মিশরের রাজধানী কায়রোতে ‘আল-আরাফা’ নামে একটি কবরস্থান আছে, ইংরেজিতে যাকে ‘The City of the Dead’ বলা হয়।এই সমাধিক্ষেত্রে একজনমাত্র ভারতীয় সমাহিত আছেন, এই মানুষটির নাম ছিল সৈয়দ হোসেন, যিনি ১৮৮৮ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনী ‘কায়রোতে এক বিস্মৃত রাষ্ট্রদূত: সৈয়দ হুসেনের জীবন ও সময়কাল’-এ এন. এস. বিনোদ লিখেছেন, “সৈয়দ ছিলেন তাঁর সময়ের একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয়, বিদ্বান ও সংস্কৃতিবান ব্যক্তি, যাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে শ্রোতাদের মুগ্ধ করার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ লেখক এবং একজন ধর্মনিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক।”
কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না যে এই সৈয়দ হুসেন ছিলেন জহরলাল নেহেরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের প্রেমিক ও প্রথম স্বামী । বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত আলোচিত এবং স্পর্শকাতর অধ্যায় ছিল। এটি ছিল এক গভীর ভালোবাসা, পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা এবং শেষ পর্যন্ত এক বেদনাদায়ক বিচ্ছেদের গল্প।
বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর প্রথমে সৈয়দ হুসেনকে বিয়ে করেন । এলাহাবাদের একটি মসজিদে শহরের কাজী তাঁকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেন। কিন্তু তাদের সাংসারিক জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । বিয়ের দুই মাস পরে মতিলাল নেহরুর নির্দেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর চাপে বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের তালাক হয়ে যায় এবং নেহরু নিজেই তাঁর বিয়ের সমস্ত কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেন।
সৈয়দ হোসেন ও বিজয়া লক্ষ্মী পণ্ডিতের প্রেমকাহিনী মতিলাল নেহরুর জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ ছিল। এই যুগলকে আলাদা হওয়ার জন্য রাজি করাতে তাঁকে গান্ধীর পর্যন্ত সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। এই বিয়ের ফলে ১৯১৯ সালে হোসেনকে মিশরের কায়রোতে নির্বাসনে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে জাগারনাট বুকস-এর প্রকাশনা ‘ সার্কেলস অফ ফ্রিডম’- এর সাম্প্রতিক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত একদল মানুষ সম্পর্কে এই এবং এই জাতীয় অন্যান্য আকর্ষণীয় তথ্য উঠে আসে।
জওহরলাল নেহরুর বোন স্বরূপ কুমারী নেহরু, যিনি পরবর্তীকালে বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত নামে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে, যখন ভারত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক জাগরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। সৈয়দ হোসেন তখন মতিলাল নেহরুর জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র The Independent-এর সম্পাদক। তাঁর অসাধারণ বাগ্মীতা, লেখনী এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারা তাঁকে নেহরু পরিবারের ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল। সেই সূত্রেই তরুণী স্বরূপ কুমারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়, এবং ধীরে ধীরে সেই পরিচয় গভীর প্রেমে পরিণত হয়।
স্বরূপ কুমারী ছিলেন নেহরু পরিবারের আদরের কন্যা। তাঁর বয়স তখন মাত্র উনিশ, আর সৈয়দ হোসেন তাঁর চেয়ে প্রায় বারো বছরের বড়। ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্যও ছিল স্পষ্ট, সৈয়দ হোসেন মুসলিম, স্বরূপ কুমারী হিন্দু। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ককে শুধু ধর্মের পার্থক্য দিয়ে বোঝা যায় না। উভয়ের মধ্যেই ছিল শিক্ষিত, উদার এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন এক মানসিকতা।
বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত বহু বছর পরে তাঁর আত্মজীবনী The Scope of Happiness-এ সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের কথা লিখেছিলেন। সেই সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদর্শই ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য; ফলে তাঁদের কাছে নিজেদের সম্পর্ককে অসম্ভব বলে মনে হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করা যে কতটা কঠিন ছিল, খুব দ্রুতই তাঁরা তা বুঝতে পারেন।
যখন পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরূপ কুমারীর বিয়ের জন্য অন্য পাত্রের কথা ভাবা শুরু হয়, তখন দুজনেই নিজেদের সম্পর্ককে পরিণতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯১৯ সালে এলাহাবাদের কাটরায় সৈয়দ হোসেনের বাসভবনে তাঁদের গোপনে বিয়ে হয়। বিয়েটি মুসলিম রীতিতে সম্পন্ন হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে। তবে ঘটনাটির খুঁটিনাটি নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে; কোথাও এটিকে পালিয়ে বিয়ে বলা হয়েছে, আবার কোথাও গোপনে সম্পন্ন করা বিবাহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু সেই বিবাহ নেহরু পরিবারের কাছে মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। মতিলাল নেহরু ছিলেন কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা এবং তাঁর পরিবারের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে গান্ধীর কাছেও বিষয়টি পৌঁছায়। বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণে দাবি করা হয়েছে যে, নেহরু পরিবার গান্ধীর সাহায্য চেয়েছিল এবং তিনি এই সম্পর্কের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন।
গান্ধীর ভূমিকা, পরিবারের চাপ এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ রয়েছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সম্পর্কটি তীব্র পারিবারিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সৈয়দ হোসেন The Independent-এর সম্পাদকের পদ ছেড়ে এলাহাবাদ ত্যাগ করেন। অন্যদিকে স্বরূপ কুমারী পরে রঞ্জিত সীতারাম পণ্ডিতকে বিয়ে করেন এবং সেখান থেকেই তিনি ইতিহাসে বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এই বিচ্ছেদ সৈয়দ হোসেনের জীবনকে অন্য পথে নিয়ে যায়। পরবর্তী প্রায় পঁচিশ বছর তিনি আমেরিকায় কাটান। এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বক্তৃতা দিয়েছেন, সংবাদপত্রে লিখেছেন এবং আমেরিকান জনমতের কাছে ভারতের স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি তিনি এমন একটি স্বাধীন ভারতের পক্ষে কথা বলতেন, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে নাগরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতও নিজের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে থাকেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং স্বাধীনতার পরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।
তবু তাঁদের অতীতের সম্পর্ক পুরোপুরি ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যায়নি। বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও ঐতিহাসিক বিবরণে জানা যায়, বহু বছর পর তাঁদের আবার যোগাযোগ হয়। বিশেষ করে ১৯৪০-এর দশকে তাঁদের সম্পর্কের পুরনো স্মৃতি আবার সামনে আসে। সৈয়দ হোসেন তখন আমেরিকায় এবং বিজয়লক্ষ্মী নিজের জীবনের অন্য এক অধ্যায়ে। কিন্তু সময় তাঁদের অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পরে জওহরলাল নেহরু সৈয়দ হোসেনকে মিশরে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠান। কায়রোয় দায়িত্ব নেওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই ১৯৪৯ সালে হৃদ্রোগে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। মিশর সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানায়। বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত বেঁচে ছিলেন আরও বহু বছর এবং স্বাধীন ভারতের অন্যতম পরিচিত কূটনীতিক হিসেবে ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নেন।
সৈয়দ হোসেন ও বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের গল্প তাই শুধু একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের আয়না, যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই সীমারেখা অতিক্রম করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
যাইহোক, আরও একটা বিষয় দাবি করা হয় যে, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত এবং কৃষ্ণ নেহরু কেউই স্কুলের মুখ দেখেননি, কলেজের মুখও দেখাননি।কিন্তু নেহরু তাঁর নিরক্ষর বোন বিজয়লক্ষ্মীকে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত, আমেরিকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘে ভারতের রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে ।।

