রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ঐতিহাসিক ডঃ হিতেন্দ্রকুমার প্যাটেল স্যার (আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক) ২৪ জুন ২০২৫-এ “হিত-পত্রিকা”য় “प्रतिरोध से राजनीतिक दृष्टि तक: भारत को कैसी राजनीति चाहिए?” (প্রতিরোধ সে রাজনীতিক দৃষ্টি তক: ভারত কো কৈসী রাজনীতি চাহিয়ে?) শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। বর্তমানে দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা ছাত্র আন্দোলনকে বুঝতে এই প্রবন্ধটির পাঠ বিশেষ সহায়ক হয়। এক বছর আগে লেখা আমার স্যারের হিন্দি ভাষায় লেখা এই প্রবন্ধটি বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে পুনঃপাঠের অভিজ্ঞতার কথাই উপস্থাপন করলাম।
আন্দোলন করলেই সার্থকতা আসে না:
ভারত আবার একটা বড় আন্দোলনের সময় দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় যুবক, নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছে। প্রতিরোধ দরকার, কারণ তা সরকারকে তার সীমা বোঝায়। এই প্রেক্ষিতেই ঐতিহাসিক হিতেন্দ্র প্যাটেলের মন্তব্যটি বিশেষ প্রনিধানযোগ্য– “প্রতিটি আন্দোলন একটি ঘটনা হয়, কিন্তু খুব কম আন্দোলনই ইতিহাস তৈরি করে। ভৌগোলিক বিস্তার দিয়ে নয়, সামাজিক বিস্তার দিয়েই আন্দোলনের সার্থকতা ঠিক হয়।” অর্থাৎ “আন্দোলনের করা বা আন্দলনের অস্তিত্ব” আর “আন্দোলনের সার্থকতা” এক জিনিস নয়।
ক্যাম্পাস থেকে রাস্তা– তারপর সমাজ পর্যন্ত যেতে হবে:
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা বড় শহরের আন্দোলনই ভারতের আন্দোলন নয়। ভারত হল কৃষক, শ্রমিক, বেকার যুবক, মহিলা, দলিত, আদিবাসী, ছোট শহর -গ্রামের কোটি মানুষের দেশ। আন্দোলন তখনই ব্যাপক হয় যখন এই “বিভিন্ন ভারত” নিজেদের সমস্যা ও ভবিষ্যৎ তার মধ্যে দেখতে পায়। খুব জরুরি ভাবে অধ্যাপক প্যাটেল আমাদের ধরিয়ে দেন যে, “ক্যাম্পাস থেকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানোটা রাজনীতি। রাস্তা থেকে সমাজ পর্যন্ত পৌঁছানোই ইতিহাস।”
গান্ধীর শিক্ষা: রাজনীতির সংজ্ঞা বদলানো :
ঐতিহাসিক হিতেন্দ্র প্যাটেলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, গান্ধীর সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শুধু ব্রিটিশ তাড়ানো নয়, রাজনীতির অর্থই বদলে দেওয়া। সত্যাগ্রহ, অহিংসা শুধু লড়াইয়ের কৌশল ছিল না– তা ছিল ক্ষমতা, সমাজ ও নীতির নতুন সম্পর্ক তৈরি করা। গান্ধী সমাজকে বুঝে, তার ভাষায় কথা বলে রাজনীতিকে নীতির সাথে যুক্ত করেছিলেন।
আজকের চ্যালেঞ্জ কী?
অধ্যাপক প্যাটেল আমাদের যে প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছেন– আজকের প্রশ্ন এটা নয় যে আন্দোলন কার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হল আন্দোলন কার পক্ষে? আন্দোলন কী সব নাগরিককে গণতন্ত্রের অংশ ভাবে? বিভিন্ন শ্রেণি-এলাকার অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করে? শিক্ষা, রোজগার, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি, আর্থিক বৈষম্যের জন্য কি তার কাছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আছে? নাকি শুধু নৈতিকভাবে নিজেকে “ভালো” প্রমাণ করেই থেমে যায়?
নতুন শতাব্দী, নতুন রাজনীতি দরকার:
একুশ শতকের সমস্যা– বিশ্বায়ন, নতুন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বেকারত্ব, পরিবেশ সংকট– এগুলো বিংশ শতাব্দীর স্লোগান দিয়ে মিটবে না। আজকের যুব শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা চায় না, চায় *সুযোগ, সম্মান, নিরাপত্তা ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ। পুরনো “শোষণ, বিপ্লব”-এর শব্দ আওড়ে নতুন রাজনীতি হবে না। পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নতুন পরিস্থিতির জন্য নতুন রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি করতে হবে।
দুটি উদাহরণ থেকে শিক্ষা:
এই পরিসরে তিনি দুটি উদাহরণ উপস্থাপন করেন; যা থেকে বর্তমান সময়ে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
১। লোহিয়া ও জয়প্রকাশ নারায়ণের “সম্পূর্ণ ক্রান্তি বা সর্বাত্মক বিপ্লব”-এর ধারণা: তাঁরা বলেছিলেন যে, ভারতকে শুধু ইউরোপীয় তত্ত্ব দিয়ে বোঝা যাবে না। তাঁদের মতে “সম্পূর্ণ ক্রান্তি” (Total Revolution) মানে শুধু সরকার বদল নয়, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, নীতির সামগ্রিক পরিবর্তন।
২। নকশাল আন্দোলন: নকশালবাড়ি আন্দোলন ভূমি ও গ্রামীণ অন্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু শুধু সশস্ত্র সংগ্রামকে অবলম্বন করায় তা গণতান্ত্রিক ঐক্যের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছিল।
ঐতিহাসিক হিতেন্দ্র প্যাটেলের সিদ্ধান্ত:
“যে আন্দোলন শুধু বিরোধ করতে শেখায়, তা সাময়িক শক্তি দেয়। আর যে আন্দোলন সমাজকে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টি দেয়, সেই ইতিহাসের দিক বদলায়। প্রতিরোধ শুরু, কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিই ইতিহাস।” অধ্যাপক প্যাটেলের এই দৃষ্টিকোণ আমাদের আন্দোলনের প্রকৃতি ও তার নির্যাসকে আত্মস্থ করার একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। ভারতের এখন শুধু “প্রতিবাদী রাজনীতি” নয়, “গঠনমূলক রাজনৈতিক দৃষ্টি” দরকার। এমন রাজনীতি যা সমাজের সব অংশকে নিয়ে, ভবিষ্যতের সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
হিত-পত্রিকায় এক বছর আগে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি এই সময়ের একদম জরুরি প্রশ্ন তুলেছে– আজকের ভারতে আন্দোলন আছে, কিন্তু দিশা কোথায়?লেখক ইতিহাসবিদ হিতেন্দ্র কুমার পটেল অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর ভাষায় বুঝিয়েছেন কেন “আন্দোলন হচ্ছে মানেই আন্দোলনের সার্থকতা” নয়। “ক্যাম্পাস থেকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানো রাজনীতি, রাস্তা থেকে সমাজ পর্যন্ত পৌঁছানোই ইতিহাস”– অধ্যাপক প্যাটেলের এই অভিমতটি আজকের আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাকে বোঝার একটা চিন্তা সূত্র দেয়। তিনি বলছেন যে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা বড় শহরের প্রতিবাদ দিয়ে ভারতের কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী, গ্রামের মানুষকে ছোঁয়া যাবে না।
লোহিয়া-জেপির “সর্বাত্মক বিপ্লব”-এর ধারণা আর নকশাল আন্দোলন– এই দুই মেরুর উদাহরণ আমাদের দেখিয়ে দেয় শুধু বিরোধ দিয়ে রাজনীতি হয় না। গান্ধী যেমন রাজনীতিকে নীতির সাথে জুড়েছিলেন, আজও তেমন “দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা” দরকার। অধ্যাপক প্যাটেল যথার্থভাবেই বলেন– “যে আন্দোলন শুধু বিরোধ করতে শেখায়, তা সাময়িক শক্তি দেয়। আর যে আন্দোলন সমাজকে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টি দেয়, সেই ইতিহাসের দিক বদলায়।” তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিটা চিন্তাশীল সচেতন নাগরিককে বুঝতে হবে সরকারের বিরুদ্ধে চিৎকার করাটাই শেষ কথা নয়। বিকল্প ভাবনা তৈরি করাটাই আসল রাজনীতি।
★ লেখক সম্পর্কে : পাঁচলা মহাবিদ্যালয়,ইতিহাস বিভাগ, স্টেট এডেড কলেজ শিক্ষক ।
★ দাবিত্যাগ : প্রতিবেদনে বর্নিত মতামতের দায় সম্পূর্ণ লেখকের । এর সঙ্গে এইদিন-এর কোনো সম্পর্ক নেই।।
