এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাংলাদেশ,২৫ আগস্ট : গত শনিবার রাতে বাংলাদেশের রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)। পরে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২ হিন্দু তরুন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ । বর্তমানে তারা জেলে । রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদ সাংবাদিক সম্মেলনে রীতিমতো কান্নাকাটি করে একটা গল্প ফাঁদেন যে,ধৃত ২ তরুন মাদক ট্যাবলেট (ইয়াবা) খাবার সময় গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলাতেই এই খুনের ঘটনা ঘটেছে । তার দাবি সকলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল।
কিন্তু এখন যে ভয়ঙ্কর তথ্য সামনে আসছে তাতে শিহরিত হয়ে উঠছেন সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ । কারন,২৫ বছরের তরুনী আগামী চক্রবর্তীকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায় । তার চোখ ওপড়ানো ছিল । সকলের মুখ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কেমিক্যাল দিয়ে । এই নৃশংস বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘন্টা আগেই মৃত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় । সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ভাবে ওই পরিবারটিকে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে । আর এতেই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা । অপরাধ দমনের বিশ্লেষকেরা সন্ত্রাসী যোগসূত্রও খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে । আর এতে যে কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটির নাম সামনে আসছে,সেটি হল “জইশ-ই- মহম্মদ” । কারন এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে ১০০ শতাংশ ইসলামি রাষ্ট্র গড়া ও শরিয়া শাসন লাগু করার কথা বলে আসছে । আর তাদের এই লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল সেদেশের ৭ শতাংশ হিন্দু ।
পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদের মিথ্যাচারিতার উন্মোচন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে, যা নিয়ে রহস্য ও প্রশ্ন বাড়ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউট । ওই সংবাদমাধ্যমের আজকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের ময়নাতদন্তের তথ্য জানান ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডাঃ বাবলু কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে, তবে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিহতদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থও কোনো রাসায়নিক বা এসিড বার্নের কারণে নয় বলে জানান তিনি এটি মৃতদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফল। মুখমণ্ডল “ঝলসে যাওয়া”র মতো দেখানোর পেছনেও কয়েকদিন মৃতদেহ পড়ে থাকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
অথচ এর আগে রবিবার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, “নিহত আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে এমনভাবে টানা হয়েছিল যে তার চোখ বেরিয়ে আসে ও চোয়াল ভেঙে যায়। মৃতদেহ কতদিন পড়ে থাকলে এমন অবস্থা হতে পারে তা তিনি স্পষ্ট করেননি, যদিও পুলিশ অনুমান মৃতদেহ সর্বোচ্চ ৪৮ থেকে ৫২ ঘণ্টা পড়ে ছিল।
হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবার, দুই অভিযুক্ত, গ্রেপ্তারে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা, ফরেনসিক চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তা সবাই একই ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্ট ও গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার শার্ট একই রকম হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস এক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তার পরনে ছিল ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি, অন্য কোনো কাপড় দেওয়া হয়নি ।” অন্যদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি খণ্ডন করে জানান, এটি আড়ংয়ের সাধারণ একটি শার্ট, যা হাজারো মানুষের কাছে থাকতে পারে। আসামিকে যেভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল সেভাবেই ব্রিফিং ও আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়ায় চারজনকে হত্যা করে এবং শুক্রবার জুমার নামাজের সময় স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু এই সময়সীমার সঙ্গে দুই আসামির পরিবারের বক্তব্যে গরমিল পাওয়া গেছে।
সিদ্ধার্থের বাবা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় ছেলে বাড়িতে খাওয়া দাওয়া শেষে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে রাত কাটাতে যায় বলে তিনি জেনেছিলেন। তবে সীমান্তের বাবা সুবাস চন্দ্র দাস এই দাবি অস্বীকার করে জানান, সিদ্ধার্থ শুধু দেখা করে চলে গিয়েছিল, রাতে থাকেনি তার ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। অন্যদিকে মুগ্ধর মা সোনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় একসঙ্গে খাওয়ার পর ছেলে নিজের ঘরে যায়, রাতে কখন বের হয় তা তার জানা নেই।
পুলিশ কমিশনারের দাবি, আঙুলের ছাপ মুছতে আসামিরা বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো জলে ভিজিয়ে রাখে। তবে নিহত পরিবারের চারজনেরই ফোন বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল বলে জানান স্বজন পূজা চক্রবর্তী। পুলিশ দুটি ফোন বাজেয়াপ্ত করলেও বাকি দুটি ফোন কোথায়, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
এছাড়া ঘটনার রাতে পুরো বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও রহস্যজনক বলে মনে করছেন স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন। সংযোগটি স্বাভাবিক ত্রুটির মতো ছিল না, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে খুলে ফেলা হয়েছিল বলে তিনি জানান । এ বিষয়ে ডিবি উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কিনা তা তাদের জানা নেই।
পাশের নির্মাণাধীন ভবনের যে ছাদ দিয়ে আসামিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করছে, সেই ভবনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু কুমার মণ্ডল জানান, ঘটনার রাতে ফ্যান চালু থাকায় কোনো শব্দ বা চিৎকার তার কানে আসেনি। তিনি জানান, গেট বন্ধ থাকলেও চারপাশের দেয়াল খুব উঁচু নয়, তাই দেয়াল টপকেই আসামিরা ছাদে যেতে পারে বলে তার ধারণা। অভিযুক্তদের তিনি চেনেন না বলেও জানান ।
রংপুর জিলা স্কুলের প্রাক্তন হিসাববিজ্ঞান শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেব এবং নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন দোতলা বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। অবসরের পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন তিনি ।
ডেইলি স্টার জানিয়েছে,রবিবার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহগুলো দাহ করতে দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলে স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো দেখতে পান। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী ডেইলি স্টারকে বলেন, সন্ধ্যায় মৃতদেহগুলো হস্তান্তরের পর আমরা দেখতে পাই, তাদের মুখগুলো ঝলসানো। এর আগে পুলিশ আমাদের মৃতদেহের কাছে যেতে দেয়নি।তিনি বলেন,‘তাদের হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে মুখগুলো ঝলসে দেওয়া হয়েছিল। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ।’
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের ডেইলি স্টারকে বলেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন,দেহগুলোর মুখমণ্ডল ঝলসানো ছিল। হত্যার আগে বা পরে হত্যাকারীরা দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দিয়েছিল। দাহ্য পদার্থ হিসেবে কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে, তা আপাতত বলা যাচ্ছে না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিস্তারিত জানা যাবে।।
