প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ভারতে শক্তিপূজা প্রচলিত । পাঁচ সহস্রাধিক বৎসর পূর্বে পাঞ্জাবের হরপ্পা এবং সিন্ধুদেশের মহেঞ্জোদারো নগরে দেবীপূজা হত। ওই প্রাচীন নগরদ্বয়ের যে ধ্বংসাবশেষ সিন্ধুনদের তীরে ভূগর্ভ হইতে আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে অসংখ্য মৃন্ময়ী দেবীমূর্তি পাওয়া গিয়াছে। দেবী ছিলেন উক্ত দুই নগরের অধিবাসিগণের প্রধান দেবতা।
বৈদিক যুগেও শক্তিপূজা প্রচলিত ছিল। ঋগ্বেদের দেবীসূক্ত ও রাত্রিসূক্ত এবং সামবেদের রাত্রিসূক্ত হইতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, বৈদিক যুগে শক্তিবাদ বর্ধিত হইয়াছিল। অষ্টমন্ত্রাত্মক দেবীসূক্তের ঋষি ছিলেন মহর্ষি অস্তূণের কন্যা ব্রহ্মবিদুষী বাক্ ।
হিন্দুতন্ত্রের মত বৌদ্ধতন্ত্রেরও অসংখ্য গ্রন্থ আছে । মূল কল্পতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র নামে দুটি প্রাচীনতন্ত্র বৌদ্ধতন্ত্র যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত হয় । চীনদেশীয় ত্রিপিটকে (বৌদ্ধশাস্ত্রে) চীনা ও তিব্বতীয় ভাষায় অনূদিত কয়েকটি তন্ত্রগ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নালন্দা ও বিক্রমশীলা নামক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে তন্ত্রশাস্ত্রের অধ্যাপনা হত। হিন্দুদের নিত্যপাঠ্য ধর্মগ্রন্থ চণ্ডীখানি এক সময় বৌদ্ধ-সন্ন্যাসিগণের প্রিয় হয়েছিল । জনৈক বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীর নিজের হাতে লেখা একটি চণ্ডী নেপালে পাওয়া গিয়েছে । যেটি প্রায় এক সহস্র বৎসর পূর্বে লেখা হয়েছিল । বাংলাদেশেই বৌদ্ধতন্ত্র সমৃদ্ধ হয়।
ডক্টর বিনয়তোষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘Introduction to Buddhist Esotericism’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, হিন্দুতন্ত্র নানা বিষয়ে বৌদ্ধতন্ত্রের নিকট ঋণী। কয়েখানি প্রসিদ্ধ হিন্দুতন্ত্রে কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা-এই দশ মহাবিদ্যার যে বর্ণনা আছে তৎসমুদয় বৌদ্ধতন্ত্র হইতে গৃহীত। ইহা বৌদ্ধতন্ত্র ‘সাধনমালা’ পরিদৃষ্টে বুঝা যায়। উগ্রা, মহোগ্রা, বজ্রা, কালী, সরস্বতী, কামেশ্বরী, ভদ্রকালী ও তারা-দেবীর এই অষ্টরূপের মন্ত্রাবলীও বৌদ্ধতন্ত্র হইতে প্রাপ্ত। বিনয়বাবুর মতে, সরস্বতী ও কালী বাংলার এই জনপ্রিয় দেবীদ্বয় বৌদ্ধতন্ত্রের সৃষ্টি । হিন্দুতন্ত্রের অনেক মন্ত্র বৌদ্ধতন্ত্রসৃষ্ট মন্ত্রের অপভ্রংশ।
বৌদ্ধধর্মের পঞ্চ ধ্যানী বুদ্ধের এক একটি শক্তি আছে-তাদের নাম লোচনা, যামকী, পাণ্ডারা, আর্যতারা ও বজ্রধাত্রীশ্বরী। হিন্দুতন্ত্রের যেমন বামাচার ও দক্ষিণাচার-এই দুই বিভাগ আছে, বৌদ্ধতন্ত্রেও তেমনই ক্রিয়াতন্ত্র, চর্যাতন্ত্র, যোগতন্ত্র প্রভৃতি চার বিভাগ আছে। বৌদ্ধতন্ত্র-মতে মহাশূন্য হতে বীজমন্ত্রের সৃষ্টি হয় এবং এক একটি বীজমন্ত্র এক একটি দেবতার রূপ ধারণ করে। বৌদ্ধতন্ত্রে ৮৪ জন সিদ্ধপুরুষের নাম আছে। তাঁরা ৭ম, ৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়ে সান্ধ্য-ভাষায় তন্ত্র প্রচার করেন। এই বৌদ্ধতন্ত্র বা বজ্রযান ৩য় শতাব্দীতে মৈত্রেয়নাথ কর্তৃক স্থাপিত হয়। কামাখ্যা, শ্রীহট্ট প্রভৃতি স্থানে বৌদ্ধতন্ত্রের প্রাচীন কেন্দ্র ছিল। হিন্দুতন্ত্রে যেমন আগম ও যামল নামক দুই বিভাগ আছে, তেমনি বৌদ্ধতন্ত্রেও বজ্রযান, সহজযান ও কালচক্রযান নামক তিনটি প্রধান বিভাগ আছে। কালচক্রযানের বিস্তৃত দর্শন ও ইতিহাস তিব্বতি ভাষায় সুপণ্ডিত রুশদেশীয় বৌদ্ধতত্ত্ববিৎ ডক্টর জর্জ রোরিক (George Roerich) কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। বৌদ্ধ সরস্বতীর তিন মুখ ও ছয় হাত। বৌদ্ধজগতে বাগীশ্বর মঞ্জুশ্রীর শক্তি সরস্বতী। ‘সাধনমালা’ নামে বৌদ্ধতন্ত্রে মহাসরস্বতী, বজ্রবীণা সরস্বতী, বজ্রসারদা ও আর্য সরস্বতীর ধ্যান আছে। ‘সাধনমালা’য় মহাসরস্বতীর বর্ণনা এইরূপ :
“ভগবতী শরদিন্দুকরাকারা সিতকমলো পরিচন্দ্রমণ্ডলস্থা, স্মেরমুখী, অতি-করুণাময়ী, শ্বেতচন্দন-কুসুম-বসন-ধরা, মুক্তাহারোপশোভিতহৃদয়া, নানালঙ্কারবতী, দ্বাদশবর্ষাকৃতি, সুরদনন্তগভস্তি ও ব্যূহাবভাসিতলোকত্ৰয়া।”
জাপানে এক বৌদ্ধ দেবী পূজিতা হন। তাঁর নাম সপ্তকোটি বুদ্ধমাতৃকা চনষ্টীদেবী বা কোটিশ্রী। জাপানী ভাষায় চনষ্টী শব্দ এবং সংস্কৃত চণ্ডী শব্দ একার্থক। বৌদ্ধ-ধর্মের মারীচিদেবীও দশভুজা। মূর্তিভেদে তিনি দ্বিভুজা, চতুর্ভুজা ও দ্বাদশভুজা। তিব্বতি লামাগণ মারীচিদেবীকে ঊষাদেবীরূপে আবাহন করেন। বৌদ্ধশাস্ত্র ‘মহাবস্তু’তে আছে, বুদ্ধদেব যখন জননীর সঙ্গে কপিলাবস্তুতে আসেন তখন শাক্যবংশের শাক্যবর্ধনমন্দিরে অভয়াদেবীর পাদবন্দনা করেন। কারও কারও মতে অভয়াদেবীই দুর্গাদেবী। বৌদ্ধতন্ত্রে অপরাজিতাদেবী অষ্টভুজা ও পীতবর্ণা। চীনের ক্যান্টন শহরে অবস্থিত বৌদ্ধমন্দিরে একটি শতভুজা দেবীমূর্তি আছে।।
