শ্যামসুন্দর ঘোষ,মন্তেশ্বর(পূর্ব বর্ধমান),৩০ সেপ্টেম্বর : জামায়াতে উল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র শাখা সংগঠন “ইমাম মাহমুদর কাফিলা”(আইএমকে) – র সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র এবং উগ্রবাদে দীক্ষিত করার একটি মামলার তদন্তে জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) মঙ্গলবার আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলা জুড়ে ১৬টি স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে । এই ১৬টি স্থানের মধ্যে ১০টি আসামে, পাঁচটি পশ্চিমবঙ্গে এবং একটি কেরালায় অবস্থিত । আইএমকে দ্বারা পরিচালিত সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ১১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন সংস্থা অভিযোগ দায়ের করার তিন মাস পর এই পদক্ষেপটি নেওয়া হলো। একটি সন্দেহভাজন জিহাদি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমান, ইয়াকুব আলী, রাকিবুল ইসলাম, জাকির হোসেন, চানবার আলী এবং ফারুক আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই তল্লাশি চালানো হয়। তার মধ্যে পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার পালিশগ্রামের একটি মসজিদের ইমাম পেয়ার মহম্মদ সেখ (৬০)কে জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ মঙ্গলবার ভোরে গ্রেপ্তার করেছে। তার বাড়ি মন্তেশ্বর থানার কুলুট গ্রামে ।
খাগড়াগড় বিস্ফোরণে পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের যোগসূত্র পাওয়ার পর ফের সন্ত্রাসী যোগ সন্দেহে ওই এলাকার একটি মসজিদের ইমাম গ্রেপ্তার হওয়ায় তোলপাড় পড়ে গেছে জেলা জুড়ে । যদিও এই বিষয়ে মুখ খোলেনি ধৃত ইমামের পরিবার৷ তবে তার এক ছেলে সাংবাদিকদের বলেন,’আমার আব্বা ভালো মানুষ বলে জানি । এর অতিরিক্ত আমি সংবাদ মাধ্যমকে কিছু বলবো না ।’
পূর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর থানার কুলুট গ্রামে বাড়ি জঙ্গি যোগ সন্দেহে ধৃত ইমাম পেয়ার মহম্মদ সেখের । তার বাবা সাহাবান শেখ । মা সাহানারা বিবি । পিয়ার মহম্মদ শেখের আদি বাড়ি কাটোয়া থানার বাঁধমুরা গ্রামে৷ বাবার সঙ্গে অশান্তি হওয়ার কারণে মন্তেশ্বরের সোনাডাঙ্গা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে দীর্ঘ পাঁচ বছর বসবাস করেন । এরপর মন্তেশ্বরের কুলুট গ্রামে জায়গা কিনে সেখানে বাড়িঘর করে স্ত্রী সহ চার ছেলে দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন । মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে । তার চার ছেলে হলেন : মুসমদ সেখ, সারমদ সেখ,মাহাবাব সেখ এবং মিজানুর রহমান সেখ । মঙ্গলকোটের পালিশগ্রাম পূর্বপাড়া মসজিদে প্রায় তিন বছর ধরে ইমানের কাজ করছিলেন পিয়ার মহম্মদ সেখ।
মন্তেশ্বরের কুলুট গ্রামের একপ্রান্তে পিয়ার মহম্মদ সেখের বাড়ি । মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেল ঝাঁ চকচকে সদ্য রঙ করা একতলা বাড়ি । বাড়ির সামনে দাঁড় করানো কুসুমগ্রামের একটি ইংরাজি মাধ্যম বেসরকারি স্কুলের পোস্টার লাগানো মারুতি ভ্যান ৷ সাংবাদিকরা বাড়ির সামনে গেলে ধৃত পিয়ার মহম্মদ সেখের দুই ছেলে বেরিয়ে আসেন । তাদের বাবার গ্রেপ্তারির প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি পরা একজন বলেন,’আমরা এই বিষয়ে কিছুই জানিনা । আমাদের আব্বা বাইরে থাকেন । এটুকু জানি, আমাদের আব্বা ভালো লোক।’
তবে পিয়ার মহম্মদ সেখের পরিবার যাইই দাবি করুন না কেন, মামলাটা অত্যন্ত গুরুতর । জামায়াতে উল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র শাখা সংগঠন ইমাম মাহমুদর কাফিলা (আইএমকে)-র বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র এবং উগ্রবাদে দীক্ষিত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে । গুয়াহাটির এনআইএ বিশেষ আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে ১১ জন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩ এবং বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ১৯৬৭-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়।এনআইএ-র তদন্তে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম ও ত্রিপুরা সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে সন্ত্রাসী মতাদর্শ বিস্তারের আইএমকে-র ষড়যন্ত্রে অভিযুক্তদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রকাশ পেয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সন্ত্রাসী সংগঠনটির চরমপন্থী কর্মসূচির প্রচার, দরিদ্র মুসলিম তরুণদের উগ্রপন্থী করে তোলা এবং ভারতে সংগঠনটির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা ।
সংস্থাটি সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনা পুলিশের দায়ের করা একটি মামলা গ্রহণ করেছে। মামলাটি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সংগঠনটির আদর্শ ছড়ানো, যুবকদের উগ্রপন্থী বানানো এবং ক্যাডার নিয়োগের জন্য AQIS-এর একটি কথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত।
এই মামলায় এনআইএ ১৯ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দুই বাসিন্দার সঙ্গে একিউআইএস-এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তারা হল দক্ষিণ দিনাজপুরের আব্দুর রকিব সরকার ওরফে হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিন ও কলকাতার কাজী আহসান উল্লাহ ওরফে হাসান। আসামের বরপেটার আজাদ নগর ও নিচুকা এলাকায় এনআইএ একাধিক স্থানে তল্লাশি চালিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুস্তাফিজুর রহমান ও ইয়াকুব আলী নামে দুই সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। এই অভিযান চলাকালে বেশ কিছু আপত্তিকর নথিও বাজেয়াপ্ত জব্দ করা হয়।
মঙ্গলবার ভোরে মঙ্গলকোট থানার পুলিশ বাহিনী সঙ্গে নিয়ে এনআইএ-এর চারজনের একটি দল মসজিদ থেকে ডেকে পিয়ার মহম্মদ সেখকে আটক করে । তারপর মসজিদের যে ঘরে ওই ইমাম থাকত সেই ঘরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় । সেখান থেকে একটি ডাইরি এবং মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করে এনআইএ । সূত্রের খবর, তার মোবাইল ফোনে একাধিক বাংলাদেশি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে এবং এনআইএ কর্মকর্তারা তার পাসপোর্টের বিবরণ খতিয়ে দেখছেন যে তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন কি না। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা টানা ৪০ দিন বাংলাদেশে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে । তদন্তকারীরা তার বাংলাদেশ ভ্রমণের ইতিহাস এবং বিভিন্ন ফোন নম্বরে তার যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন।
এনআইএ সূত্রে জানা গেছে, পিয়ার মহম্মদ সেখের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন, একটি ডায়েরি, বেশ কিছু নথি এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে আসাম- ভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট সংগঠন সম্পর্কিত নথি রয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে এই নথি এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর সাথে নিষিদ্ধ বা জঙ্গি সংগঠনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। আজ বুধবার পেয়ার মহম্মদ সেখকে কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতে হাজির করা হবে ।
আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে,পেয়ার মহম্মদ সেখকে গ্রেপ্তারের অব্যবহিত পরেই মঙ্গলকোট থানায় হাজির হয়ে যায় তার এক আইনজীবী কাজি সাবাবজ্জামান । তিনি জানান, পেয়ার মহম্মদ সেখের একজন ছেলে তাকে বিষয়টি জানালে তিনি আইনি সহায়তা দিতে থানায় এসেছেন। তবে জঙ্গি যোগের অভিযোগে পেয়ার মহম্মদের গ্রেপ্তারি নিছক সন্দেহের বশে করা হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন ।।

