ভারতীয় বিচারব্যবস্থা আজ গুরুতর প্রশ্নের মুখে । একের পর এক মামলায় বিতর্কিত রায়ে আজ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অনাস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । এতদিন আদালত অবমাননার ভয়ে কেউ মুখ না খুললেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় । তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : আরজি করের তরুনী চিকিৎসক ‘অভয়া’র খুন-ধর্ষণ, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার ঘুঁষের বিনিময়ে রায় দানের অভিযোগ এবং ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর অভিষেক ব্যানার্জিকে চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি, এই মামলাগুলিতে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে ।
আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তরুনী চিকিৎসকের নৃশংস খুনের মামলা
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক- ছাত্রীর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল গোটা বিশ্ব । ওই ঘটনার পরের দিনই কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়। কলকাতা হাইকোর্টের নজরদারিতে মামলা ঠিকঠাক চললেও যখন থেকে সুপ্রিম কোর্ট মামলার তদন্তের গতিপ্রকৃতি খতিয়ে দেখতে নিজে থেকেই মামলাটি হাতে তুলে নেয় তখন থেকে মামলার তদন্তের গগতিপ্রকৃতি ঘুরে যায় বলে অভিযোগ । কোনো এক রহস্যময় কারনে সিবিআই ‘অভয়া’র নৃশংস খুনের তদন্তের চেয়ে আরজি কর হাসপাতালের দুর্নীতির দিকে বেশি মনোনিবেশ করে । ফলে আজও হতভাগ্য মৃত তরুনী চিকিৎসকের পরিবারকে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের চক্কর কাটতে বাধ্য হচ্ছে ।
গত বছর ডিসেম্বর মাসে আরজি কর মামলা ফের হাইকোর্টে ফিরিয়ে দেয় আদালত। কিন্তু ততদিনে একদিকে যেমন বিক্ষোভ প্রশমিত হয়ে গেছে, পাশাপাশি তদন্তের গতিপ্রকৃতিও বদলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ । একারনে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের ভূমিকা নিয়ে আজও প্রশ্ন ওঠে । উল্লেখ্য, সিজেআই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে গঠিত বিচারপতি জেবি পর্দিওয়ালা এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চে আরজি কর মামলার শুনানি হয়।
বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার ঘুঁষের বিনিময়ে রায়দান মামলা
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার দিল্লি স্থিত সরকারি বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই আগুন নেভাতে গিয়ে বাড়ি থেকে বস্তাভর্তি বিপুল পরিমাণ নগদ ও পোড়া নোট উদ্ধার হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং পরবর্তীতে অপসারণের (ইমপিচমেন্ট) প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের বিচারপতির তদন্ত কমিটি এই নগদ উদ্ধারের অভিযোগের সত্যতা পায়। প্রাথমিক তদন্তের পর তাঁর বিচারিক কাজ কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে এলাহাবাদ হাইকোর্টে বদলি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তদন্ত ও সংসদের ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার মুখে পড়ে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর (FIR) ও এসআইটি (SIT) তদন্তের দাবি জানানো একটি আবেদন খারিজ করে দেয়।
লেখক রাহুল শিবশঙ্কর এক্স-এ লিখেছেন, “বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার বিরুদ্ধে “বিচারক (তদন্ত) আইন, ১৯৬৮-এর অধীনে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন” আজ পেশ করা হবে, কিন্তু প্রতিবেদনটির কোনো গুরুত্বই হয়তো থাকবে না।ভারতে একজন বিচারপতি শুধু পদত্যাগ করেই জবাবদিহিতা এড়াতে পারেন!বিচারপতি ভার্মার (নগদ কেলেঙ্কারি, মার্চ ২০২৫) উপর একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন (অবশেষে) সংসদে পেশ করা হবে।
কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংসদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বিচারপতি (একটি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে) পদত্যাগ করেছেন। শোনা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি এখনও পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেননি। তাহলে এই পদত্যাগ কি সব অভিযোগ মুছে দেবে?অন্য কথায়, দেশ কোনো বিচারপতি দোষী ছিলেন কি না তা জানার আগেই কি তিনি সরে যেতে পারেন (বা তাঁর কি সরে যাওয়া উচিত)? বিচারপতি ভার্মার তা করা উচিত নয়, তাই না?আচ্ছা, বিচারপতি যশবন্ত ভার্মা সম্পর্কিত আজ এটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
অভিষেক ব্যানার্জিকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি
রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মমতা ব্যানার্জির ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে । তার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য, জাল স্বাক্ষর, জমি দখল এবং চিকিৎসায় গাফিলতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক অভিযোগ ও এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাগুলি আদালতে বিচারাধীন । বিধানসভা নির্বাচনের পর এরকম নানা অভিযোগে অভিষেকের বিরুদ্ধে ১৬টি এফআইআর দায়ের করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ বহাল রাখায় আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করতে পারবে না পুলিশ। এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ২৫ অগস্ট। এ দিন অভিষেকের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন এবং অয়ন ভট্টাচার্য।
তার আগে আমেরিকার হাসপাতালে অভিষেক ব্যানার্জির চোখের চিকিৎসা করানো নিয়ে বিগত কয়েকদিন ধরে বিস্তর নাটক দেখা যায় আদালতে । বিদেশে যেতে চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে যে মামলা করেছিলেন অভিষেক, তা খারিজ হয়ে যায়। হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ চোখের চিকিৎসার জন্য অভিষেককে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। বিচারপতি জানান, চিকিৎসা সংক্রান্ত মতামত নেওয়ার জন্য অভিষেক -কে এসএসকেএম হাসপাতালে যেতে হবে। সেখানকার চক্ষু বিভাগের প্রধান একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে অভিষেকের বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয়তার দিকটি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু অভিষেকের আইনজীবী আদালতে জানিয়ে দেন যে, তাঁর মক্কেল এসএসকেএম-এ যাবেন না। তার পর নির্দেশ দিতে গিয়ে পুরো মামলাই খারিজ করে দেন বিচারপতি ভট্টাচার্য।
তার পরেই ৭ অগস্ট গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক ব্যানার্জি । সোমবার শুনানি হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ মামলাটি আবার হাই কোর্টেই ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সাত দিনের মধ্যে অভিষেকের আর্জির নিষ্পত্তি করতে বলেছিল শীর্ষ আদালত। সেইমতো বুধবার এই মামলার শুনানি হয় হাই কোর্টে। তবে হাই কোর্টে অভিষেককে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। উচ্চ আদালত মামলা খারিজ করার পর একই আর্জি নিয়ে শীর্ষ আদালতে গিয়েছিলেন অভিষেক। সেখানেই মিলে যায় অনুমতি।সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ, তিন সপ্তাহের জন্য তিনি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারবেন এবং তাঁর বিদেশযাত্রায় কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। আগামী তিন সপ্তাহ অভিষেকের বিদেশযাত্রায় কোনও বাধা দেওয়া যাবে না।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি মিলতেই ১৪ টি বড়বড় ব্যাগে মালপত্র ভরে বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন অভিষেক ব্যানার্জি । বিজেপির দাবি, মামলাগুলি থেকে অব্যাহতি পেতে অভিষেক ব্যানার্জি আর ভারতে ফিরবেন না, বিদেশেই থেকে যাবেন।
মুম্বই বিস্ফোরণের মাস্টারমাইন্ড ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি রদ করতে গভীর রাতে খুলেছিল সুপ্রিম কোর্ট
এর আগে,১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণ মামলার দোষী সব্যস্ত সন্ত্রাসী ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকরের ঠিক আগে ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই গভীর রাতে (ভোর ৩টায়) সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ দরজা খুলে শুনানি হয়েছিল । ইয়াকুব মেমনের আইনজীবীরা শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তার ক্ষমার আবেদন খারিজ হওয়ার পর, ফাঁসি স্থগিত করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, দণ্ডিত ব্যক্তির আইনি ও মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে নতুন আবেদনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
রাত সাড়ে ১২টায় প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে জড়ো হয় আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ-সহ মৃত্যুদণ্ড-বিরোধী তথাকথিত সমাজকর্মীদের একটি দল। কিছু পরে জানা যায়, যে তিন বিচারপতির বেঞ্চ আজ বিকেলে ইয়াকুবের আর্জি খারিজ করেছিল, বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি অমিতাভ রায় এবং বিচারপতি পি সি পন্থকে নিয়ে গঠিত সেই একই বেঞ্চ রাতে় মামলাটি শুনবে। খোলা হয় সুপ্রিম কোর্টের চার নম্বর আদালত কক্ষ। ফটকের সামনে জড়ো হওয়া ভিড়ের মধ্যে দিয়ে কোনও মতে রাস্তা করে ঢুকতে থাকে বিচারপতিদের গাড়ি। কেউ কেউ বলছেন, কোর্ট বন্ধ হওয়ার পর রাতে বিচারপতিদের বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানির নজির আগেও রয়েছে। কিন্তু গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্ট খুলিয়ে মামলার নজির সম্ভবত নেই। কিন্তু একজন সন্ত্রাসীকে বাঁচাতনোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই নজিরও স্থাপন করেছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ।
উল্লেখ্য,২০১৫ সালের ৩০ জুলাই নাগপুর জেলে ফাঁসি কার্যকরের আগে ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুদণ্ড রোধ করতে এবং সুপ্রিম কোর্টের অভূতপূর্ব মধ্যরাতের শুনানিতে যে বিশিষ্ট আইনজীবীরা আইনি লড়াই লড়েছিলেন, তাঁদের প্রধান নামগুলি হলো: আনন্দ গ্রোভার (Anand Grover),প্রশান্ত ভূষণ (Prashant Bhushan),যুগ মোহিত চৌধুরী (Yug Mohit Chaudhry),বৃন্দা গ্রোভার (Vrinda Grover),নিত্যা রামকৃষ্ণন (Nitya Ramakrishnan) এবং ইন্দিরা জয়সিং (Indira Jaising) ।।
