালী ও ভিভিআইপি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান। সেই সম্ভাব্য যোগাযোগগুলিও এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, পাকিস্তান থেকে হানিট্র্যাপের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অপহরণের নির্দেশ অর্পিতার কাছে পৌঁছাত বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাইয়ের কাজ এখনও চলছে।তদন্তে আরও জানা গেছে, তথ্য আদান-প্রদানের জন্য অর্পিতা তার iPhone 16 Pro-তে ‘Element X’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করতেন। Matrix প্রোটোকলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ওপেন-সোর্স অ্যাপটি নিরাপদ মেসেজিং ও ভিডিও কলের সুবিধা দেয়।
তদন্তকারীরা বর্তমানে তার মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখছেন, অ্যাপটির মাধ্যমে কার সঙ্গে, কী ধরনের এবং কী উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করা হয়েছিল। শনিবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে বর্ধমান জেলা আদালতে পেশ করা হয় ধৃত জইশ সন্ত্রাসী হামিদ মন্ডলের সঙ্গিনী অর্পিতাকে । পুলিশের আবেদন মেনে তাকে ১৩ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক । অন্যদিকে ইতিমধ্যেই ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে আছে হামিদ । দু’জনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হতে পারে বলে এসটিএফ সূত্রের খবর ।।
