গত ২২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পার্ক স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে যান রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুরবিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল । যখন থেকে ফুটপাতে কেরোসিন স্টোভে ডেকচি ভর্তি দুধ গরম করা এক মহিলাকে তার ধমক দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তখন থেকেই সেটা রাজ্য রাজনীতির “হট টপিক” হয়ে গেছে । সীতা ওরফে রশিদা নামে ওই মহিলার কাছে ছুটে গিয়ে মানবতার বাণী শোনাতে যাচ্ছেন বিরোধী দলগুলির নেতানেত্রীরা । বিশেষ করে সিপিএমের এই বিষয়ে আগ্রহ একটু বেশি বলে মনে হচ্ছে ! গতকাল সিপিএমের সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির (AIDWA) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কনিনীকা ঘোষ বোস, রাজ্য সম্পাদক মোনালিসা সিনহা সহ জেলা নেতৃত্ব পার্ক স্ট্রিটে সীতা ওরফে রশিদার শিশুসন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে এসেছেন । কথিত মানবিকতার বাণী শোনাচ্ছেন । কিন্তু এই সেই সিপিএম, যাদের শাসনকালে ১৯৭৯ সালে সুন্দরবনের মরিচঝাপি দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া ৪০ হাজার ক্ষুধার্ত হিন্দু শরণার্থীর প্রতি চুড়ান্ত অমানবিকতা দেখিয়েছিল । খাবার, পানীয় জল বন্ধ করে নির্মমভাবে গনহত্যা করেছিল । আর এই চুড়ান্ত অমানবিক যার নির্দেশে ঘটেছিল, তিনি বামফ্রন্ট সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু । সিপিএমের “মহান কমরেড” । আসুন জেনে নেওয়া যাক জ্যোতি বসু সম্পর্কে কিছু কথা :
ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে জ্যোতি বসু একটি অত্যন্ত বিতর্কিত নাম । তিনি সিপিআই (এম) দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রথম পলিটব্যুরোর একজন ছিলেন । ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা তেইশ বছর জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর এই সময়কালেই ঘটে গেছে একের পর এক হাড়হিম করা নরসংহার । মারিচঝাপি হত্যাকাণ্ড (১৯৭৯), বিজন সেতু হত্যাকাণ্ড (১৯৮২),সাইনবাড়ি হত্যাকাণ্ড (১৯৭০) প্রভৃতি একের পর গনহত্যার কাহিনী পড়ে আজও মানুষের শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় হিমশীতল প্রবাহ ।
মারিচঝাপি গনহত্যা
১৯৭৯ সালের গোড়ার দিকে,শুধুমাত্র ধর্মীয় কারনে বাংলাদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় চল্লিশ হাজার ক্ষুধার্ত, অনাহারী ও হতাশ নমঃশুদ্র পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের মরিচঝাপি দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন হিন্দু উদ্বাস্তু, যাঁরা সদ্য বাংলাদেশে পরিণত হওয়া পূর্ব পাকিস্তানে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার তাঁদের কোনো দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় তাঁরা সুন্দরবনের এই ঘন জঙ্গলে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তারপর, ১৯৭৯ সালের জানুয়ারির শেষে তারা এলো। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ লঞ্চে করে এসে হুগলি নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলের জলপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। দ্বীপটি তখন পুরোপুরি ঘেরাও হয়ে গিয়েছিল। সেখানকার ৪০,০০০ মানুষের কাছে খাবার বা ওষুধ পৌঁছানোর কোনো উপায় ছিল না।
৩১শে জানুয়ারী সকালে পুলিশ ক্ষুধার্ত হিন্দু শরণার্থীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। তারা দ্বীপটি খালি করে দেয়। সেদিন কত মানুষ মারা গিয়েছিল তা কেউ জানে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কখনও সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। কোন মুখ্যমন্ত্রী এই নৃশংসতার নির্দেশ দিয়েছিলেন ? তিনি সিপিএমের “মহান কমরেড” জ্যোতি বসু ।
যেকোনো মানবিক দেশ হলে জ্যোতি বসুকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হতো। সম্ভবত তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হতো। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি । পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার সময়, জ্যোতি বসু ভারতের দীর্ঘতম সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
জ্যোতি বসু হলেন সেই গণহত্যাকারী যাকে ইতিহাস ভুলে গেছে। জ্যোতি বসু ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারী ৯৫ বছর বয়সে মারা যান । মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া । হিচেন্স যেমনটা বলতেন, এটা লজ্জার বিষয় যে তার যাওয়ার জন্য কোনো নরক নেই।
জ্যোতি বসু (জ্যোতিরিন্দ্র বসু) ব্রিটিশ ভারতে ১৯১৪ সালের ৮ই জুলাই অধুনা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদীতে জন্মগ্রহণ করেন । অধিকাংশ কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্বের মতোই তিনিও ছিলেন উচ্চবর্ণের এবং এক সচ্ছল পরিবারের সন্তান। কিন্ডারগার্টেন জীবন থেকেই তিনি লরেটো এবং জেভিয়ার্সের মতো বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, যেগুলি ব্রিটিশ বড়া সাহেবরা নিজেদের এবং তাদের অনুগামীদের জন্য চালাত। এরপর, তিনি ভারতের ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল ছেড়ে ইংল্যান্ডের অভিজাত কলেজে পাড়ি জমান এবং ব্যারিস্টার হন।
এটা বোঝা কঠিন নয় যে, বাংলাদেশ থেকে আসা চল্লিশ হাজার ক্ষুধার্ত হিন্দু শরণার্থীর প্রতি জ্যোতি বসু কেন কোনো সহানুভূতি অনুভব করতে পারেননি। আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল ঐতিহাসিকদের এটা লক্ষ্য করা উচিত যে, এই শরণার্থীদের অধিকাংশই ছিলেন দলিত হিন্দু ।
কমিউনিজম এটাই। জনসমক্ষে গরীব ও ক্ষুধার্তদের নিয়ে বক্তৃতা দেওয়া, যাতে গোপনে নিজের বিশেষাধিকার বজায় রাখা যায়। আর তারপর ঐতিহাসিকের ছদ্মবেশে থাকা বামপন্থী কল্পকাহিনী নির্মাতাদের ওপর ভরসা করা, যারা আপনার জন্য ইতিহাসকে ধামাচাপা দেবে।
১৯৬২ সালের যুদ্ধের ঠিক পরেই জ্যোতি বসু একটি জনসভায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, “চীন আগ্রাসী হতে পারে না।” তাঁর রাজনীতি যদি দেশদ্রোহী হয়ে থাকে, তবে তাঁর শাসনকাল ছিল রক্তাক্ত। বস্তুত, ১৯৯৭ সালে বাংলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিধানসভায় স্বীকার করেছিলেন যে জ্যোতি বসুর শাসনকালের শুরু থেকে পশ্চিমবঙ্গে ২৮,০০০ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে । ভাবুন তো আসল সংখ্যাটা কত ছিল।
এমনকি ২৮,০০০ হত্যাকাণ্ডের সরকারি পরিসংখ্যানও কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। তা তাঁর উত্তরাধিকারের গায়ে সামান্য আঁচড়ও ফেলতে পারেনি । কারণ ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিস্ট নেতার পক্ষে ছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, তার আগের বছর, ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে যখন সংসদে বড় ধরনের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর মধ্যে এই বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল যে ‘পূজনীয়’ জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। কিন্তু জ্যোতি বসুর নিজ দলের ভেতরের শত্রুরাই তাঁকে থামিয়েছিল। এভাবেই ভারত এমন একজন প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, যিনি শরণার্থীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন, পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে নির্মূল করেছিলেন এবং ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের সরকারি ভাষ্য প্রচার করেছিলেন।
আপনারা হয়তো শুনেছেন যে জ্যোতি বসুর অর্থনৈতিক নীতির কারণে ব্যবসা ও শিল্প রাজ্য ছেড়ে চলে গেছে। আপনারা কি জানেন যে এটা “জনবিপ্লব”-এর বিরোধী “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর” একটি অপপ্রচার মাত্র?
আপনাদের সাথে চন্দন বসুর পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি জ্যোতিবাবুর ছেলে। শ্রমিক অধিকারের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য জ্যোতিবাবু তাঁর ছেলেকে কোন দেশে পাঠিয়েছিলেন? ভিয়েতনাম নাকি গুয়াতেমালা?
ঠিক তা নয়। জ্যোতি বসুর ছেলে আসলেই একজন শিল্পপতি হয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই ব্যবসা জগতে একজন তারকা ছিলেন; পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনস্থ সংস্থাগুলো থেকে ঋণ এবং শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট সংস্থাগুলো থেকে চুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো তাঁর নাম সুপারিশ করত।
বাবা পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী। ছেলে এক বড় ব্যবসায়ী, যিনি পশ্চিমবঙ্গ ফিনান্সিয়াল কর্পোরেশন থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়ার জন্য সুপারিশ পান। জাতির সামনে সততার এক আদর্শ তুলে ধরার জন্য তাঁদের দুজনেরই পদ্মবিভূষণ পাওয়া উচিত ছিল।
এই সবকিছু কীভাবে সম্ভব হলো? কারণ জ্যোতি বসুর পাশে সঠিক মানুষেরা ছিলেন। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, কবি, ইতিহাসবিদ, সবাই। আধুনিক সময়ের মতো নয়, যেখানে কেউ নভি মুম্বাইয়ের একটি গির্জায় পাথর ছুঁড়লে পরের দিনই নিউ ইয়র্ক টাইমস “অসহিষ্ণুতা” নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।
কথায় আছে, মৃত ব্যক্তির নিন্দা করো না। এটা একটা ভালো সাধারণ নিয়ম। কিন্তু যদি এমন হয় যে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে, যারা একজন মানুষের হাতে শিকার হয়েছে? ভুক্তভোগীদের কথাও শোনার অধিকার আছে। অন্তত সেইসব তারকা সাংবাদিকদের মতোই, যারা ইন্টারনেট ট্রোলদের হুমকির অভিযোগ জানাতে টুইটারে পুলিশকে ফোন করে (১০০ নম্বরে ফোন না করে)।
সুতরাং, প্রয়াত জ্যোতি বসুর নিন্দা করতে দ্বিধা করবেন না। যদি পরকাল বলে কিছু থেকে থাকে, তবে নিশ্চিত থাকুন যে ওপার থেকে (অন্তত) ২৮,০০০ কণ্ঠ আপনাকে সমর্থন করছে।।
