প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২০ জুলাই : মধ্যযুগে ’ঢেঁড়া পিটিয়ে’ ঘোষণা করা হত রাজকীয় কোনও বার্তা। আর এখন বিজেপির তরফে ’ঢেঁড়া’ পিটিয়ে ’ফতোয়া,জারি করে চাষিদের কয়েক শো বিঘা চাষ জমিতে বন্ধ করে দেওয়া হল । এমন ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁষছেন পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়া গ্রামের চাষি মহল। তাঁদের কথা অনুযায়ী শুধু ঢেঁড়া পেটানোই নয়,চাষ বন্ধের ফতোয়ার কথা সাদা কাগজের উপর হাতে লিখে তা গ্রামের বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। তাতে বিজেপির স্থানীয় ৬ জন বুথ কমিটি সদস্যের নাম এবং মণ্ডল সভাপতির কথাও উল্লেখ থাকে । বিজেপি নেতাদের এমন কীর্তির কথা জানাজানি হতেই রাজনৈতিক মহলে তোলপার পড়ে গিয়েছে।
বিজেপির নাম করে লেখা ওই ’পোস্টারে’র মাধ্যমে জানানো হয়েছে,’২০২৬ সালের ৯ জুলাই থেকে
জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়ার নদীর ধার থেকে ঝাপানতলা পর্যন্ত জমির চাষ আবাদ বন্ধ থাকবে। এটা বিজেপির মণ্ডল সভাপতির নির্দেশ।কেউ পার্টির নির্দেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।’ এমন নির্দেশ সংক্রান্ত পোস্টারে এলাকার বুথ কমিটির সদস্য উত্তম কোলে,বাপি কোলে,স্বপন বেরা,গৌতম বেরা,মুরারী পোড়েল ও মেঘনাথ পোড়েল এর নাম লেখা রয়েছে।এলাকাবাসী জানিয়েছেন,পোস্টার যে মণ্ডল সভাপতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর নাম অসীম শীল ওরফে সন্তু । তিনি জামালপুর বিধানসভার ৩ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি।
জোৎচাঁদ গ্রাম নিবাসী সুকুমার মান্না পুলিশকে জানিয়েছেন(জিডি নম্বর:৫৫৫),’বিজেপির তরফে ঢেঁড়া পিটিয়ে চাষআবাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।জমিতে এখন ট্রাক্টর নামতেও তারা দিচ্ছে না। জমিতে নামলে প্রাণনাশের হুমকিও তারা দিচ্ছে।
সুকুমারের দাবি, গত বৃহস্পতিবার তিনি জমিতে নেমেছিলেন।তা জানতে পেরেই উত্তম কোলে ও মুরারী পোড়েল কাটারি হাতে নিয়ে জমিতে চলে আসে।জমিতে নামার জন্য তারা তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। ভয়ে তিনি জমি ছেড়ে পালিয়ে যান।’
একই এলাকার অপর চাষি নবকুমার মান্না বলেন, ‘চাষ বন্ধ করে দিয়ে বিজেপির লোকজন ’তোলা’ চাইছে।এই সবকিছুই বিজেপির মণ্ডল সভাপতির ইন্ধনে হচ্ছে। ওরা ট্রাক্টরের চালকদেরও জমিতে নামতে নিষেধ করে দিচ্ছে। যাঁরা ’তোলা’ দিতে পেরেছে তাঁরাই শুধু এখন চাষ করছে।’ আর এক চাষি তোতন মান্না বলেন,’আমরা পরিবর্তন চেয়ে ছিলাম।কিন্তু এ রকম পরিবর্তন আমরা চাইনি। চাষ বন্ধ করে দিয়ে এখন শুধু ’তোলাবাজি’ চলছে।’
চাষিদের আনা এইসব অভিযোগের বিষয়ে মণ্ডল সভাপতি অসীম শীল ওরফে সন্তুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,’উত্তম কোলে আমাদের দলের বুথ সভাপতি। ওই এলাকায় খাস জমি রয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ হয়েছে তা জানি না।’ সে সব না জেনে কোন মন্তব্য করবেন না বলে অসীম শীল জানিয়ে দেন।পাশাপাশি তিনি দাবি করেন,’ওই ’পোস্টার’ বিজেপির ছেলেরা লেখেনি। তৃণমূল চক্রান্ত করে এসব লিখেছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল সব শুনে জানান, ‘চাষিদের সাথে এমন আচরণ আমরা কখনোই মেনে নেব না।গোটা ঘটনা বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হবে৷’ কেউ অন্যায় ভাবে চাষিদের জমি চাষ করা বন্ধ করে দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কৃষি মন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন ।
তবে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীরা যাই বলুন না কেন জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়া এলাকার চাষিদের সাথে হওয়া অন্যায় অত্যাচার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিপিএমের কৃষক সংগঠন সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য কমিটির সদস্য বিনোদ ঘোষ ।তিনি বলেন,’তৃণমূল রাজত্বে কৃষকদের উপর অত্যাচার,অবিচার ও শোষন কম হয়নি।আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে বাংলায় ক্ষমতায় আসা বিজেপির রাজত্বে কৃষকরা এখন আরো বেশী অন্যায় ,অত্যাচার ও জুলুমবাজির শিকার হচ্ছেন।’ মকুল রায় একদা বলেছিলেন, ‘বিজেপি মানেই তৃণমূল।তার বাস্তব প্রতিফলন এখন দেখতে পাচ্ছেন জামালপুরের চাষিরা ।’।
