১৯৪৬ সালে, চীনকে ভারতের জাতিসংঘে স্থায়ী আসন ছেড়ে দেওয়ারও আগে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু আত্মরক্ষার সাহস দেখানোর জন্য বিহারের হিন্দুদের উপর বোমা বর্ষণে ব্যস্ত ছিলেন। ভারতীয়দের কখনও ভোলা উচিত নয় যে, ১৯৪৬ সালের ৮ই নভেম্বর, অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলে বিহারের নগরনৌসায় ৪০০ থেকে ১০০০ হিন্দু নিহত হন। নোয়াখালী হত্যাকাণ্ডের (৫০০০-এর বেশি নিহত, লক্ষ লক্ষ ধর্ষিতা) পর উৎসাহিত হওয়া হিংস্র মুসলিম দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার সাহস দেখানোর জন্যই এই ঘটনা ঘটেছিল।
পদ্মজা নাইডুকে লেখা এক চিঠিতে, আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে, নেহেরু স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর নির্দেশেই বিহারে ৪০০ হিন্দু নিহত হয়েছেন!৫.১১.১৯৪৬ তারিখে পদ্মজা নাইডু¹-কে উদ্দেশ্য করে ওই চিঠিতে জহরলাল নেহেরু লিখেছিলেন, “প্রিয়তমা, ঠিক কেন যে আমি এই মুহূর্তে, প্রায় মধ্যরাতে, যখন আমি ক্লান্তিতে অবসন্ন, তোমাকে চিঠি লিখছি, তা আমি ঠিক জানি না। কিন্তু গত দুদিনের অতিরিক্ত চাপের পর হঠাৎ আমার মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া ও স্বস্তির অনুভূতি হলো এবং তোমার কথা মনে পড়ায় আমি লিখতে চাইলাম। আজ সন্ধ্যায় আমি ভাগলপুর থেকে বিমানে ফিরলাম। এসে জানতে পারলাম যে, এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনী এক কৃষক জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে এবং প্রায় ৪০০ জন নিহত হয়েছে। সাধারণত এমন ঘটনায় আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম। কিন্তু তুমি কি বিশ্বাস করবে? এটা শুনে আমি দারুণ স্বস্তি পেয়েছি! এভাবেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে আমরাও বদলে যাই, যখন নতুন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির স্তর অতীতের সঞ্চিত স্মৃতিকে ঢেকে দেয়। গত দুদিনে আমি যথেষ্ট ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়েছি। এখানে অবিশ্বাস্য কিছু একটা ঘটেছে, অথবা এমন কিছু যা আমি কয়েকদিন আগেও বিশ্বাস করতে চাইতাম না। হিন্দু কৃষক জনতা চরম বর্বরতা ও অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের হাতে কতজন নিহত হয়েছে তা আমি এখনও জানি না, তবে সংখ্যাটা নিশ্চয়ই বিশাল হবে। এটা ভেবে আমার সমস্ত মূল্যবোধই বিগড়ে যায় যে, সরল, সাদাসিধে, বেশ পছন্দের বিহারের কৃষকেরা দলবদ্ধভাবে পুরোপুরি পাগল হয়ে যেতে পারে। কয়েকদিন ধরে তারা প্রায় কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো চলছিল। আর তাই যখন খবর এল যে অবশেষে এক জায়গায় তাদের থামানো গেছে এবং তাদের মধ্যে ৪০০ জন মারা গেছে, তখন আমার মনে হলো যে ভারসাম্যটা সামান্য হলেও ঠিক হয়েছে। আমি জানি না কতদিন এখানে থাকব—এই মুহূর্তের জন্য আমি দিল্লি আর সমস্ত পরিস্থিতি ভুলে গেছি। এখন আমার একমাত্র চিন্তা বিহার নিয়ে। এখানে আলো দেখামাত্রই আমি দিল্লিতে ফিরে যাব। আমি এখন খুব ক্লান্ত আর ঘুম ঘুম ভাব লাগছে। ভালোবাসা সহ, জওহর ।”
এর আগে ৪ঠা নভেম্বর, নেহেরু হিন্দুদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে তাঁর অধীনে “সরকার কোনো দয়া দেখাবে না… প্রয়োজনে তাদের উপর গুলি চালানো হবে এবং আকাশ থেকে বোমা ফেলা হবে”। তিনি নোয়াখালীতে ধর্ষিত ও গণহত্যার শিকার হওয়া হিন্দুদেরকে প্রতিরোধের পরিবর্তে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, “এমনকি নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করার বিনিময়েও”!
আসলে,নোয়াখালী হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিক্ষিপ্ত হিংসা চলছিল, কিন্তু স্থানীয় গ্রামগুলিতে মুসলমানদের দ্বারা বেশ কয়েকজন তরুণীকে জোরপূর্বক অপহরণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হতে দেখে বিহারের হিন্দুরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের আবেদন সত্ত্বেও, নেহরুর নেতৃত্বাধীন পুলিশের কাছ থেকে হিন্দুরা কোনো সাহায্য পায়নি। ফলস্বরূপ, তারা নিজেদের পরিবারকে রক্ষা ও সুরক্ষার জন্য নিজেদের মতো করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
এরপর ক্ষুব্ধ নেহরু ৬ই নভেম্বর হিন্দুদের প্রতি তার পুলিশের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, নোয়াখালীর জন্য যদি তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে থাকে, তবে হিন্দুদের থামাতে তিনি “মেশিনগান, বোমা, বিমান এবং সরকারের সমস্ত বাহিনী” সহ সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবেন। জহরলাল নেহেরু বকর ঈদের মধ্যে সমস্ত হিন্দুকে নিষ্ক্রিয় করতে চেয়েছিলেন।
৮ই নভেম্বর, নেহরুর নির্দেশে পুলিশ ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। শত শত হিন্দু আত্মরক্ষার সাহস দেখানোর এবং তাদের উপর সংঘটিত হিংসার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাদের উপর গুলি চালায়।
আশ্চর্যজনকভাবে, ১৯শে নভেম্বর বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিনহাকে লেখা নেহরুর চিঠি থেকে প্রকাশ পায় যে, তিনি শত শত বিহারী হিন্দুকে গণহত্যার ঘটনায় নিজের সরাসরি ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করছেন। তিনি নির্লিপ্তভাবে বলেন যে, “সবকিছু বিবেচনা করলে” ২৫০ জন হিন্দুর হতাহতের সংখ্যা খুব বেশি নয় এবং এমনকি নেহরুকে বাঁচানোর জন্য একটি সরকারি ভুয়া অজুহাত কীভাবে তৈরি করতে হবে, সে বিষয়ে সিনহাকে নির্দেশও দেন।
আমরা জালিয়ানওয়ালা বাগের কথা জানি, কিন্তু আমাদের ইতিহাস বই কখনও প্রকাশ করে না যে, নৃশংস সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজেদের এবং তাদের সহধর্মীদের রক্ষা করার সাহস দেখানোর জন্য ৪০০ জনেরও বেশি হিন্দুর এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের জন্য জওহরলাল নেহরু কীভাবে দায়ী ছিলেন। এর বিপরীতে, তিনি লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে গণহত্যা করা থেকে মুসলমানদের বিরত রাখার জন্য কখনও আবেদন বা সতর্ক করেননি ।
কী পরিহাস ও ভণ্ডামি যে আজ তাঁরই বংশধরেরা হাতে সংবিধানের কপি নিয়ে গনতন্দ্র রক্ষার কথা বলে গলা ফাটাচ্ছেন এবং প্রতিবাদী নাগরিকদের ওপর পুলিশের হিংসা নিয়ে আমাদের জ্ঞান দিচ্ছেন।
সূত্র: Selected Works of Jawaharlal Nehru, Volume 1, Jawaharlal Nehru Memorial Fund.
