কথামুখ
১৯৪৭ সাল ভারতের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। স্বাধীনতার সাথে দেশভাগের যন্ত্রণাও বয়ে আনলো এই বছর। বিশেষত বাংলা—ধর্মের ভিত্তিতে দু-টুকরো হয়ে গেল। এই বাংলা ভাগের রাজনীতিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা আজও বিতর্কের কেন্দ্রে। অনেকে তাঁকে “বাংলা ভাগের খলনায়ক” বলেন, অনেকে বলেন, “সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক”, আবার “বাঙালি হিন্দুর রক্ষক” তকমাও রয়েছে। নায়ক না খলনায়ক? ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগের প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অবস্থানের এক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের প্রয়াস এই ক্ষুদ্র নিবন্ধন।
প্রেক্ষাপট
কেন বাংলা ভাগ অনিবার্য হয়ে উঠলো?
১৯৪০-এর দশকের শেষে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মুসলিম লিগের “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” এবং ক্যাবিনেট মিশনের ব্যর্থতা—এই সবকিছুই প্রমাণ করছিল অখণ্ড ভারত রাখা সম্ভব নয়। বাংলার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার পর হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়: “অখণ্ড বাংলা” থাকলে সেটা মুসলিম লিগের হাতে যাবে, আর সেখানে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। এই পরিস্থিতিতে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের একাংশ “পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার” দাবি তোলে। আর এই দাবির সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর ছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও যুক্তি
শ্যামাপ্রসাদ মনে করতেন ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ যখন হচ্ছেই, তখন বাংলার হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলকে ভারতের সাথে রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। তার প্রধান যুক্তি ছিল তিনটি:
নিরাপত্তার প্রশ্ন: পাকিস্তানের অন্তর্গত বাংলা হলে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। সেখানে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা থাকবে না।
সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য: পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা রক্ষা করতে হলে তাদের ভারতে থাকতে হবে। বাংলা ভাষা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা ভারতের মধ্যেই সুরক্ষিত থাকবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা: গান্ধী-নেহেরু অখণ্ড বাংলা চাইলেও, বাস্তবে মুসলিম লিগ তা মানবে না। তাই আগেভাগে ভাগ করে নিয়ে অন্তত অর্ধেক বাংলাকে বাঁচানো দরকার। সোহরাওয়ার্দীর “অখণ্ড স্বাধীন বাংলা” মুসলিম লিগ মানবে না।
শ্যামাপ্রসাদের যুক্তি ছিল বাস্তববাদী, আদর্শবাদী নয়। তাই ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় বাংলা ভাগের প্রস্তাব পাশের সময় শ্যামাপ্রসাদ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বাংলা ভাগের প্রস্তাব পাশের দিন শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের হিন্দু সদস্যদের একজোট করেন। এই ভোটের ফলেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়। তিনি এটাকে “হিন্দু বাঙালির বাঁচা-মরার প্রশ্ন” হিসেবে তুলে ধরেন।
বিরোধিতা ও ঐতিহাসিক বিতর্ক
শ্যামাপ্রসাদের এই অবস্থান তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। গান্ধী, নেহেরু, মৌলানা আজাদ—সকলেই অখণ্ড বাংলা চেয়েছিলেন। বামপন্থীরা এবং অনেক বুদ্ধিজীবী শ্যামাপ্রসাদকে “সাম্প্রদায়িক” আখ্যা দেন।
কিন্তু, শ্যামাপ্রসাদকে একপেশে “সাম্প্রদায়িক” বলা ঠিক নয়। ১৯৪৭-এর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি যা করেছেন তা ছিল “হিন্দু বাঙালিদের অস্তিত্ব রক্ষার রাজনীতি”। তিনি নিজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরোধী ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় আপস করতে বাধ্য হন।
ঐতিহাসিক মূল্যায়নের কয়েকটা বিশেষ দিক:
শ্যামাপ্রসাদের চাপের ফলেই কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাগ মেনে নেয়। ফলত পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়। শ্যামাপ্রসাদকে “সাম্প্রদায়িক” তকমা দিয়ে একপেশে বিচার করা ঠিক নয়। শ্যামাপ্রসাদকে শুধু হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ১৯৪৭-এর ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে তিনি “হিন্দু বাঙালিদের অস্তিত্ব রক্ষার” রাজনীতি করেছিলেন। তিনি নিজে দাঙ্গার বিরোধী ছিলেন, কিন্তু বাস্তবতা মেনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তিনি যদি সেদিন বাংলা ভাগের পক্ষে না দাঁড়াতেন, তাহলে গোটা বাংলা পাকিস্তানে চলে যেত। এই বিচারে তিনি বাংলাভাগের পক্ষে সওয়াল করে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার মূল কারিগর।
আবার তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলেই লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছেন। সেই বিচারে তিনি ছিন্নমূল মানুষের স্রষ্টা হয়ে যান।
তাই ইতিহাস তাঁকে নিছক “ভিলেন” বা “হিরো”—কোনো একটা তকমায় বাঁধতে পারে না। তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ, যিনি তৎকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের সম্প্রদায়কে বাঁচানোর জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
শ্যামাপ্রসাদ বাংলা ভাগের “স্রষ্টা” নন, বরং ভাগ যখন অনিবার্য হয়ে পড়ল তখন “পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার” সবচেয়ে সক্রিয় মুখ হয়ে উঠলেন।
উত্তরকথন
১৯৪৭-এর বাংলা ভাগ শুধু শ্যামাপ্রসাদের একার সিদ্ধান্ত ছিল না। এটা ছিল সময়ের দাবি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফসল। কিন্তু এই জটিল প্রক্রিয়ায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সবচেয়ে স্পষ্টবাদী ও সক্রিয় মুখ। ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাঁকে বিচার করতে গেলে ১৯৪৬-৪৭ সালের রক্ত, দাঙ্গা আর অনিশ্চয়তার আবহটা ভুললে চলবে না। শ্যামাপ্রসাদ হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না—পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।
শেষের কথা
ইতিহাস কখনও সাদা-কালো হয় না। শ্যামাপ্রসাদও তেমনই—একজন জটিল, বিতর্কিত, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ১৯৪৭-এর ভয়, দাঙ্গা ও অনিশ্চয়তার আবহের প্রেক্ষাপটা স্মরণে রেখে তাঁকে বিচার করতে হবে। তিনি ছিলেন “সময়ের চাপে পড়া একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ”।।
★ দাবিত্যাগ : প্রতিবেদনটি লিখেছেন পাঁচলা মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক শঙ্খ বারিক । প্রতিবেদনে উল্লিখিত বক্তব্য একান্তভাবে লেখকের নিজস্ব,এর সঙ্গে এইদিন-এর কোনো সম্পর্ক নেই ।
